ওয়াক্ফ সংশোধনী আইন বাতিলের জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের ডাক মোহাম্মদ শাফির
বিশেষ প্রতিনিধি : গান্ধী ময়দানে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক “ওয়াক্ফ বাঁচাও, সংবিধান বাঁচাও” সমাবেশ ভারতের মুসলিম সমাজের অবিচল চেতনা এবং আমাদের সংবিধান রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির অটল সংকল্পের এক বিশাল প্রমাণ। সোস্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে আমি বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত লক্ষ লক্ষ নাগরিককে অভিনন্দন জানাই, যারা প্রখর রোদের মধ্যেও নিজেদের কণ্ঠ তুলে ধরেছেন ২০২৫ সালের অগণতান্ত্রিক ওয়াক্ফ সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে। ইমারতে শরিয়ার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশ শুধুই একটি প্রতিবাদ নয়; এটি এক ন্যায়ের আহ্বান, যা এই মাটিতেই একদা সংঘটিত স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করছে।
ওয়াক্ফ সংশোধনী আইন, ২০২৫, সংবিধানের ১৪, ২৫, ২৬ ও ৩০০(ক) অনুচ্ছেদের উপর সরাসরি আঘাত। পাঁচ বছর ইসলাম অনুশীলনের শর্তে ওয়াক্ফ ঘোষণার বিধান, “ব্যবহার দ্বারা ওয়াক্ফ” নীতির বিলুপ্তি, এবং ওয়াক্ফ সম্পত্তির উপর সরকারের অবারিত নিয়ন্ত্রণ—এসবই ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী, সংখ্যালঘু অধিকার বিপন্নকারী এবং ₹১.২ লক্ষ কোটি মূল্যের ওয়াক্ফ সম্পত্তির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ষড়যন্ত্র। বিহারে, যেখানে মুসলমানদের জনসংখ্যা ১৭% এরও বেশি, এই আইন আমাদের আর্থিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর সরাসরি আক্রমণ, বিশেষ করে যখন রাজ্যটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের মুখোমুখি।
এই সমাবেশ ছিল বিরল একতা ও সংহতির প্রতীক, যেখানে সুন্নি, শিয়া, সুফি সহ সমস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ভুলে ঐক্য গড়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান ও দলিত/আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের এক অসাধারণ সংহতি গড়ে উঠেছে। “জয় হিন্দ”, “জয় ভীম” এবং “জয় সংবিধান” ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে আমির-এ-শরিয়ত মাওলানা আহমদ ওয়ালি ফয়সাল রহমানির নেতৃত্বে সম্মিলিত দোয়া আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করেছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, সিপিআই (এমএল), বিকাশশীল ইনসান পার্টি, সমাজবাদী পার্টি, এসডিপিআই, এআইএমআইএম এবং বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি সংগঠনের নেতৃত্ব এই বার্তা দিয়েছে—এই লড়াই শুধুমাত্র মুসলমানদের নয়, এটি ভারতের সংবিধানের আত্মার রক্ষার সংগ্রাম।
এসডিপিআই এই ঐক্যজোটের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এই অসাংবিধানিক আইনের বিভাজনমূলক উদ্দেশ্যকে প্রত্যাখ্যান করি এবং এনডিএ সরকারকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি—আজকের ১০ লক্ষাধিক মানুষের বিশাল জমায়েত একটি মোড় ঘোরানোর বার্তা দিচ্ছে। মুসলিম সমাজ, তাঁদের ধর্মনিরপেক্ষ মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে, আমাদের অধিকার হরণ বা ওয়াক্ফ সম্পত্তি—যার মধ্যে রয়েছে মৌলানা মজহারুল হক বিশ্ববিদ্যালয় (যেখানে ৮৮% হিন্দু ছাত্র পড়ে)—লুটপাট হতে দেবে না।
এই সমাবেশ প্রতিরোধের এক দীপ্ত দৃষ্টান্ত, যা দিল্লি থেকে হায়দরাবাদ, কলাবুর্গি থেকে মাইসুরু পর্যন্ত একটি জাতীয় আন্দোলনের অংশ। আমরা ২০২১ সালের কৃষি আইন বাতিলের ইতিহাস থেকে প্রেরণা গ্রহণ করি এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ধারাবাহিক গণচাপ এই আইন প্রত্যাহার করতে সরকারকে বাধ্য করবে। এসডিপিআই এই আন্দোলনকে আরও বেগবান করার অঙ্গীকার করছে, ভারতের প্রতিটি কোণে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে আমাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য এবং এই অবিচারের রাজনৈতিক পরিণতি যেন বিহারসহ সমগ্র দেশে স্পষ্ট হয়, তা নিশ্চিত করবে।
এনডিএ সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা—ভারতের জনগণ, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক, এই জনগণ কোনো নীতির সামনে মাথা নত করবে না, যা বহুত্ববাদী কাঠামোকে ধ্বংস করে। আমরা লড়াই চালিয়ে যাব, যতক্ষণ না ওয়াক্ফ (সংশোধনী) আইন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।

