রাখে হরি তো মারে কে ? ৯ দিন পর বিপর্যস্ত নেপালের সুড়ঙ্গ থেকে জীবিত উদ্ধার দুই শ্রমিক! অবাক বিশ্ব!
যতই অসম্ভব লাগুক! মনে হোক না কেন এটাই শেষ! আর কোনও আশা নেই! সেটা যে ঠিক নয়, তা আরও এক বার প্রমাণ করল ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়া দুই শ্রমিকের ঘটনা!
ন’দিন সুড়ঙ্গের অন্ধকার গর্তে কোনও ভাবে দিন কাটিয়েছেন। প্রতি দিন ভেবেছেন, এটাই তাঁদের জীবনের শেষ দিন। আর আলো দেখা হবে না। দেখা হবে না আর পরিবারের সঙ্গে। তবে শুক্রবার তাঁদের যখন নেপালি সেনাবাহিনী এবং উদ্ধারকারী দল বার করে আনে, তখন যেন নতুন জীবন পেলেন সঞ্জয় শাহ এবং কবীর মহাজন। তাঁদের পরিবারের সদস্যের কথায়, ‘‘আশা ছাড়া উচিত নয়।’’ সঞ্জয়, কবীরদের ‘হাল না ছাড়ার’ বার্তা এখন আশার আলো দেখাচ্ছে সুড়ঙ্গে আটকে থাকা নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারকে।
সঞ্জয় ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মেকানিক্যাল ফোরম্যান। তাঁর সঙ্গে প্রকল্পের মেকানিক্যাল সুপারভাইজ়ার ছিলেন কবীর। কী ভাবে ওই সুড়ঙ্গে তাঁরা ঢুকে পড়েছিলেন, তার পরে কী ভাবে দিন কেটেছে— সেই আতঙ্ক বার বার ফুটে উঠেছে তাঁদের চোখেমুখে, কণ্ঠে। গলা কেঁপেছে। চোখে জল। পরিবারের চোখেও জল। পরিবারের এক সদস্যের কথায়, ‘‘এই জল আনন্দের। এই জল আশার। এই জল বিশ্বাসের।’’
কাঠমান্ডু থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে বাড়ি কবীরের। শুক্রবার সকালে সেই বাড়ির সামনে প্রতিবেশীদের ভিড়। গত ন’দিন একই ছবি দেখা গিয়েছে। তবে শুক্রবারের ছবিটা অন্য দিনের তুলনায় আলাদা। সেই ছবিতে ছিল আশা, ভরসা এবং আনন্দ। তবে গত ন’দিন মহাজন পরিবারে একটাই চিন্তা ঘুরছিল, বেঁচে আছেন তো কবীর? একটা দিন যায়, আর সেই আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে থাকে। শেষপর্যন্ত শুক্রবার কবীরের জীবিত উদ্ধার হওয়ার খবর যেন সব দুশ্চিন্তা এক লহমায় ভেঙে খান খান করে দিয়েছে। তাঁর মায়ের কথায়, ‘‘প্রতি দিন ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি। কেউ আমার ছেলের সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলতে এলে ধমক দিয়েছি। আমি বিশ্বাস করতাম, কবীর ফিরে আসবেই।’’
নেপালের বিভিন্ন প্রান্তে মোট ছ’টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছে। গত ২৬ অগস্ট ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীতে হড়পা বানের পর বহু শ্রমিক প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়েন। অন্তত ৯০০-র বেশি শ্রমিক এখনও নিখোঁজ। রাসুয়া জেলার ত্রিশূলী ৩-এ জলবিদ্যুৎ স্টেশনের ৪০ জন শ্রমিকের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না সে দিন থেকেই। উদ্ধারকারীরা চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। শুক্রবার সকালে সুড়ঙ্গ থেকে দু’জনকে বার করা হয়েছে। কবীরের স্ত্রী নেপালি সেনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এটা তাঁর স্বামীর দ্বিতীয় জন্ম বলে মনে করছেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘ও নতুন জীবন পেয়েছে। আমরা প্রচণ্ড খুশি। আমরা সকলে অপেক্ষা করছিলাম। এখন হাসপাতালে যাব ওদের দেখতে।’’
সুড়ঙ্গ থেকে ন’দিন পর বেরিয়ে নেপালি সেনার মেডিক্যাল টিমের সঙ্গে কথা বলেন সঞ্জয়। জানান, সে দিন সুড়ঙ্গ থেকে বাকি শ্রমিকদের নিরাপদে বার করতে গিয়েই তিনি নিজে আটকে পড়েছিলেন। সকলকে বার করা তাঁর দায়িত্ব ছিল। কিন্তু তা করতে গিয়ে অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। বানের খবর পেয়েও তাই সময়মতো সুড়ঙ্গ থেকে বেরোতে পারেননি সঞ্জয়। তাঁর কথায়, ‘‘আমি কন্ট্রোলরুমে কাজ করছিলাম। প্রত্যেকের প্রাণ বাঁচানো আমার দায়িত্ব ছিল।’’ সঞ্জয়ের সংযোজন, ‘‘সকলকে দৌড়োতে বলেছিলাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে আমার সময় ফুরিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমি আর বেরোতে পারিনি।’’
সঞ্জয় জানান, তিনি মন্ত্র জপ করছিলেন। ঈশ্বরের উপর আস্থা রেখেছিলেন। এর চেয়ে বেশি আর কিছুই তাঁর করার ছিল না। বেঁচে বেরোতে পারবেন, ভাবেননি। সঞ্জয় এবং কবীরকে বার করার পরেও ওই সুড়ঙ্গ থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। আরও কেউ কেউ ভিতরে জীবিত অবস্থায় আটকে রয়েছেন বলে ধারণা উদ্ধারকারীদের। সঞ্জয়কে সে বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, আরও তিন থেকে চার জন আটকে থাকতে পারেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলা যাচ্ছিল, যোগাযোগ করা যাচ্ছিল।
নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ত্রিশূলী নদীর উপত্যকায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ত্রিশূলী ৩-এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছে। ত্রিশূলী শহর থেকে এটি অন্তত ১৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। মাটির নীচে একটি বিরাট পাওয়ারহাউস তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছোনোর জন্য খোঁড়া হয়েছিল সুড়ঙ্গ। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ সেই সুড়ঙ্গেই আটকে ছিলেন শ্রমিকেরা। আরও কয়েক জন আটকে আছেন বলে মনে করা হচ্ছে। দু’জনকে বার করার সময় সুড়ঙ্গের ভিতর থেকে আরও গলার স্বর শোনা গিয়েছে। সঞ্জয় সুড়ঙ্গ থেকে বেরোনোর পর নেপালি সেনার মেডিক্যাল টিমকে জানিয়েছেন, আরও তিন থেকে চার জন ভিতরে রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তাও বলা যাচ্ছে। কিন্তু কত ক্ষণে তাঁদের উদ্ধার করা যাবে, আদৌ সময়ে সেই কাজ সম্পন্ন হবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।
রাসুয়ার লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে অবশ্য ত্রিশূলীর মতো কোনও ‘অসাধ্যসাধন’ হয়নি। সেখানে সুড়ঙ্গে ১৫০ মিটার এগিয়ে সেনাবাহিনী দু’জন শ্রমিকের দেহ উদ্ধার করেছে। ভিতরে আরও শ্রমিক আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা। ওই প্রকল্পে ৪১ জন কাজ করছিলেন। শুক্রবার সকাল পর্যন্ত নেপালে ১২৫৯ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ৫০৫৩ জন এখনও নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে অনেক ভারতীয় পর্যটকও রয়েছেন।
হড়পা বান এবং ধসের কারণে ওই সব সুড়ঙ্গে আটকে পড়েন প্রায় হাজার জন শ্রমিক। সুড়ঙ্গগুলি কাদার স্রোত, পাথর, মাটিতে ভরে গিয়েছে। সেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরা। তবে উদ্ধারকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার নিয়েছে একটি হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপ! উদ্ধারকারী দলগুলির কাছে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন হল, সুড়ঙ্গ ঠিক কোথায়? সুড়ঙ্গের মধ্যে কোথায় কী আছে? এখনও ওই গ্রুপ থেকে পাওয়া তথ্যই উদ্ধারকারী দলকে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় অনেকাংশেই সাহায্য করছে। সেই গ্রুপে এখন ৫০০ জন সদস্য। তাঁরাই নানা ভাবে নানা তথ্য সরবরাহ করে সাহায্য করছে উদ্ধারকাজে। সৌজন্যে ডিজিটাল আনন্দবাজার।

