রাজধানী কলকাতার বুকে অনুষ্ঠিত হলো ‘রহমাতুল্লিল আলামীন কনফারেন্স’: নবীজির সর্বজনীন শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান!
কলকাতা, ৬ সেপ্টেম্বর:ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কলকাতার বুকে আজ অনুষ্ঠিত হলো ‘রহমাতুল্লিল আলামীন কনফারেন্স’। নূরুল ইসলাম একাডেমী ও তাকরীবে মাজহাবের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইসলামি চিন্তাবিদ, আলেম-উলামা, শিক্ষাবিদ, কবি-সাহিত্যিক এবং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা অংশগ্রহণ করেন।
এ মহতি সম্মেলন মৌলালী যুব কেন্দ্রের ‘স্বামী বিবেকানন্দ অডিটরিয়ামে অনুষ্টিত হয়৷ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সর্বজনীন মানবিক আদর্শ, শান্তি, সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবকল্যাণের বাণীকে সামনে রেখে আয়োজিত এই সম্মেলন কলকাতার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল—মানবতার জন্য রহমত, শান্তির জন্য ঐক্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তাকরিবে মাযাহিবের সম্পাদক হুজ্জাতুল ইসলাম মাওলানা ড. সৈয়দ মুহাম্মদ সাদিক হুসাইনি, পূবের কলম পত্রিকার সম্পাদক জনাব আহমদ হাসান ইমরান,
পিরঃ তরিকত জনাব সৈয়দ রাশাদ আলী কাদরী, প্রফেসর রামচন্দ্র চন্দ্র করণ-বিদ্যিলঙ্কার, ফাদার স্যামল ঘোড়ুই, জনাব স্বরিন সিং, জনাব নূর হাসান শাহ ওয়ারিসী, মাওলানা কামারুজ জামান, মাওলানা শাহেদ নিজামী, মাওলানা তাফজল হুসাইন মল্লিক, মাওলানা মুনীর আব্বাস এবং মাওলানা সরওয়ার গাজী, বঙ্গিয় সংখ্যালঘুর সংগঠনের কার্যনির্বাহী সম্পাদক মাওলানা আব্দুর রউফ, নূরুল ইসলাম একাডেমীর সম্পাদক মাওলানা ড. মুহাম্মদ রিজওয়ান ইসলাম খান ও বঙ্গবাসি কলেজের প্রাক্তন প্রফেসর জনাব হায়দার হাসিন কাজেমী প্রমুখ।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন: “মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কেবল একটি নির্দিষ্ট জাতি, ভূখণ্ড বা সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত হননি; তাঁর জীবন ও আদর্শ সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, ন্যায়, দয়া, সহমর্মিতা ও মানবিক মর্যাদার এক অনন্য দৃষ্টান্ত”।
তাঁর শিক্ষা মানুষের মধ্যে বিভাজনের পরিবর্তে ভ্রাতৃত্ব, বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা এবং সংঘাতের পরিবর্তে শান্তির পথ দেখায়।
বিশেষভাবে বক্তারা বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, হিংসা ও অসহিষ্ণুতার আবহে মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শকে নতুন করে মানুষের সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাজনৈতিক চুক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানুষের হৃদয়ে সহমর্মিতা, ন্যায়বোধ ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা সৃষ্টি করা। আর সেই মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল আদর্শ হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য বার্তা
এই সম্মেলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক পরিমণ্ডলের ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণ। মুসলিম আলেম ও চিন্তাবিদদের পাশাপাশি হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির একটি সুন্দর বার্তা বহন করে।
বক্তারা মনে করেন, কলকাতার মতো বহুত্ববাদী সমাজে এমন আয়োজনের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ধর্ম মানুষের মধ্যে দেয়াল তৈরির জন্য নয়; বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে মানুষকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম শক্তি। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সংলাপের মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণ সম্ভব।
কবিতা ও সাহিত্যে নবীপ্রেম
অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণীয় পর্ব ছিল কবিতা ও শায়েরি পাঠ। আঘা সজাদ ওয়ারিসী, মুস্তাক আহমদ, এবং আঘা ফিরোজ হুসাইন প্রমুখ কবি ও শায়েররা মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর চরিত্রমাধুর্য এবং মানবতার প্রতি তাঁর অসীম দয়ার কথা কবিতা ও কাব্যিক পরিবেশনার মাধ্যমে তুলে ধরেন।
তাঁদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠানস্থলে সৃষ্টি হয় আবেগঘন ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ। উপস্থিত শ্রোতারা গভীর মনোযোগে কবিতা ও শায়েরি উপভোগ করেন।
কলকাতা থেকে বিশ্বমানবতার উদ্দেশে বার্তা
নূরুল ইসলাম একাডেমীর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে কলকাতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উচ্চারিত হয়েছে—ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতার মর্যাদা সবার জন্য সমান।
মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই সম্মেলন তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছে শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার একটি বৃহত্তর সামাজিক বার্তায়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, মহানবী (সা.)-এর জন্মের স্মরণ তখনই অর্থবহ হয়ে উঠবে, যখন তাঁর শিক্ষা মানুষের ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে প্রতিফলিত হবে। তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ কেবল আবেগে নয়—ন্যায় প্রতিষ্ঠা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, মানুষের প্রতি দয়া এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত।
কলকাতার মাটি থেকে তাই ‘রহমাতুল্লিল আলামীন কনফারেন্স’-এর বার্তা একটাই—মহানবী (সা.)-এর রহমত ও মানবিক আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে বিভাজন নয়, গড়ে তুলতে হবে ঐক্য; বিদ্বেষ নয়, ছড়িয়ে দিতে হবে ভালোবাসা; সংঘাত নয়, প্রতিষ্ঠা করতে হবে শান্তি।

