অন্যান্য 

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদকে কেন্দ্র করে কি ঘটে ছিল জানতে চান, দেখে নিন এক নজর

শেয়ার করুন
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৬ বছর আগে বাবরি মসজিদকে ধুলিসাৎ করে দিয়েছিল করসেবকরা । সময়ের বিচারে আমরা প্রায় তিন দশকের কাছাকাছি পৌছে গেছি । আজকের তরুণ সমাজ জানে না কেমন করে এবং কী কারণে ভাঙা হয়েছিল ঐতিহাসিক স্মারক বাবরি মসজিদ । আজ সকালে হোয়াটপসঅ্যাপে একটি লেখা দেখলাম । সেটি খুবই তথ্য বহুল্য এবং প্রামান্য দলিল বলে আমাদের মনে হয়েছে তাই পাঠক সমাজের কাছে সেই লেখাটি তুলে ধরলাম । বিশেষভাবে কৃতঞ্জতা স্বীকার করছি তার প্রতি যিনি এই লেখা সংগ্রহ করে গুছিয়ে লিখেছেন । সম্পাদক ।

 

বিশেষ প্রতিবেদন : বাবরি মসজিদটি ১৫২৭ খ্রীষ্টাব্দে ভারতের প্রথম মুঘল সম্রাট বাবরের আদেশে নির্মিত হয় এবং তাঁর নাম অনুসারে নামাঙ্কিত হয়।

দীর্ঘদিন ধরেই সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক খোরাক জুগিয়ে যাচ্ছে এই বিবাদ, যখন প্রয়োজন হয়েছে নিজেদের ক্ষমতার সার্থে ব্যাবহার করছে রাজনৈতিক দল ও নেতারা,এখন পর্যন্ত রাম জন্ম ভুমির সঠিক সত্যতা পাওয়া যাইনি তবুও বারবার উত্তপ্ত হয়ছে এই ঘটনা কে কেন্দ্র করে।
ঘটনার সূত্র পাতের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।
মসজিদের ভেতরে ভগবান রামের শিশুবয়সের একটা মূর্তি ছিল, যেটা ১৯৪৯ সালের ২২ এবং ২৩শে ডিসেম্বরের রাতে আবির্ভূত হয়, অথবা তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় সেখানে রেখে দেওয়া হয়।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু মসজিদের ভেতর থেকে মূর্তি সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সেই নির্দেশ পালন করতে অস্বীকার করেন।

তখনই আদালত মসজিদের দখল নিয়ে রিসিভার বসিয়ে দেয়। বাইরে পুলিশের পাহারা বসে আর আদালত নিযুক্ত একজন পূজারী ওই মূর্তিগুলির পুজো-অর্চনা করতে থাকেন।

সংঘ পরিবার বহু দিন ধরেই এমন একটা ইস্যু খুঁজছিল যেটা দিয়ে তারা বহুধা বিভক্ত হিন্দু সম্প্রদায়কে একজোট করতে পারে।

মনে করা হয়, সেই উদ্দেশ্যেই ১৯৮৪ সালে রাম-জন্মভূমি মুক্তি আন্দোলন শুরু হয়।

এই আন্দোলনের মধ্যেই ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, বিতর্কিত এলাকার তালা খুলে দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত। কেন্দ্রে তখন রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন সরকার।আদালতের ওই নির্দেশের প্রতিবাদেই গড়ে ওঠে বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটি।

আইনি লড়াই ততদিনে জেলা আদালত থেকে পৌঁছিয়েছে লক্ষ্ণৌ হাইকোর্টে।

পুরো বিষয়টি মীমাংসা করতে ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগে রাজীব গান্ধী বিতর্কিত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে, মানস ভবন ধর্মশালার ঠিক নীচে নতুন রাম মন্দিরের শিলান্যাস করিয়ে দেন।

রাজীব গান্ধী নির্বাচনে হেরে গেলেন। ভি পি সিং এবং চন্দ্রশেখরের সরকারও আপোষ মীমাংসার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল।

অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদভানী গুজরাটের সোমনাথ থেকে রথযাত্রা বের করে রাজনৈতিক ঝড় তুলে দিলেন।

১৯৯১ সালে দিল্লিতে ক্ষমতায় ফিরে এলো কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী হলেন পি ভি নরসিমহা রাও।

কিন্তু অন্যদিকে, রামমন্দির আন্দোলনের ওপরে ভরসা করে উত্তরপ্রদেশে সেই প্রথমবার বিজেপি সরকার গঠন করল। মুখ্যমন্ত্রী হলেন কল্যাণ সিং।

মি. সিংয়ের সরকার সুপ্রিম কোর্টে হলফ নামা পেশ করে মসজিদের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

তার ভিত্তিতেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে নিয়ম রক্ষা করার মতো কর-সেবা করার অনুমতি দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত।

কিন্তু তার আগেই তো বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বিজেপির নেতারা সারা দেশে ঘুরে কর সেবকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন যাতে মসজিদ সম্পূর্ণভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়।

রীতিমতো শপথ বাক্য পাঠ করানো হয়েছিল।

আর সেসব কর সেবকদের ভরসা দেওয়ার জন্য কল্যাণ সিং ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে তাঁর পুলিশ কর সেবকদের ওপরে কখনই গুলি চালাবে না।

এর আগে ১৯৯০ সালে মুলায়ম সিং যাদবের সরকার কিন্তু কর সেবকদের ওপরে গুলি চালিয়েই মসজিদ ভেঙ্গে ফেলা আটকিয়ে দিতে পেরেছিল।

কল্যাণ সিং বিতর্কিত এলাকার সংলগ্ন ৪২ একর জমি প্রস্তাবিত রামকথা পার্ক তৈরির জন্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে দিয়ে দেন।

এছাড়াও পর্যটন উন্নয়নের নাম করে বেশ কিছু মন্দির আর ধর্মশালার জমি অধিগ্রহণ করে জমি সমান করে দিয়েছিল কল্যাণ সিংয়ের সরকার।
ফৈজাবাদ থেকে সরাসরি অযোধ্যার বিতর্কিত এলাকা অবধি চওড়া সড়ক তৈরি করা হয়েছিল।

সারা দেশ থেকে আসা কর সেবকদের থাকার জন্য বিতর্কিত এলাকার গায়ে লাগা জায়গায় লাইন দিয়ে তাঁবু খাটানো হয়েছিল।

তাঁবু খাটানোর জন্য কোদাল, মোটা রশি প্রচুর সংখ্যায় সেখানে জড়ো করা হয়েছিল। সেগুলো পরে মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙ্গে ফেলার কাজে লাগানো হয়েছিল।

মোটের ওপরে বিতর্কিত পরিসরের চারদিকটা কর সেবকদেরই নিয়ন্ত্রণে ছিল।

এরা ৪-৫ দিন আগে থেকেই আশপাশের কিছু মাজারের ওপরে হামলা চালিয়ে আর মুসলমানদের কয়েকটা ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি গরম করে তুলেছিল আর নিজেদের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিমার পরিচয়ও দিতে শুরু করেছিল।

এসব সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত পরিদর্শক – জেলা জজ মি. তেজ শঙ্কর বারবার বলছিলেন যে শান্তিপূর্ণভাবে নিয়মরক্ষার কর-সেবা করানোর সব ব্যবস্থা করা হয়েছে।

একদিন আগে, ৫ ডিসেম্বর দুপুরবেলা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মার্গ দর্শক মন্ডল আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত নিল যে শুধুমাত্র নিয়মরক্ষার খাতিরেই কর-সেবা করা হবে বিতর্কিত এলাকায়।
তারা ঠিক করল যে কর সেবকরা সরযূ নদী থেকে জল আর মুঠি ভর মাটি নিয়ে আসবেন আর মসজিদের কাছেই মন্দিরের শিলান্যাস হয়েছে যেখানে, সেখানে ওই মাটি আর জল অর্পণ করে চলে যাবেন।

এই সিদ্ধান্তের কথা ছড়িয়ে পড়তেই কর-সেবকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
তারা বলছিল যে নেতারা যাই বলে থাকুন না কেন তারা আসল কর-সেবা করে তবেই ফিরবেন, অর্থাৎ মসজিদ ধ্বংস করবেনই তারা।

সন্ধ্যে থেকেই কর-সেবকরা কয়েকজন টিভি সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফারের সঙ্গে দুর্বব্যহার করছিল, মারধর করছিল।

ওদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির বর্ষীয়ান নেতা অটল বিহারী বাজপেয়ী লক্ষ্ণৌতে এক জনসভায় ভাষণ দিয়ে কর-সেবকদের আরও উৎসাহিত করে তোলেন।

মি. বাজপেয়ী সন্ধ্যের ট্রেনে দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। আদভানী এবং মুরলী মনোহর যোশী – এই দুই নেতা মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে রাতেই অযোধ্যা পৌঁছে যান।

সেটা ছিল ৫ ডিসেম্বরের রাত।

পরের দিন ভোর থেকেই গোটা অযোধ্যা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে কেঁপে উঠছিল, অন্যদিকে পাশের শহর ফৈজাবাদের সেনা ছাউনিতে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও তৈরি হচ্ছিলেন কারণ যে কোনও মুহূর্তে তাঁদের ডাক পড়তে পারে অযোধ্যার দখল নেওয়ার জন্য।

সেনা আর বিমানবাহিনীও নজরদারী চালাচ্ছিল।

রাজ্য সরকার তখনও তার আগের অবস্থানেই অনড় ছিল – আধা সামরিক বাহিনী বা সেনাবাহিনী কিছুই তারা নামাতে রাজী হয় নি। তাদের স্পষ্ট কথা – কর-সেবকদের ওপরে কোনও রকম বল প্রয়োগ চলবে না।

সকাল ১০টা ৩০ মিনিট
বরিষ্ঠ বিজেপি নেতা ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতারা অযোধ্যার সেই বিতর্কিত এলাকায় পৌঁছন। সেখানে বিতর্কিত এলাকার পাশেই পুজো-পাঠের আয়োজন করে রেখেছিল করসেবকরা।

বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে দেখে আগেই ফৈজাবাদের জেলাশাসক ও এসএসপি রাম জন্মভূমি এলাকা ঘুরে দেখে যান। তখন সেখানে অনেক মানুষ ইতিমধ্যে ভিড় করে ফেলেছে।

দুপুর ১২টা
কমবয়সী করসেবকরা ধীরে ধীরে বিতর্কিত এলাকা ধীরে ফেলতে শুরু করে। বাইরের নিরাপত্তা বলয় ভাঙার চেষ্টা শুরু হয়। কিছু করসেবক মসজিদের মাথায় উঠে পড়ে। বাকীরা নিরাপত্তা বলয় ভাঙতে শুরু করে।
করসেবকদের তাণ্ডব ততক্ষণে শুরু হয়ে গিয়েছে। বাবরি মসজিদের মাথায় উঠে এবার হাতুড়ি, শাবল নিয়ে করসেবকরা তা ভাঙতে শুরু করে। মাথায় উঠে বিক্ষোভ দেখায়, তাণ্ডব করে।

দুপুর ১টা ৫৫ মিনিট
ঘণ্টাখানেকের চেষ্টায় একটি গম্বুজ ভেঙে ফেলে করসেবকরা। হাতে পতাকা নিয়ে আগ্রাসী করসেবকরা তখন বিজয়োল্লাসে মেতেছে মসজিদের মাথাতেই।

বিকেল ৩টে ৩০ মিনিট
এই ঘটনার অব্যবহিত পরেই অযোধ্যায় শুরু হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। হিন্দু-মুসলমান দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে খুনে অভিযানে নেমে পড়ে। সারা উত্তরভারতে তখন পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে গিয়েছে।

বিকেল ৫টা
বাবরি মসজিদের মূল গম্বুজটি ততক্ষণে ভেঙে ফেলা গিয়েছে। সারা রাজ্য তথা দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হলেও করসেবকরা গম্বুজ ভাঙতে ব্যস্ত ছিল। প্রশাসনকে সেসময়ে ঘটনাস্থলে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা
সারা রাজ্যে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে গিয়েছে। এর জেরে উত্তরপ্রদেশে জারি করা হয় রাষ্ট্রপতি শাসন। সেইসময়ে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দেন কল্যাণ সিং।
তার পর আপনাদের সকলের জানা দীর্ঘ আইনি লড়াই সাথে ভোট রাজনীতি করতে রামের নামে গেরুয়া আস্ফালন।
তথ্য বিবিসি ও অন ইন্ডিয়া বেঙ্গল থেকে সংগৃহীত।


শেয়ার করুন
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment