জেলা 

কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজের ইতিবৃত্তান্ত

শেয়ার করুন

দীপাঞ্জন দে: নদিয়ার সদর শহর কৃষ্ণনগরের প্রাণকেন্দ্রে সকলের অলক্ষ্যে জড়াজীর্ণ একটি ঐতিহাসিক ভবন কালের নীরব সাক্ষী হয়ে একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে। বহু মনীষীর আগমন ঘটেছে সেখানে। ইতিমধ্যে সেই ভবন ১৭৫তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। কিন্তু কোথাও কোনো শোরগোল নেই। ১৭৫তম বর্ষেও ‘কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজ’ অনালোচিত থেকে গেল। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজের এক ঘটনাবহুল ইতিহাস পাওয়া যাবে। কৃষ্ণনগরের ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে কেশবচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামতনু লাহিড়ী, বিদ্যাসাগরের মতো বহু মনীষীর পদধূলি পড়েছে। এখন সেই ভবন বিলুপ্তির পথে!

১৭৬৯ শকাব্দে (অর্থাৎ ১৮৪৭ খ্রি.) আমিনবাজার এলাকায় কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। যদিও সৌধটির গায়ে কোনো প্রতিষ্ঠা দিবস বা বর্ষের উল্লেখ নেই। তবে নদিয়া রাজবংশ সম্পর্কে জানার অন্যতম সাহিত্যিক উপাদান ‘ক্ষিতীশবংশাবলী চরিত’-এ এই সালটির উল্লেখ রয়েছে। কৃষ্ণনগরে প্রথম ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হয়েছিল কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণে মহারাজা শ্রীশচন্দ্র রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায়। কিন্তু কোনো কারণে রাজা মনক্ষুণ্ণ হওয়ায় ব্রাহ্মগণকে রাজবাড়িতে সমাজ করতে নিষেধ করেন। তখন ব্রাহ্মণগণ কৃষ্ণনগরের আমিনবাজারে একটি ছোট ভাড়া বাড়িতে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন। ব্রজনাথ মুখোপাধ্যায় সেখানে কিছুদিনের জন্য উপাচার্যের দায়িত্ব সামলেছিলেন। তার কিছুদিনের মধ্যেই মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে একজন বেদবত্তা ব্রাহ্ম উপাচার্য প্রেরণ করেন। কৃষ্ণনগরে ব্রাহ্ম ধর্মের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আনুকূল্যে ব্রাহ্মসমাজের বর্তমান ভবনটি নির্মিত হয়। এই ভবনটি উদ্বোধনের সময় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন এবং ভবন নির্মাণে ১০০০ টাকা প্রদান করেছিলেন বলেও জানা যায়।

ব্রাহ্মদের উপস্থিতি যে শুধু কৃষ্ণনগরে ছিল তা নয়, একাধিক ঐতিহাসিক উপাদান থেকে জানা যায় যে, সমগ্র নদিয়া জেলা জুড়েই ব্রাহ্মরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন। নদিয়ার অন্যতম প্রাচীন জনপদ শান্তিপুরেও ১৩০৪ বঙ্গাব্দে ব্রাহ্মসমাজ মন্দির নির্মিত হয়েছিল। শান্তিপুর ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ক্ষেত্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ও অঘোরনাথ রায় গুপ্ত প্রমুখরাও এর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রথমে বিভিন্ন ভাড়া বাড়িতে এই ব্রাহ্মসমাজের অধিবেশন বসত। তারপর বীরেশ্বর প্রামাণিক মহাশয় সম্পাদক থাকাকালে চাঁদা তুলে ১৩০৪ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে শান্তিপুর ব্রাহ্মসমাজের নিজস্ব ভবনটি স্থাপন করেন।

এবার এই ভগ্নপ্রায় ভবনটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে দু-এক কথা বলে নেওয়া যাক। এটি কৃষ্ণনগরের আমিনবাজার এলাকায় ১৩ কাঠা জমির উপর অবস্থিত। কৃষ্ণনগর পৌরসভার ১৪ নম্বর ওয়ার্ড। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির দিক থেকে আর এন ঠাকুর রোড ধরে এ ভি স্কুলের মোড়ের দিকে আসার সময় বামদিকে— একদম রাস্তার ধারেই দেখতে পাওয়া যাবে। কৃষ্ণনগরের ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরের বর্তমান ভবনটির সম্মুখ ভাগে সাতটি দরজা দেখতে পাওয়া যায়। মাঝের দরজাটির প্রায় এক ফুট উপরে বর্গক্ষেত্রাকারে একটি প্রস্তর ফলকে এখনো ইংরেজি হরফে ‘BRAHMOSAMAJ KRISHNAGAR’ এবং বাংলা হরফে ‘কৃষ্ণনগর ব্রাহ্মসমাজ’ লেখা পড়া যায়। ভবনের সামনে রয়েছে বড় প্রাঙ্গণ। একসময় এই ভবনে ব্রাহ্মদের আনাগোনা লেগেই থাকত। নিয়মিত উপাসনা করা হত। এখন সেই ভবন একেবারে পরিত্যক্ত।

লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।

 

 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ