লোহিত সাগর দখল নিল হুথি! হুরমুজের পর দ্বিতীয় তেল রপ্তানির পথ ইরানের হাতে, বিশ্বজুড়ে তেল সংকট ?
বৃহস্পতিবার ইয়েমেনের মোখা বন্দরের দখল নিয়েছিল হুথি। শুক্রবার পেরিম দ্বীপও তাদের দখলে চলে গিয়েছে। লোহিত সাগরের এই দুই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা ইরানের সমর্থনপুষ্ট গোষ্ঠী কব্জা করে নেওয়ায় তেল ও গ্যাস সরবরাহের সঙ্কট আরও গভীর হল।
পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল আসার গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ় প্রণালী এখন কার্যত বন্ধ। ইরানের উপরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা। সে দেশ থেকে তেলবাহী জাহাজ যাতে অন্যত্র যেতে না-পারে, সে জন্য হরমুজ় প্রণালীর মুখে অবরোধ তৈরি করেছে মার্কিন নৌবাহিনী। ইরানও পাল্টা নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। সৌদি আরব, কাতার বা ইরাকের মতো দেশ থেকে তেল নিয়ে যাওয়া জাহাজের উপরে হামলার হুমকি দিয়েছে। বাস্তবে করেছেও।
এই অবস্থায় বিকল্প পথ হয়ে উঠেছিল লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালী। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে থেকেই এই পথে তেল রফতানি করে সৌদি আরব। তবে হরমুজ়ের মতো অতটা নয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, আমেরিকা ও ইজ়রায়েলের যৌথবাহিনী ইরান আক্রমণ করার আগে বিশ্বের মোট তেলের চাহিদার পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ় দিয়েই যেত।
সৌদি আরবের পুব দিকের খনিগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল পশ্চিমে লোহিত সাগরের তীরে আনার জন্য পাইপলাইন আছে। ইয়ানবু আর রাঘিব—মূলত এই দু’টি শহরে তেল যায়। সেখান থেকে জাহাজে তেল পরিবহণের প্রধান পথ বাব আল-মান্দেব। এক মাস আগে থেকেই এই পথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটানোর হুমকি দিয়ে রেখেছে হুথিরা। ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের একটা বড় অংশই হুথির দখলে। সেখান থেকে বাব আল-মান্দাব-মুখী বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে তারা। ভারতের পতাকা নিয়ে চলাচল করা একটি জাহাজেও আক্রমণ হয়েছে। কোনও মতে প্রাণে বেঁচেছেন ১৩ জন ভারতীয় নাবিক। এ বার পর পর দু’দিনে লোহিত সাগরের তীরের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল নেওয়ায় বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ আরও অনেকটাই চলে গেল হুথিদের হাতে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালীর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটা পেরিম দ্বীপের কাছে। জলপথটি এখানে মাত্র কুড়ি কিলোমিটারের মতো চওড়া। আর পেরিম দ্বীপ থেকে জাহাজ চলাচলের পথের দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটারেরও কম। ফলে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন এড়িয়ে এই পথে জাহাজ নিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে গেল।
ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে হুথি গোষ্ঠীর সংঘর্ষের ইতিহাস দীর্ঘ। ইয়েমেনের শাসক দল সুন্নি মুসলিম। সুন্নি সৌদি আরব তাদের মদত দেয়। অন্য দিকে, শিয়া হুথি গোষ্ঠীকে মদত জোগায় ইরানের শিয়া শাসককুল। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুথি গোষ্ঠীর লড়াইয়ে একাধিক বার সরাসরি শামিল হয়েছে সৌদি আরব। তার পরেও রাজধানী সানা-সহ পশ্চিম ইয়েমেনের বড় অংশ হুথিদের দখলে। বিস্তার ঘটছে আরও।
শুধু মোখা বন্দর বা পেরিম দ্বীপ কব্জা করা নয়, সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেলবাহী পাইপের উপরেও বৃহস্পতিবার একাধিক হামলা চালিয়েছে হুথিরা। উপগ্রহচিত্রে পাইপলাইন লাগোয়া প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ঘন কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গিয়েছে। শুক্রবার থেকে ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন দিয়ে তেল পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরবের সরকার। বন্দরে তেলই যদি না-আসে, তা হলে জাহাজে করে কী-ই বা রফতানি হবে!
বিকল্প একটা পাইপলাইন দিয়ে মিশরে সুয়েজ খালের কাছাকাছি তেল পাঠানো অবশ্য এখনও সম্ভব। সেখান থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে জিব্রল্টার প্রণালী দিয়ে অতলান্তিক মহাসাগর হয়ে পুরো আফ্রিকা মহাদেশকে পরিক্রমা করে উত্তমাশা অন্তরীপের পাশ দিয়ে আসতে হবে ভারত মহাসাগরে। তার পর আরব সাগর হয়ে ভারতে। সব মিলিয়ে বাড়তি সময় লাগবে ১০ থেকে ১৫ দিন। যার অর্থ পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়া।

