অন্যান্য 

বামপন্থী নেতৃবৃন্দকেই ভাবতে হবে, কেন  প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দল ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন বা অন্য দলে চলে যাচ্ছেন । মূল্যায়ণ করলেই তো হবে না, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে ; সেটা হচ্ছে না বলেই অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন : ড. আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 365
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় দলিতসংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিতসংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী . আবদুস সাত্তার । আজ একাদশ ‍কিস্তি ।

প্রশ্ন : কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে পরিচিতি মুসলিম নেতারা একের পর এক সিপিআইএম ছেড়ে অন্য দলে চলে যাচ্ছেন । কি বলবেন ?

ড. আবদুস সাত্তার : স্বাধীনোত্তর ভারতে রাজনীতির অন্যতম বড় বাধ্যবাধকতা হল ক্ষমতার প্রশ্নে একধরনের অদ্ভূত বোঝাপড়া, আপোষ-সমঝোতা । ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বহু ক্ষেত্রে নানা সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপোষ করেছে । এই আপোষ সমঝোতা শুধুমাত্র কংগ্রেস, সমাজবাদী অথবা আঞ্চলিক ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখেনি । এমনকী বামপন্থীদেরও অন্ততঃ দুবারের জন্য হলেও ক্ষমতার অংশীদার করতে সক্ষম হয়েছে । সুমন্ত্র ব্যানার্জি তাঁর “ Break the umbilical cord “- এ বিষয়টি সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন । শুধু তাই নয় ,  কংগ্রেসের স্বৈরতন্ত্র দূনীর্তি, আর্থিক প্রশ্নে  আরো তিনবার মাঠে-ময়দানে লড়াই সংগ্রামকে চালিয়ে রাখার জন্য  সাম্প্রদায়িক শক্তির শক্তির সঙ্গে বোঝাপড়া হয়েছে । ফলত , দেখা যাচ্ছে , রাজনৈতিক দলগুলি অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে নির্দিষ্ট নীতি আদর্শের কথা বললেও রণকৌশল বারে বারে পরিবর্তন করেছে । এক সময়কার শত্রূ আজ “ রাজনৈতিক ভোট সহযোগী ” বা ‘ভোটবন্ধুতে ‘ পরিনত হয়েছে । যে দলকে বা দলের সরকারকে পরিবর্তন করার জন্য সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা সম্পন্ন দলের সঙ্গে আপোষ  বোঝাপড়া করেছিল আজ সময়ের পরিবর্তনে সেই সময়কার সহযোগী এখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তান্ডব নৃত্যরত ! তাই সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য এখন প্রয়োজন ‘ পুরানো ‘ শত্রূ ‘-র হাত ধরা । তাই  কাল ভেদে রণকৌশলও পরিবর্তন হয় । মিত্র শত্রূতে পরিনত হয় আবার শত্রূ মিত্রতে রুপান্তরিত হয়ে যায় । হয়তো সেই কারণেই প্রবাদ বাক্যের মতো বলা হয় , রাজনীতিতে চিরকালীন শত্রূ বা মিত্র বলে কিছু হয় না । মোদ্দা কথা হলো, রাজনৈতিক দলগুলিই কোনো স্থির রাজনৈতিক অবস্থানে থাকতে পারেনি ।  আমার লেখা ‘ উগ্রজাতীয়তাবাদের শেকড়কে সমূলে উৎপাটন করতে হবে ‘ প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে । প্রবন্ধটি ২০১৭ সালে ‘ ঐতিহ্য ও অন্বেষ ‘ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ।

দুই . ‘ভারত ছাড়ো ‘ আন্দোলনের তরুণ তূর্কী , সমাজবাদী জয়প্রকাশ নারায়ণ বিষয়টিকে অসাধারণভাবে চিত্রায়িত করেছিলেন । অবশ্য , পরবর্তীকালে তিনিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন । তাঁর ভাষায় ‘ প্রত্যাবর্তনের  দিনগুলিতে ধর্মান্ধরা প্রায়শই  ছিঁচকে চোরের মতো উদার , অসাম্প্রদায়িক মানুষদের মধ্যে প্রবেশ করে হিন্দুত্বের কানাগলিতে টেনে আনার অবিরাম চেষ্টা করতে থাকে । সব সময় তা বাধা দেওয়া যায় না । সমঝোতা বা আপোষ পুনরায় অতীত ইতিহাসের ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় । ‘ ভারত ইতিহাসে সেই ভুলেরই‘ কি পুনরাবৃত্তি বারংবার হয়ে চলছে  ? পুতুলনাচের ইতিকথায় কারা পুতুল, কে বা কারা অদৃশ্য সুতোর টানে নাচানোর সঙ্গী হয় ? ‘ শত্রূর শত্রূ মিত্রতে ‘ পরিনত  হয়ে যায় ।

তিন . এখন প্রশ্ন হলো , দেশের মূলস্রোতের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলি যদি অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে ছলে-বলে কৌশলে আপোষ – বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে ‘ দোষনীয় ‘ যদি কিছু না হয়ে থাকে , তাহলে ব্যক্তির ক্ষেত্রেই বা বলার কি থাকতে পারে ? দলের মধ্যে থেকে ব্যক্তি তো সেই সমস্ত কিছু প্রত্যক্ষ করছে । তার একটা অনিবার্য প্রভাব ব্যক্তির মধ্যেও থাকে ।

চার . রাজনীতিতে দল হিসাবে অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টির পাশাপাশি ব্যক্তি রাজনীতিকের ও সেই দলে অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকে আমাদের বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে । কেননা, একুশ শতকের ঞ্জান –বিঞ্জান-প্রযুক্তির যুগে তথ্যের আদান-প্রদানের বিষয়টি হাতের মুঠোয় চলে এসেছে । চাওয়া –পাওয়া, বঞ্চনা , সাফল্য-ব্যর্থতা তথ্য সহযোগে সহজেই বিশ্লেষণ করা সম্ভবপর হচ্ছে । কথাগুলি ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনিভাবে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও আকর হয়ে উঠছে । প্রসঙ্গত মনে রাখতে হবে ব্যক্তির শুধু নয় , জনগোষ্ঠীরও  রাজনৈতিক চিন্তা- চেতনার ,  ভাবনার  পরিবর্তন হচ্ছে । এই পরিবর্তনের কথাও ব্যক্তি রাজনীতিককে রাজনৈতিক ভাবনার মধ্যে রাখতে হয় । রাজনৈতিক – অর্থনৈতিক- সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা বঞ্চনার বোধ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাইছেন । সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতার প্রশ্নটিও তাই অনিবার্যভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে গেছে ।

ছয় . সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ পূর্ব ইউরোপের দেশগুলিতে  সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় বহু মানুষের মনে এই ধারনার জন্ম দিয়েছে  যে ‘সমাজতান্ত্রিক আদর্শের যুগ শেষ হয়ে গিয়েছে ‘। ফলত , বিশ্বায়ন পরবর্তী  বিগত দু দশক ধরে সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের জগতে এক ধরনের বিশ্বব্যাপী সংকট তো চলছেই । নতুন আশার আলো তো আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না ।

সাত . আবার , ভারতে শ্রেনির আলোকে জাতপাতের ধারণাকে মুছে ফেলা গেল না । বিপরীতে জাতপাতই শেষ পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতিতে বড়ো হয়ে হাজির হয়ে গেল । ধর্মীয় অন্ধত্ব , ঘৃণা, বিদ্বেষ সর্বগ্রাসী হয়ে উঠছে । ফলশ্রুতিতে পশ্চাদপদতারও অবসান হলো না । বলা হচ্ছে , শ্রেণির নামে রাজ্যের এক বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সব দিক দিয়ে পশ্চাদপদ করে রাখা হয়েছে । এর সাপেক্ষে নানা কমিটি, কমিশনের প্রতিবেদনকেও তুলে ধরা হচ্ছে ।

আট . নয়া উদারীকরণের সর্বগ্রাসী ভয়ঙ্কর ব্যবস্থাপনার শিকার আজ আমরা প্রায় সকলেই, কোনো না কোনোভাবে । জনজীবনেও তার অপরিসীম প্রভাব বিদ্যমান । ফলত , মানুষের প্রত্যাশা , চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে । বর্তমান ব্যবস্থাপনায় তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যক্তি রাজনীতিকও চলতে হয় । তাই সমাজ , জনগোষ্ঠী , রাজনৈতিক দল আপোষ –বোঝাপড়া জয়ী হলে ব্যক্তি রাজনীতিবিদদের মধ্যেও হবে , এতে আর আশ্চর্যের কিছু নেই । শুধু মুসলিম নেতারা দল পরিবর্তন করছেন তা তো নয় , এটা একটা সার্বিক বিষয় হয়ে উঠেছে । আর নীতি আদর্শ নির্বিশেষেই তা ঘটছে । শুধু এই রাজ্যে নয়, সারা দেশব্যাপীই হচ্ছে ।

নয় . শুধু ব্যক্তি নয় , এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ । রাজনৈতিক দলগুলিও নির্বিশেষে এই বিষয়ে উৎসাহী ভূমিকা পালন করে চলেছে । দল পরিবর্তন করে মুখ্যমন্ত্রী , কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, রাজ্যের সভাপতি , বিধায়ক হচ্ছেন। কোন নীতি-আদর্শের ভিত্তিতে হচ্ছে ? এ  বিষয়ে যারা সব থেকে বেশি নীতি-আদর্শের কথা বলেন  তারাও তো ২০১৬- এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাতারাতি তৃণমূল থেকে নিজের দলে টেনে ‘পার্টি সদস্যপদ‘ প্রদান করে বসিরহাট উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করে  বিধায়ক করেছেন । এই অবস্থা থেকে এখন কেউ আর মুক্ত নন । যা ইতিপূর্বে কখনো ভাবাই যেত না !

দশ . দেশে এবং রাজ্যে স্বৈরতান্ত্রিক সাম্প্রদায়িকতার বিপদ আজ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে । গণতন্ত্রের  পীঠস্থানগুলিও আজ আক্রান্ত যা ইতিপূর্বে এইভাবে কখনো হয়নি । সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি মরন –বাঁচন , অস্তিত্বের প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে । তাই তাদের কাছে ‘জান-মাল-ঈমানের‘র সঙ্গে বেঁচে ‘ থাকার সংগ্রাম। যে কোনো রাজনৈতিক দলের সংখ্যাগুরুদের ক্ষেত্রে আদর্শগত বিষয়টি ছাড়া অন্যগুলো হয়তো সেইভাবে প্রাসঙ্গিক নয় । ফলত , একই মতাদর্শের অনুসারী হলেও সংখ্যাগুরু- সংখ্যালঘু  মানুষের সমস্যার নিরিখে জীবনযাপনের সংগ্রামেও ধর্ম. জাতপাতকে কেন্দ্র করে নানা তারতম্য দেখা দেয় । আবার, ভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে শুধুমাত্র রুজি-রুটি-কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বিষয়টি আজ আর সীমাবদ্ধ নেই । তাই অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামেই এখন বড়ো হয়ে উঠছে ।

এগারো . আবার এও সত্য যে , ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা ও আদর্শের কার্পেটের তলায় তথাকথিত দেশভক্ত , জাতীয়তাবাদীদের এখন সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভবপর হচ্ছে । সর্বত্রই এক বিশেষ জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বের আধিপত্য চলছে ।

বারো . বামপন্থী নেতৃবৃন্দকেই তাই ভাবতে হবে, কেন  এইভাবে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ দল ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন বা অন্য দলে চলে যাচ্ছেন । মূল্যায়ণ করলেই তো হবে না, প্রয়োজনীয় কার্যক্রম ও ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে হবে । সেটা হচ্ছে না বলেই অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন ।

 

 


শেয়ার করুন
  • 365
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment