জেলা 

কলকাতা ছাড়িয়ে গ্ৰামীণ বনেদী বাড়ির পুজো

শেয়ার করুন

——————-‌- ‌ তিন শতাব্দী প্রাচীন রায় পরিবারের দুর্গোৎসবে মায়ের চামুণ্ডা মূর্তি – মায়ের আদেশেই বলি বন্ধ ‌ ‌অভিজিৎ হাজরা, আমতা, হাওড়া :- ‌ জমিদারি আমলে অনেক দুর্গা পূজা শুরু হয়েছিল। জমিদারি প্রথা ও অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর অনেক দুর্গা পূজা ও বন্ধ হয়ে গেছে আর্থিক সমস্যার কারণে। কিছু কিছু পুজা এখনো নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলে আসছে। জমিদারি আমলে এই সমস্ত পুজা গুলি অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে হয়ে আসলে ও এখন জাঁকজমক কমলেও অনেক পূজা আজ ও অমলিন এই পুজার ঐতিহ্য। জমিদার আমলে চালু হওয়া গ্ৰামীণ হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমার আমতা ২ নং পঞ্চায়েত সমিতির অধীন অমরাগড়ী গ্ৰাম পঞ্চায়েতের অমরাগড়ী গ্ৰামের রায় পরিবারের দুর্গা পূজা ৩০৭ বছরে পদার্পণ করেছে। এই পুজো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আগে এই পরিবারের শ্রী শ্রী ঁ গজলক্ষী মাতা এস্টেট সম্পর্কে জানতে হবে,আর এই প্রসঙ্গে এই এস্টেটের বর্তমান সম্পাদক তথা অমরাগড়ী রায় পরিবারেরই অন্যতম সদস্য সৌরভ রায় জানান, তাঁদের এই এস্টেটটি গঠিত হয়েছিল বাংলার ১১২৬ বঙ্গাব্দের ১৫ ই বৈশাখ। বর্তমানে ৩০৭ বছরে পদার্পণ করেছে এই এস্টেটি। এই এস্টেটের ও দুর্গা পূজার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বর্ধমানের মহারাজের অধীনস্থ জমিদার স্বর্গীয় শান্তি রায়। তিনি একটা সময়ে বাণিজ্য করতে বেড়িয়ে এই গ্ৰামে যাত্রী যাপনের জন্য নৌকা নোঙর করেন। সেই রাতেই মা গজলক্ষী স্বর্গীয় শান্তি রায়কে স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন, ” তুই আমায় ছেড়ে কোথাও চলে যাস না। তুই এখানেই আমার প্রাণ প্রতিষ্ঠা কর ” । সেই স্বপ্নাদেশ পেয়েই তিনি অমরাগড়ী গ্ৰামে বসবাস শুরু করেন।গ্ৰামবাসীদের নিয়ে গড়ে তোলেন শ্রী ঁ গজলক্ষী মাতা এস্টেট। তিনি বাইরে থেকে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষজনদের এই গ্ৰামে এনে বসবাস করানোর ব্যবস্থা করে গ্ৰামটিকে একটি আদর্শ গ্ৰামে রূপান্তরিত করেন। সেই থেকেই আজ পর্যন্ত এই এস্টেটের একই নিয়মে চলে আসছে। এই এস্টেটের বিভিন্ন পূজার্চনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১ লা বৈশাখ, রথযাত্রা, জন্মাষ্টমী, রাসযাত্রা,দশহারা, শিবরাত্রির পুজা,মকর সংক্রান্তি,চাঁচড়,দোল উৎসব,চৈত্র সংক্রান্তি,ঝাঁপ ও গাজন উৎসব। এছাড়াও নিত্যসেবা,শ্রী শ্রী ঁ গজলক্ষী মাতা দেবী ও তিনটি শিব মন্দিরের পুজা এখনো চলে আসছে। সেই সঙ্গে বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব মহাপুজা দুর্গা পূজা ও চলে আসছে ৩০৭ বছর নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। ‌ ‌ এই এস্টেটের বর্তমান সভাপতি অসিত কুমার রায়, সম্পাদক সৌরভ রায়, কোষাধ্যক্ষ দিব্যেন্দু রায় সহ চোদ্দো জন সদস্য – সদস্যাবৃন্দের দ্বারা দুর্গা পূজা সহ অন্যান্য উৎসব পরিচালিত হচ্ছে।অমরাগড়ী শ্রী শ্রী ঁ গজলক্ষী মাতা এস্টেটের দুর্গা পূজা এই বছর ৩০৭ তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এই পুজার বৈশিষ্ট্য একচালা প্রতিমা, চামুণ্ডা মূর্তি। মহালয়ার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে শুরু হয়ে যায় এই রায় পরিবারের দুর্গা পূজা । দেবীর চন্ডীপাঠ , নিত্যদিনের সন্ধ্যারতির মাধ্যমে প্রতিপদের দিন থেকেই রায় পরিবারের দুর্গোৎসব পূর্ণমাত্রা এনে দেয়। ‌ একটা সময় এই পুজো অত্যন্ত জাঁকজমক সহকারে হতো। সারারাত ধরে যাত্রা হতো। পুজার সময় মহিষ বলি হতো। কামানের তোপধ্বনি করে পুজোর সূচনা হতো। কালক্রমে সব বন্ধ হয়ে গেছে ।এখন কামানের তোপধ্বনির পরিবর্তে গাছ বোমা ফাটিয়ে পুজার সূচনা হয়। কথিত আছে,প্রায় ১৮৪ বছর আগে এই পুজোয় মহিষ বলি হতো। বর্তমানে বলি বন্ধ। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, ১৮৪ বছর আগে এই অমরাগড়ী এলাকাটি ছিল জল – জঙ্গল,পশু – জন্তুদের বাসস্থান।শোনা যায়, ১৮৪ বছর আগে দুর্গা পূজার সন্ধিপুজোর সময় ছিল রাত্রে।কামার মহিষ বলি দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বলি দেওয়ার কাতান সহ রাত্রে বেড়িয়ে ছিল। রাস্তায় কামারকে হঠাৎই বাঘে ঘেরে।কামার বাঘের ভয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পাশের একটি গাছে উঠে পড়ে। অনেকক্ষণ হল বাঘ আর সরছে না। এদিকে সন্ধিক্ষণের সন্ধিপূজার বলির সময় এগিয়ে আসছে। বাঘটি তখন ও একই ভাবেই গাছের নিচে বসে আছে। কোনো ভাবেই সরছে না। এদিকে পুজার মন্ডপে সন্ধিপূজার ঘন্টা পড়েছে।তখন ও বাঘ গাছের নিচে থেকে সরছে না।তখন কামার কোনো উপায় না দেখে দেবীর নাম স্মরণ করে গাছ থেকে লাফ দিলে বাঘের ঘাড়ের উপর পড়ে।কামারের হাতে থাকা কাতানের আঘাতে বাঘের মন্ডুচ্ছেদ হয় ও সন্ধিপুজার ও বলি ওখানেই সমাপন ঘটে। সেই রাতেই দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন, ” কিরে আমার বাহনকে মেরে ফেললি? তোরা এবার থেকে বলি বন্ধ কর ” । সেই থেকেই বলি বন্ধ হয়ে গেছে। অমরাগড়ী রায় পরিবারের দুর্গা পূজার পঞ্চমীর দিন রায় পরিবারের মেয়ে , গৃহবধূরা প্রায় ১,০০০ – ১,৫০০ (এক হাজার থেকে দেড় হাজার ) পিস নারকেল নাড়ু তৈরি করে মাকে নিবেদন করেন । সপ্তমীর দিন নবপত্রিকাকে পালকির মতো দুলিয়ে পুজা মন্ডপে প্রবেশ করানো হয় । অষ্টমীর দিন নির্দিষ্ট সময়ে সন্ধিপুজো,হোম,ধূনোপোড়া,আরতি,১০৮ টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। পুজার নবমীর দিন সন্ধ্যেবেলায় লুচি ও দানাদার ভোগ পুজা মন্ডপে উপস্থিত সকলকে বিতরণ করা হয়। এই পুজার আর ও একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এই দুর্গা প্রতিমা দশমীর দিন দুপুর ১২ টার পর সূর্যাস্তের আগে বিসর্জন করতে হয়। এর কারণ ১৫২ বছর আগে এই রায় পরিবারের এক সদস্য দশমীর দিন দুপুর ১২ টার সময় মারা যান। সেই থেকেই অমরাগড়ী রায় পরিবারের দুর্গা প্রতিমা দুপুর ১২ টার পর সূর্যাস্তের আগে বিসর্জন হয়ে আসছে। এই দুর্গা প্রতিমা বিসর্জন হয় মন্দিরের পাশে প্রতিষ্ঠা করা পুকুরে। অমরাগড়ী গ্ৰামের রায় পরিবারের দুর্গা পূজায় সম্প্রীতির চিত্র ফুটে ওঠে।প্রতি বছর দুর্গা পূজার আগে গ্ৰামের মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজমিস্ত্রিরা মন্দিরের ভিতরে ও বাইরে সংস্কার, মন্দিরের ভিতরে ও বাইরের রং করা, দুর্গা মন্ডপের পাশে এই শ্রী শ্রী ঁ গজলক্ষী মাতা এস্টেটের অন্যান্য মন্দির গুলির সংস্কার ও রং করে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় প্রতিমাকে কাঁধে করে বহনে সহযোগিতা করে। অমরাগড়ী গ্ৰামে একটাই দুর্গা পূজা।এটি এখন আর রায় পরিবারের পুজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সকল সম্প্রদায়ের মানুষজনরা প্রত্যহ পুজা মন্ডপে আসেন,পুজা দেন।পুজা মন্ডপে এসে পুজা দেখেন,একে অপরের সঙ্গে সুখ – দুঃখের গল্প করেন।একে অপরের খোঁজ খবর নেন ও একে অপরের সুখ – দুঃখের সাথী হন। পুজার দিন গুলিতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের উৎসব মন্ডপে উপস্থিতি মিলনস্থলে রূপ দেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে অমরাগড়ী রায় পরিবারের আয়ের উৎস চাষাবাদ থেকে। কিন্তু এবারে ডি ভি সি – র ছাড়া জলে চাষাবাদ অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।তাই পুজোর আয়োজনে আর্থিক সমস্যায় পড়েছে রায় পরিবারের সদস্যরা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ বছর দুর্গা পূজার উদ্যাক্তাদের এক লক্ষ টাকা অনুদান ঘোষণা করে প্রদান করছেন। পারিবারিক পুজা গুলোকে এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করেন নি। পুজার অনুদান চেয়ে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন বলে জানালেন শ্রী শ্রী ঁ গজলক্ষী মাতা এস্টেটের সম্পাদক সৌরভ রায়। তিনি বলেন, ” ৩০৭ বছরের এই দুর্গা পূজার আয়োজনে এই প্রথমবার আর্থিক অনুদানের জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করলাম। অনুদান পেলে দুর্গা মন্ডপের পূঙ্গাঙ্গ সংস্কার, দুর্গা মন্ডপের পাশে থাকা অন্যান্য মন্দির গুলির সংস্কারের কাজ করা যাবে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ