মমতাপন্থী মহুয়া মৈত্রকে থানায় হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের!
ধর্মীয় অবমাননার মামলায় সশরীরেই থানায় হাজিরা দিতে হবে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে। তাঁর ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদনে শুক্রবার কর্ণপাত করেনি সুপ্রিম কোর্ট। শেষে আবেদন তুলে নিতে হয়েছে মহুয়ার আইনজীবীকে। ডিম ছোড়ার ঘটনা উল্লেখ করে থানায় ভার্চুয়াল হাজিরার আবেদন জানিয়েছিলেন মহুয়া। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দৃষ্টান্ত টানেন এবং জানিয়ে দেন, কোনও সাংসদেরই ডিমকে ভয় পাওয়া উচিত নয়।
ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে মহুয়ার বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে এ রাজ্যের নদিয়ার হোগলাবেড়িয়া থানায়। সেই মামলায় কৃষ্ণনগরের সাংসদকে রক্ষাকবচ দিয়েছে কলকাতা হাই কোর্ট। গত ২১ জুলাই হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চ জানায়, অক্টোবর পর্যন্ত মহুয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে না। তবে এই সময়ের মধ্যে তদন্তে সহযোগিতা করবেন তিনি। আগামী ১৪ অগস্ট মহুয়াকে সশরীরে থানায় হাজিরা দিতেও বলেছিল উচ্চ আদালত। হাই কোর্টের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে মহুয়া সুপ্রিম কোর্টে যান। তবে আদালত তাঁর আবেদন গ্রাহ্য করেনি।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি শীল নাগুর বেঞ্চে মহুয়ার আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণের সওয়াল, থানায় হাজিরা দিতে তাঁর মক্কেলের কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু তা ভার্চুয়াল মাধ্যমেও করা যায়। তখন বিচারপতি দত্ত মৌখিক পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘‘কেন? তিনি সাংসদ বলে?’’ এর পরেই ডিম ছোড়ার প্রসঙ্গ টানেন মহুয়ার আইনজীবী। জানান, আগের দিন ওই এলাকাতেই তাঁর মক্কেলকে নিশানা করে ডিম ছোড়া হয়েছিল। নানা ভাবে তাঁকে হেনস্থা করা হয়েছিল। থানায় হাজিরা দিতে গেলে আবার সেই পরিস্থিতি এবং বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে আইনজীবী আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এর পরেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত টানে আদালত।
বিচারপতি দত্তের মন্তব্য, ‘‘রাজনীতিতে যখন নেমেছেন, ডিমের ভয় পাচ্ছেন কেন? আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা তো বুক পেতে গুলি খেয়েছিলেন।’’ সাংসদের সামান্য ডিম ছোড়ার মতো ঘটনাকে ভয় পাওয়া উচিত নয় বলে মনে করে শীর্ষ আদালত। এর পরেই মহুয়ার আইনজীবী মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জানান। বিচারপতি সেই অনুমতি দিয়েছেন। অর্থাৎ, ধর্মীয় অবমাননা মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশই বহাল থাকছে। মহুয়াকে ১৪ অগস্ট সশরীরে নদিয়ার থানায় হাজিরা দিতে হবে এবং তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।
গত ১ জুলাই নদিয়ায় বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন মহুয়া। ওই দিন তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম, পাথর ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। সেই সময় বোরখা পরা নিয়ে মহুয়ার কিছু মন্তব্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তা নিয়ে থানায় অভিযোগ দায়ের হয়। হাই কোর্ট থেকে রক্ষাকবচ পেয়েছেন কালীঘাট শিবির ঘনিষ্ঠ তৃণমূল সাংসদ।
উল্লেখ্য, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতাদের লক্ষ্য করে একাধিক বার ডিম ছোড়া হয়েছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে কুণাল ঘোষ, অনেকেই এই ধরনের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য ডিম ছোড়ার বিরোধিতা করেছেন প্রকাশ্যেই। জানিয়েছেন, এটা পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি নয় এবং বিজেপি কর্মীরা ডিম ছুড়ছেন না। বিজেপির তরফে একে ‘গণরোষ’ বলা হচ্ছে। আবার আক্রান্ত তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, গণরোষের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে রাস্তাঘাটে ডিম ছুড়ে।
সুপ্রিম কোর্ট এমন মন্তব্য করলে মহুয়া নিরাপত্তা চাইতে কোথায় যাবেন? প্রশ্ন তুলেছেন কালীঘাটপন্থী নেতা কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, ‘‘কী হয়েছে খোঁজ নিচ্ছি। তবে আদালত যদি এ কথা বলে থাকে, তা হলে প্রশ্ন, নিরাপত্তার কথা কোথায় গিয়ে বলবেন মহুয়া? পুলিশ তো পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিচ্ছে না।’’ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘কোর্ট মশকরা করে এ কথা বলে থাকতে পারে। তবে লিখিত নির্দেশে এটা উল্লেখ করা সম্ভব নয়।’’ একই মত সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অশোক গঙ্গোপাধ্যায়েরও।

