কলকাতা 

কংগ্রেস নেতৃত্ব-ই ভারতীয় পরম্পরা , ধারণাকে মানুষের সামনে হাজির করার চেষ্টা করছেন , এই ধরনের সংকটময় পরিস্থিতিতে এটা কম কথা নয় : আবদুস সাত্তার

শেয়ার করুন
  • 360
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমাদের দেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর ৭২ টি বছর পার করেছে। আজও দেশের সাধারণ মানুষ সেই অর্থে স্বাধীনতা পেয়েছে কী ? ৭২ বছর পর হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রাপ্তির চেয়ে অপ্রাপ্তির সংখ্যাটাই বেশি করে চোখে পড়ছে। ৭২ বছর পরও এদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামনের সারিতে আনার প্রতিশ্রুতি এখনও দেওয়া হয় । দলিত-সংখ্যালঘুরা এতদিন ধরে যে অর্জিত স্বাধীনতার সম্পদ ভোগ করে আসছিল তা আগামী দিনে থাকবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতীয়তাবাদ এমন জায়গায় পৌছে গেছে যে আজ দেশের সব রাজনৈতিক দলই মন্দিরমুখী হয়ে পড়েছে । স্বাধীনতার ৭২ বছর পর এদেশের দলিত-সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে বাংলার জনরব নিউজ পোর্টালের মুখোমুখি নব বালিগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ের সিনিয়র অধ্যাপক এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের প্রাক্তন মন্ত্রী ড. আবদুস সাত্তার । স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রথম সাক্ষাৎকারটি  প্রকাশ করা হয়েছে ১৫ আগষ্ট । আজ পঞ্চম কিস্তি প্রকাশ করা হচ্ছে । এরপর থেকে প্রতিবার শনিবার রাতে ধারাবাহিকভাবে বিস্তারিত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্ন : রাজ্যসভায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে কংগ্রেসের  কোনো প্রতিনিধি না থাকলেও রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বদাই সংখ্যালঘুদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে  । কী বলবেন ?

ড. আবদুস সাত্তার :  এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই । স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস সব সময়ই বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু প্রতিনিধির বিষয়টি মর্যাদা সহকারে গুরুত্ব প্রদান করেছে । সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলাগুলিতে কংগ্রেসের আধিপত্য জনিত কারণে হয়তো এটা সম্ভবপর হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় আজ পর্যন্ত  দল নির্বিশেষে যে ক‘জন সংখ্যালঘু মুসলিম রাজনীতিবিদ বিরোধী দলনেতার আসন অলংকৃত করেছেন , তাঁরা সকলেই কংগ্রেস দলের ; এতো ঐতিহাসিক সত্য । অবশ্য শুধু রাজ্যেই নয়, লোকসভাতেও তাদের দলনেতা হলেন অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধি এবং রাজ্যসভায় বিরোধী দলনেতার আসনে একজন মুসলিম। রাজনৈতিক সদিচ্ছা পুরোমাত্রায় না থাকলে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

মনে রাখতে হবে আরএসএস বিজেপি-র তথাকথিত ‘ রাজনৈতিক হিন্দুত্বে‘র সঙ্গে উন্নয়নের শ্লোগান মিশ্রিত মোদী ঝড়ে কংগ্রেস সারা দেশে ২০১৪-এর লোকসভায় সদস্য সংখ্যার নিরিখে তলানিতে এসে পৌঁছেছিল । স্বাধীনতার পর লোকসভায় সব থেকে কম সংখ্যক অর্থাৎ মাত্র ৪৪ টি আসন জিতে ছিল। মোদীত্বের ভরা জোয়ারে এই ধরনের বহুত্ববাদী ভাবনা বিশিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা খুব সহজ কাজ ছিল না। ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী বহু রাজনৈতিক দল এই ক্রান্তিকালীন সময়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভাবাবেগের কথা চিন্তা করে তারা আপনাতে আপনি সর্বস্য হয়ে থেকেছে । কিন্ত দুঃসময়ে, কঠিন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভয়ঙ্কর নির্বাচনী বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও এই সাহসী ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত কংগ্রেস নেতৃত্ব গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এর মূলে রয়েছে ভারত নামক ভাবনা আদর্শ ও বিচারবোধ । আরএসএস বিজেপি একদিকে যেমন বিগত চার বছরে বহুত্ববাদী ভাবনা , ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টিকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে অপরদিকে কংগ্রেস নেতৃত্ব ভারতীয় পরম্পরা , ধারণাকে মানুষের সামনে হাজির করার চেষ্টা করছে । এই ধরনের সংকটময় পরিস্থিতিতে এটা কম কথা নয়।

প্রশ্ন : তাহলে কি সমস্ত ক্ষেত্রে সম প্রতিনিধিত্বের দাবি উত্থাপন করা দরকার ?

ড. আবদুস সাত্তার : অবশ্যই এর জন্য সমাজের সর্বস্তরে দাবি , আন্দোলন, মানুষকে সচেতন করার প্রয়াস সংগঠিতভাবে করতে হবে । কেননা, স্বাধীনতা-পরবর্তী সত্তর বছরের পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের ঘটনাক্রম এই সাক্ষ্যই বহন করে যে  এক বিশেষ শ্রেণির আধিপত্য‘ বাম-ডান ‍নির্বিশেষে জয়ী হয়েছে । সরকার আসে , সরকার যায় । সরকারে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন হয় কিন্ত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয় না । আবার এও নিষ্ঠূর বাস্তব যে , সংরক্ষণ না থাকলে পিছিয়ে পড়া মানুষদের দেশের এবং অবশ্যই এই রাজ্যের মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলগুলি কোনোমতেই জায়গা ছাড়তে রাজি হয় না। শুধু তাই নয়, কৌশলে এই অংশের একজন নেতার বিরুদ্ধে আর একজনকে ঠেলে দেওয়া হয় । সব জেনে বুঝেও তারা এই সুযোগ সন্ধানী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় । কেননা, তারাও জানে যে, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলিতে তাদের জায়গা/ পরিসর খুবই সীমিত। ফলত, সেই সংকীর্ণ স্তরে পৌঁছানোর লড়াই চলতে থাকে । বৃহত্তর পরিসরের ভাবনাও কমতে থাকে । এই ভাবনারই সত্যতার পরিচয় পাওয়া যায় রাজ্যসভা, লোকসভা, মন্ত্রিসভা, মেয়র পারিষদ অথবা স্বশাসিত সংস্থাগুলির চেয়াম্যান পদগুলির মনোনয়নের ক্ষেত্রে । দলিত সংখ্যালঘু হলেই তা সে যে কোনো স্তরের নেতাই হোন না কেন তাকে প্রায় অবধারিতভাবে ধর্মীয় , জাতপাতের ভাবাবেগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেই দপ্তরের মধ্যেই  সীমাবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস চলে  আসছে। এর সঙ্গে অবশ্য , ‘কপালগুণে ‘ কখনো-সখনো দু একটা মানানসই দপ্তর জোটে কিন্ত সার্বিকভাবে প্রথম শ্রেনির  রাজনৈতিক মর্যাদার কখনোই হয় না । ফলত , নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো উল্লেখ্যযোগ্য প্রতিফলন ঘটে না।

স্বাধীনতার ৭১ বর্ষ অতিক্রম করেও তাই কাঙ্খিত সুষম উন্নয়ন আজো হয়নি। সামাজিক ন্যায় বিচার ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি এখনো এক দূরতম দ্বীপ বলেই মনে হয়। সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের মতো রাজনৈতিক স্তরেও পিছিয়ে পড়া মানুষজনদের ব্রাত্য করে না রেখে সর্বস্তরে উন্নয়নের সহযোগী করার চেষ্টা করতে হবে। এখানেই গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।


শেয়ার করুন
  • 360
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment