বাঁকুড়ায় ট্রেন চাপা পড়ে মারা গেলেন রাজ্য পুলিশের ইন্সপেক্টর! আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা? তদন্তে পুলিশ
ট্রেনে চাপা পড়ে মারা গেলেন বাঁকুড়া জেলার ইন্সপেক্টর পর্যায়ে পুলিশ অফিসার। নাম জয়ন্ত পাল। বেশ কিছুদিন আগে হুগলি জেলার চন্ডীতলা থানার আইসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি বিতর্কে জড়িয়ে ছিলেন। হাওড়া জেলার একটি জায়গায় এসে নিজের হাতে গুলি চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। অন্য জেলার অফিসার হয়ে কিভাবে হাওড়া জেলায় এসে তিনি কাজ করছিলেন সেই বিতর্কে তাকে সাসপেন্ডও করেছিল তৎকালীন মমতা সরকার। কিন্তু গতকাল যা ঘটেছে তা এক কথায় মর্মান্তিক বললে মিথ্যা বলা হবে না। ঘটনার বিবরণে জানা যাচ্ছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় বাঁকুড়া শহরের কেঠারডাঙ্গায় আরণ্যক এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জয়ন্তের দেহ। নিছক দুর্ঘটনা? না কি আত্মহত্যা? না কি অন্য কিছু? নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তদন্তকারীদের মনে। শনিবার দুপুরে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের কাজ শেষ হয়েছে। সন্ধ্যার মধ্যে তার প্রাথমিক রিপোর্ট হাতে পেলে তা এই মৃত্যুরহস্যে একপ্রস্ত আলোকপাত করবে। কিন্তু তার আগেই জয়ন্তের মৃত্যু সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ওই রেলগেটের কাছে একটা সময় পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে রেললাইন ধরেই পারাপার করতে হত। বছরখানেক আগে রেল কর্তৃপক্ষ সাবওয়ে তৈরি করে দেয়। রেলের তরফে গেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ রেলগেট দিয়ে পারাপার করতে গিয়ে ধরা পড়লে রেলপুলিশ মোটা অঙ্কের জরিমানাও করে। সাবওয়ে ছেড়ে জয়ন্ত কেন রেললাইন পেরোচ্ছিলেন সে প্রশ্ন উঠছে।
সন্দেহের কারণ আরও আছে। যেখানে তাঁর দেহ উদ্ধার হয়, সেই জায়গাটি রেল গেট থেকে প্রায় ৫০ মিটার দূরে। তদন্তকারীদের মনে প্রশ্ন, জয়ন্ত যদি তাড়াতাড়ির জন্য বা অন্য কোনও কারণে লাইন পেরোতেও যান, তা হলেও লাইন ধরে আরও ৫০ মিটার এগিয়ে গিয়েছিলেন কেন?
প্রত্যক্ষদর্শীদের কারও কারও মতে, জয়ন্ত আত্মহত্যাই করেছেন। কেন? এক প্রত্যক্ষদর্শী সুদাম শীটের কথায়, ‘‘শুক্রবার বিকেলে বিশেষ কাজে আমি স্টেশন মোড় থেকে কেঠারডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিলাম। তাড়াহুড়ো থাকায় আমি সাবওয়ে ব্যবহার না-করে রেললাইনের উপর দিয়ে লাইন পারাপার করছিলাম। সেই সময় আরণ্যক এক্সপ্রেস বাঁকুড়া স্টেশনের দিকে এগিয়ে আসছিল। আচমকাই দেখি এক ব্যক্তি টলমল করতে করতে চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তখন বুঝতে পারিনি যে ওই ব্যক্তি পুলিশ আধিকারিক। ঘটনাটি কোনও ভাবেই দুর্ঘটনা নয়। আমি নিশ্চিত উনি আত্মহত্যা করেছেন।’’
জয়ন্তের পরিবার অবশ্য এখনও এই আত্মহত্যার তত্ত্ব বিশ্বাস করতে নারাজ। ঘটনার খবর পেয়েই বাঁকুড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তাঁর পরিজনেরা। জয়ন্তের জামাইবাবু রাজীব মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমার অন্তত মনে হয় না আত্মহত্যা। ছোটবেলা থেকেই ওর সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশেছি। স্থানীয় ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম দু’জনেই। সে রকম কোনও সমস্যা থাকলে নিশ্চয়ই জানাত। মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন কি না সেটা অবশ্য ওর স্ত্রীই বলতে পারবেন।’’
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ৪৫ দিন আগে বাঁকুড়া থানায় যোগ দিয়েছিলেন জয়ন্ত। তবে তিন-চার দিন কাজ করার পরই অসুস্থতার কারণে টানা ৪০ দিনের ছুটি নেন। শুক্রবারই ফের থানায় গিয়ে কাজে যোগ দেন। তার পরেই এই ঘটনা।
জয়ন্তের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। পরিবারের পাশাপাশি তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। ঘেঁটে দেখা হচ্ছে তাঁর ফোন।
অতীতে জয়ন্তকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাওড়ার ঘোষপাড়া পেট্রল পাম্পের সামনে নিজেই নিজের হাতে গুলি করেছিলেন জয়ন্ত। সেই সময় তিনি হুগলির চণ্ডীতলা থানার আইসি পদে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন এক মহিলা। ঊর্ধ্বতনদের অনুমতি ছাড়া থানা থেকে এত দূরে অন্য জেলায় তিনি কি করছিলেন তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়। কিছু দিনের জন্য জয়ন্তকে নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করাও হয়।

