ঘুরে এলাম ঘাটশিলা : সত্যচরণ, তোমার চাকরিটাই কি এত বড় হয়ে গেল? এতগুলো মানুষের জীবন, যাপন আর আজন্মের বাসস্থান সব মিথ্যে…?/ নাফিসা ইসমাত
নাফিসা ইসমাত : ঘাটশিলার মাটিতে পা রাখতেই এক নিমেষে যেন পৌঁছে গেলাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’-এর পাতায়। শহুরে কোলাহল পেরিয়ে এখানকার প্রকৃতির মাঝে মনের পর্দায় একে একে ফুটে উঠতে লাগল সত্যচরণ, ভানুমতি, যুগলপ্রসাদ আর দরিদ্র ব্রাহ্মণ রাজু পাঁড়ের ছবি। অসহায় বিধবা কুন্তার সেই এক টুকরো জমির জন্য চোখের জলের আকুলতা যেন আমার নিজের চোখকেও অশ্রুসিক্ত করে তুলল।
বইয়ের পাতায় পড়া সেই দৃশ্যগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল চোখের সামনে। সত্যচরণের একটা কলমের খোঁচায় শত শত বছরের পুরনো গাছ, বুনো ফুল আর গরিব আদিবাসী মানুষগুলোর চেনা সংসার উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মনটা এক লহমায় ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। মনে প্রশ্ন জাগল—সত্যচরণ, তোমার চাকরিটাই কি এত বড় হয়ে গেল? এতগুলো মানুষের জীবন, যাপন আর আজন্মের বাসস্থান সব এভাবে মিথ্যে হয়ে গেল? এদের কি কোনো মূল্য নেই? সবকিছুই কি শুধু তথাকথিত ‘সভ্য’ মানুষদের ভোগের জন্য? আদিবাসীদের ওপর হওয়া সেই চিরন্তন অত্যাচারের মানসচিত্র বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অপরাধবোধ তৈরি করে। মনে হয়, অজান্তেই হয়তো আমরাও কখনো কারো ওপর এমন নির্মম কোনো অত্যাচার করে চলেছি।
ভাবনার সুতো ছিঁড়ে আরও গভীরে ঢুকে পড়ি আরণ্যকের। ওদের ভবিষ্যৎ কী? যেভাবে গাছপালা কেটে বসতি গড়ে উঠছে, আর শুনছি এবার নাকি এখানে শিল্পও আসবে—তাতে এই অরণ্যের সন্তানদের ভবিতব্য কী হবে? এই চিন্তায় যখন মনটা ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই বনের কিছু বন্যপ্রাণীর ছুটেছুটি আর পাখির কিচিরমিচিরে হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেলাম।
প্রকৃতির এই স্পন্দন যেন মনে করিয়ে দিল—সত্যের জয় অনিবার্য। অরণ্যের নিজস্ব একটা বিচার আছে। মনের ভেতর থেকে কে যেন বলে উঠল, “না না, দেখো, সত্যচরণ আর এখানে থাকবে না।” বিবেকের দংশনে সত্যচরণ ততক্ষণে বেশ বুঝতে পেরেছে, মানুষের এই তথাকথিত ‘উন্নয়ন’ আসলে আদিম প্রকৃতির ওপর এক চরম অত্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়।
অবশেষে সে চাকরি ছেড়ে ফিরে চলেছে কলকাতায়। যাওয়ার আগে যুগলপ্রসাদকে ডেকে বলে যাচ্ছে, নিজের জন্য যে এক টুকরো জমি সে রেখেছিল, সেখানে যেন কোনোদিন কোনো কুঠার না পড়ে। সেখানে অরণ্য তার নিজের নিয়মে বাড়ুক, ফুল ফুটুক, বন বেঁচে থাকুক…। ঘাটশিলার ল্যান্ডস্কেপে দাঁড়িয়ে বিভূতিভূষণের সেই চিরন্তন অরণ্যপ্রীতি আর মানবিকতার উপলব্ধিটাই যেন আমার অন্তরে চিরকালের মতো দাগ কেটে গেল।
________________________
বন-স্মৃতি থেকে লিখেছেন নাফিসা ইসমাত

