অসহিষ্ণু বিজেপি-শাসনে ড. আম্বেদকর চর্চার প্রাসঙ্গিকতা / এম এম আব্দুর রহমান
এম এম আব্দুর রহমান : ভারতের কোটি কোটি মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছেন বাবাসাহেব ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকরকে— ৬ ডিসেম্বর, যাঁর প্রয়াণ দিবসটি ‘মহাপরিনির্বাণ দিবস’ নামে পরিচিত। যে সময়ে তাঁর রচিত মহান ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক আদর্শ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায় বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে, ঠিক তখনই তাঁর আদর্শ চর্চার প্রাসঙ্গিকতা আরও গভীর।
ভারতে বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং সংবিধানের মৌলিক আদর্শের উপর আঘাতের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষত, তপশিলি, আদিবাসী এবং মুসলমান—এই তিনটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে নিপীড়ন, বঞ্চনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির কারণে দুর্বলতার শিকার হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করার জন্য এই তিনটি জনগোষ্ঠীকে এক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করা অপরিহার্য।

এই ঐক্যের আদর্শগত ভিত্তি ও পথপ্রদর্শক হতে পারেন ভারতীয় সংবিধানের স্থপতি, ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। তাঁর চিন্তাধারা ও সংগ্রাম বর্তমান সঙ্কটকালে এক নতুন দিশা দেখাতে পারে। ড. আম্বেদকরের সমগ্র জীবন ও দর্শন ছিল সামাজিক ন্যায়, স্বাধীনতা (Liberty), সাম্য (Equality) ও মৈত্রী (Fraternity)-এর উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি হিন্দু সমাজের জাতিভিত্তিক শোষণ এবং অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। এই ধারণা দলিতদের স্ব-মর্যাদার সংগ্রামে এখনও মূল চালিকাশক্তি। আম্বেদকরই নিশ্চিত করেছেন যে সংবিধানের মাধ্যমে তপশিলি, আদিবাসী এবং অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী (ওবিসি) বিশেষ সংরক্ষণ (Reservation) এবং আইনি সুরক্ষা পাবে। তাঁর মতে, গণতন্ত্র শুধু একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়, বরং তা একটি জীবনধারা—যেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে প্রতিটি নাগরিকের জন্য মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়। বিজেপি সরকারের আমলে এই তিনটি জনগোষ্ঠীই চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন। আম্বেদকরের চিন্তাধারা তাদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সুনির্দিষ্ট ভিত্তি দেয়।
আম্বেদকরের সমালোচনার মূল লক্ষ্য ছিল সেই ব্রাহ্মণ্যবাদী (Brahmanical) ব্যবস্থা, যা শ্রেণিবিন্যাস এবং বৈষম্য সৃষ্টি করে। বর্তমান সময়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি এই ব্রাহ্মণ্যবাদী ব্যবস্থাকেই প্রচ্ছন্ন বা প্রকাশ্যে সমর্থন করে। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই তপশিলি, আদিবাসী ও মুসলমানরা এক সাধারণ লড়াইয়ের ক্ষেত্র খুঁজে পেতে পারে। ড. আম্বেদকর বহুবার ‘মনুস্মৃতি’-র মানবতাবিরোধী বিধানের তীব্র সমালোচনা করেছেন, যা বর্তমান হিন্দুত্ববাদী আদর্শের ভিত্তি। এই সমালোচনা ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদের পথ তৈরি করে।
আম্বেদকর সংবিধানের মাধ্যমে আদিবাসীদের জন্য বিশেষ অধিকার, যেমন পঞ্চম ও ষষ্ঠ তফসিল (Fifth and Sixth Schedules) এবং উপজাতীয় কল্যাণমূলক ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। আদিবাসীদের বন-জঙ্গল ও জল-জমির অধিকার (Jal-Jungle-Jamin) রক্ষায় বর্তমানে যে আন্দোলন চলছে, তা আম্বেদকরের দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের ভিত্তিতেই আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সংবিধানের রূপকার হিসেবে আম্বেদকর ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকারকে (অনুচ্ছেদ ২৫ থেকে ২৮) মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর কাজকে চর্চা করলে মুসলমানরা বুঝতে পারবে যে, তাদের অধিকার ভারতের মূল সংবিধানে কীভাবে সংরক্ষিত, এবং এই অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে তপশিলি ও আদিবাসীরা আদর্শগতভাবে তাদের সহযোগী। তবে, তপশিলি ও মুসলমানদের মধ্যে ঐতিহাসিক দূরত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং হিন্দুত্ববাদী শক্তির দ্বারা পরিকল্পিত মেরুকরণ এই ঐক্যের প্রধান বাধা।
ঐক্যের পথ ও পন্থা :
ড. আম্বেদকর মনে করতেন, শিক্ষিত হও (Educate), সংগঠিত হও (Organise), আন্দোলন করো (Agitate)। এই মন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে তপশিলি, আদিবাসী ও মুসলমান সমাজের মধ্যেকার তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে হবে। সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা, অর্থনৈতিক ন্যায়, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষায় সমানাধিকারের মতো সাধারণ ইস্যুগুলির উপর ভিত্তি করে তিনটি গোষ্ঠীর যৌথ রাজনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চ তৈরি করা। পরস্পরের বঞ্চনার প্রকৃতি অনুধাবন করার জন্য তপশিলি, আদিবাসী ও মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনার ব্যবস্থা করা।
বিজেপির এই অসহিষ্ণু শাসনামলে ড. আম্বেদকর চর্চা নিছকই ঐতিহাসিক আলোচনা নয়; এটি একটি রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা। তাঁর সাম্য, মৈত্রী ও ন্যায়বিচারের আদর্শকে ধারণ করে তপশিলি, আদিবাসী ও মুসলমান—এই তিনটি প্রধান জনগোষ্ঠী একটি বৃহত্তর সামাজিক ঐক্যে মিলিত হতে পারে। এই ঐক্যই কেবল বর্তমান প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সাম্যবাদী ভারত গড়ে তোলার পথ দেখাতে পারে। ড. আম্বেদকরের চিন্তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সামাজিক বিপ্লব ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা মূল্যহীন।
*লেখক পরিচিত*
এম এম আব্দুর রহমান
সম্পাদক, রোডম্যাপ
বাড়ি – উলুবেড়িয়া, হাওড়া

