সর্বস্তরের মানুষের মুক্তির চিন্তা করেছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়ক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ/ নায়ীমুল হক
নিজস্ব চেষ্টা-সাধনায় প্রখর– প্রতিভাবলে তাঁর ভাবনার বিস্তৃতি পৌঁছেছিল সর্বস্তরে। দর্শন, সমাজতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব, রাজনীতি সর্ব অঙ্গনে তাঁর বিচরণ ছিল সাবলীল। প্রথাগত পড়াশুনার বাইরে থেকে বাইরে তার সমস্ত শিক্ষালাভ। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন শিক্ষক *নায়ীমুল হক*
〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️〰️

পুরো নাম ছিল তাঁর আবদুল কালাম গোলাম মুহিউদ্দীন আহমেদ বিন খাইরুদ্দিন আল-হুসাইনি আজাদ। ভারতীয় উপমহাদেশে স্বাধীনতা আন্দোলনে অনন্য এক চরিত্র।। সকলে আমরা যাঁকে জানি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ হিসেবে। তাঁর জন্ম সৌদি আরবের মক্কায়। বেড়ে ওঠা ও লেখাপড়া কলকাতায় একদম ঘরোয়া পরিবেশে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা না পাড়িয়েও সমাজতত্ত্ব, দর্শন, ধর্মনীতিতে অর্জন করতে পেরেছিলেন বিশেষ এক ব্যুৎপত্তি। নিজের প্রখর প্রতিভাবলে নীতি নিষ্ঠায় মেরুদন্ড সহজ করে চলতে শিখেছিলেন তিনি। কিশোর বয়স থেকেই বিভিন্ন ভাষায় দর্শনচর্চায়, কবিতায় , সাংবাদিকতায় হাত পাকিয়েছিলেন তিনি। পবিত্র কোরআনের (আংশিক) অনুবাদ করেছিলেন তিনি।
‘ইমামুল হিন্দ’ বলা হতো তাকে, আবার আরেক দিকে কংগ্রেসের সর্বকনিষ্ঠ সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে বরণ করে নেওয়া হয়েছিল তাঁকে। নীতি নিষ্ঠার কষ্ঠী পাথরে যাচাই করে চলার মানুষ ছিলেন তিনি। নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে কখনোই সমঝোতা করতে প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। এর জন্য বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। বরেন্য মানুষের সান্নিধ্যে এসে বুঝতে চেয়েছিলেন তিনি নিজেকে, স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা গড়ে তোলাই ছিল তার অন্যতম কারণ।জামালুদ্দিন আফগানীর ইসলামী মতবাদ, স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের আলীগড় চিন্তাধারার প্রতিও অনুরক্ত ছিলেন তিনি। জওহরলাল নেহরুর সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তাঁর। মানুষে মানুষের বৈষম্যকে তিনি মানতে পারতেন না, তাই তিনি সমাজতন্ত্রের পথে নেহরুকে সমর্থন জানান। মুসলিম রাজনৈতিক দল মজলিস-ই-আহরার-উল-ইসলামের সঙ্গে কিছুটা সম্পৃক্ততা গড়ে উঠেছিল তাঁর। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে গান্ধীজির অহিংস নীতিকে সমর্থন জানান তিনি এবং ডান্ডি মার্চে অংশগ্রহণ করেন। তার সম্পাদিত উর্দু সাপ্তাহিক আল হেলাল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ছিল খড়্গহস্ত, তাই তাঁকে বারবার কারাগার বরণ করতে হয়। আল হেলাল নিষিদ্ধ হলে নাছোড়বান্দা আজাদ প্রকাশ করেন আল বালাগ। সেটাও পরে নিষিদ্ধ হয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা এবং নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করাই ছিল এ সমস্ত কর্মকাণ্ডের মুখ্য উদ্দেশ্য। তার পাণ্ডিত্য ব্যক্তিত্বের সামনে সমস্ত কিছু প্লান হয়ে যেত ব্রিটিশ ভাইসরয় ও কূটনীতিকদের সাথে সংলাপে তিনি ছিলেন কংগ্রেসের যোগ্য প্রতিনিধি। জিন্নাহর পাকিস্তান দাবির সামনে সকলেই যখন জবাবহীন, তখনও কিন্তু মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ছিলেন দৃঢ়চেতা, তাঁর চিন্তা চেতনায় ছিলেন তিনি অটল।
অবশেষে স্বাধীন ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির রূপায়ণ দেখে তিনি মানসিকভাবে অনেকটাই ভেঙে পড়েন। লেখেন ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ শিরোনামে মনের কথা।
আজ সেই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের জন্মদিন। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জন্মদিনে পালিত হয় ‘জাতীয় শিক্ষা দিবস’। তাঁর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় নির্মিত হয় মহিলাদেরকে বিশেষভাবে শিক্ষিত করে তোলার ব্যবস্থাপনা, শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান ব্যবস্থা, তৈরি হয় ইউনিভার্সিটি গ্র্যান্ড কমিশন, গড়ে ওঠে খড়্গপুরে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, দিল্লিতে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া। সর্বস্তরের মানুষজনের জন্য ছিল তাঁর শিক্ষাচিন্তা। মুক্তিকামী জনগণের ‘আজাদী’ চিন্তায় দৃঢ়চেতা মানুষটির বহুমুখী ভাবনা চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

