বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেলেন না অভিষেক! হাই কোর্ট আগে এসএসকেএম-এ যেতে বলেছিল!
বাংলার জনরব ডেস্ক : চোখের চিকিৎসার জন্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিল না কলকাতা হাই কোর্ট। বুধবার এই মামলার শুনানিতে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ জানায়, চিকিৎসা সংক্রান্ত মতামত নেওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার অভিষেককে এসএসকেএম হাসপাতালে যেতে হবে। সেখানকার চক্ষু বিভাগের প্রধান একটি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে অভিষেকের বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয়তার দিকটি খতিয়ে দেখবেন। কিন্তু অভিষেকের আইনজীবী আদালতে জানিয়ে দেন যে, তাঁর মক্কেল এসএসকেএম-এ যাবেন না। তার পর নির্দেশ দিতে গিয়ে পুরো মামলাই খারিজ করে দেন বিচারপতি ভট্টাচার্য।
চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তা নিয়ে অভিষেকের আর্জি নিয়ে সোমবার শুনানি হয় শীর্ষ আদালতে। তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ মামলাটি আবার হাই কোর্টেই ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। অভিষেকের আর্জি সাত দিনের মধ্যে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে বলে শীর্ষ আদালত। সেই মতো বুধবার এই মামলার শুনানি হয় হাই কোর্টে।
চোখের চিকিৎসার জন্য অভিষেকের বিদেশযাত্রার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বুধবার হাই কোর্টে সওয়াল করেন তাঁর আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য এবং রেবেকা ম্যামেন জন। রেবেকা বলেন, “এর আগেও ইডির একটি মামলায় তাঁকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। সেই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টেও উঠেছিল এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে দিতে কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলের কোনও আপত্তি ছিল না।” রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার পাল্টা বলেন, “সেই মামলায় অভিষেক অভিযুক্ত ছিলেন না।”
রেবেকা বলেন, “সেই সময় তদন্তকারী সংস্থাই স্বীকার করেছিল তিনি বিদেশে যেতে পারেন। যখন তাঁর বিরুদ্ধে অর্থ তছরুপ প্রতিরোধ মামলা (পিএমএলএ )-তে নোটিস জারি হয়েছিল, তখনও সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে রক্ষাকবচ দিয়েছিল। তদন্তকারী সংস্থাকে জানিয়ে অভিষেককে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, “২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি মোট ১২ বার বিদেশে গিয়েছেন। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ভারত সরকারের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসাবেও বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন। প্রতিবারই তিনি বিদেশে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁর পালিয়ে যাওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই। কলকাতায় তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তান রয়েছেন। তাঁরাও এখানেই থাকবেন।” এর পাশাপাশি অভিষেকের আইনজীবী তাঁর সওয়ালে বলেন, “অভিষেক একজন সাংসদ এবং তাঁর কাছে কূটনৈতিক পাসপোর্ট রয়েছে। ফলে তাঁর বিদেশ যাতায়াতের প্রতিটি তথ্য সরকার সহজেই নজরে রাখতে পারে। তাই তাঁকে বিদেশে যেতে দিলে তদন্ত বা মামলার অন্য পক্ষের কোনও ক্ষতি বা অসুবিধা হবে না। তিনি তদন্তে সব সময় সহযোগিতা করেছেন এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন।
অভিষেকের আইনজীবীর সওয়ালের প্রেক্ষিতে বিচারপতি ভট্টাচার্য বলেন, “আপনার (অভিষেক) বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং সেগুলির শুনানিও চলছে। আপনি বিদেশে গেলে সেই মামলাগুলির শুনানির কী হবে? এটি একমাত্র ফৌজদারি মামলা নয়। আপনার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা রয়েছে।”
একই সঙ্গে বিচারপতি বলেন, “অভিষেকের চিকিৎসা হওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু যদি সেই চিকিৎসা কলকাতায় বা ভারতের অন্য কোনও জায়গায় সম্ভব হয়, তা হলে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশের মধ্যেই উপযুক্ত চিকিৎসা করানো উচিত। চিকিৎসা বিদেশে হবে কি না, সেটি মূল বিষয় নয়। আসল বিষয় হল, তিনি যেন যথাযথ চিকিৎসা পান— সেটা নিশ্চিত করা।”
তার পরেই বিচারপতি বলেন, “আমি কলকাতার অন্যতম প্রধান সরকারি হাসপাতাল এসএসকেএম-এর চক্ষু বিভাগকে একটি বিশেষজ্ঞ মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেব। ওই বোর্ড আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) দুপুর ২টোয় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরীক্ষা করবে এবং একটি রিপোর্ট জমা দেবে। যদি ওই মেডিক্যাল বোর্ডের মত হয় যে, এই সমস্যার চিকিৎসা ভারতে সম্ভব, তা হলে এখানেই চিকিৎসা করাতে হবে। আর যদি বোর্ড জানায় যে, ভারতে এই চিকিৎসা সম্ভব নয়, তা হলে বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।”
অভিষেকের আইনজীবী জানান, তাঁর মক্কেল জেল বা পুলিশি হেফাজতে নেই। তাই চিকিৎসার জন্য অভিষেকের আদালতের অনুমতির প্রয়োজন নেই বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে রেবেকা জানান, অভিষেক আমেরিকাতেই চোখের চিকিৎসা করাতে চান। তিনি আদালতের কাছে আর্জি জানিয়ে বলেন, “যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে এত দিন চিকিৎসা হয়েছে, তাঁর কাছেই চিকিৎসার পর পুনরায় পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। এখানকার চিকিৎসায় জটিলতা হওয়ার কারণেই আমার (অভিষেক) এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। আমেরিকায় ইতিমধ্যেই আমার দু’বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। তাই একই চিকিৎসক দলের অধীনে চিকিৎসার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা চিকিৎসার স্বার্থে জরুরি। আমাকে তিন সপ্তাহের জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দিন। চিকিৎসা শেষ করে আমি দেশে ফিরে আসব। আদালত যে শর্ত দেবে, আমি তা মেনে চলব। যদি কোনও শর্ত ভঙ্গ করি, তার পরিণতিও আমি মেনে নেব।”
অভিষেকের আইনজীবীর সওয়ালের প্রেক্ষিতে বিচারপতি বলেন, “এটি যেহেতু একটি বিচারাধীন আবেদন, তাই আমি আবেদন খারিজ করছি না। বরং, তাঁকে মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেব। রাজ্যের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল বলেন, “একটি স্বাধীন মেডিক্যাল বোর্ডের মতামত নেওয়া হোক। এতে রাজ্যের কোনও আপত্তি নেই।” তার পর মামলাটি খারিজ করে দেওয়ার আর্জি জানান অভিষেকের আইনজীবী রেবেকা।
তিনি বলেন, “আমার বক্তব্যটি আদালত নথিভুক্ত করুক যে, যিনি জামিনে রয়েছেন, তাঁর চিকিৎসার জন্য কোনও স্বাধীন মেডিক্যাল বোর্ডের অনুমতি বা মতামত নেওয়ার প্রয়োজন নেই। যদি আদালত সেই মত না-মানে, তা হলে আমার আবেদনটি খারিজ করে দিতে পারেন। আমার মক্কেল তাঁর পছন্দের চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা করাতে চান।
অভিষেক এসএসকেএম-এ যেতে চান কি না, জানতে চান বিচারপতি। রেবেকা জানিয়ে দেন, অভিষেক মেডিক্যাল বোর্ডের সামনে উপস্থিত হবেন না। তিনি বিদেশে গিয়েই চিকিৎসা করাতে চান। অভিষেকের চিকিৎসক কোন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, তা জানতে চান বিচারপতি। অভিষেকের চিকিৎসা সংক্রান্ত নথির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন বলেও জানান বিচারপতি। রেবেকা আদালতে জানান, অভিষেকের চোখের চিকিৎসক একজন নিউরো-অপথ্যালমোলজিস্ট। বিচারপতি বলেন, “যদি চিকিৎসা খুবই জরুরি হয়, তাহলে তা আমাদের দেশেও করানো সম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ভারত কোনও অংশে পিছিয়ে নেই।”
অভিষেকের আইনজীবী বলেন, “কোথায় চিকিৎসা করাবেন, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়। তিনি কোন দেশে বা কোন হাসপাতালে যাবেন, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। নিজের পছন্দের চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা করানোর অধিকার তাঁর রয়েছে।”

