আন্তর্জাতিক 

বাংলাদেশে আগুন জ্বলে ওঠার নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী মানসিকতা দায়ী! কোন কোন কারণে উত্তাল হয়ে উঠল বাংলাদেশ? জানতে হলে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

বুলবুল চৌধুরী: কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের আন্দোলনে। প্রথমে ছিল ন দফা দাবি বর্তমানে সেই দাবি এসে ঠেকেছে মাত্র এক দফায়। কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হলো? দেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতবর্ষ এর একটা দায়িত্ব ছিল! প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যেভাবে ছাত্রদের উপরে দমন পীড়ন চালিয়েছে তার পরিণতি যে খারাপ হতে পারে সেটা আমাদের দেশের বোঝা উচিত ছিল! প্রথম কথা হচ্ছে হাসিনা সরকার গোড়াতেই গলদ করে ফেলেছেন। ২০২৪ এর জানুয়ারি মাসে যে কায়দায় বাংলাদেশে ভোট করা হয়েছিল সেখানে জনমতের প্রতিফলন ঘটেনি। যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে এই সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ছিল । হাসিনা সরকারের একাধিক মন্ত্রী দুর্নীতি আমলাদের দুর্নীতি স্বজন পোষণ এতটাই মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আর অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি সাড়ে ৩০০ টাকা কিলো কাঁচা লঙ্কা বিক্রি হচ্ছে। বেআইনিভাবে হাসিনা ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা লুটপাট চালিয়েছে বাংলাদেশ জুড়ে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘদিন থেকে ক্ষোভ ছিল।

জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি আকাশছোঁয়া। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে যে সব কিছু জিনিসই মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। হাসিনা সরকার কোনোভাবেই চেষ্টা করেনি জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে আনার। উপরন্তু কালোবাজারিরা যেভাবে মানুষকে শোষণ করেছে তাতেও জনসাধারণ প্রচণ্ড পরিমাণে হাসিনা সরকারের প্রতি বিরক্ত ছিল। হাসিনা সরকার এমনভাবে বাংলাদেশকে পরিচালনা করেছে যেখানে নিজে ক্ষমতায় থাকার জন্য মৌলবাদীদের সঙ্গে আপোষ করেছেন। পুলিশকে ক্ষমতা দিতে গিয়ে কার্যত দুর্নীতির নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশের সাবেক পুলিশকর্তা বেনজির নূর কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি করেছে বলা হচ্ছে হাজার কোটি টাকার মালিক। একজন পুলিশকর্তা কিভাবে এত কোটি টাকার মালিক হলেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

Advertisement

এখানেই শেষ নয় হাসিনার ব্যক্তিগত বাড়ির যে চাকর তিনিও ৪০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এটা আমরা বলছি না স্বয়ং হাসিনা নিজে বলেছেন। বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে হাসিনাকে অনেক সম্মান দিয়েছিলেন কিন্তু হাসিনা সেই সম্মান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। একাত্তরের দালাল খাতকদের খতম করার নামে যেভাবে বেশ কয়েকজন আলেম উলামায়েকে হাসিনা ফাঁসির কাঠে তুলেছেন তা এক কথায় বাংলাদেশের জনতা মেনে নিতে পারেননি।

এইসব কারণে যখন জনগণ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুসছিল ঠিক সেই সময়ই দেশের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু করে দেয়। এই আন্দোলন তো শান্তিপূর্ণ ছিল কোথাও তো অশান্তির লক্ষণ ছিল না। ৫ই জুন ২০২৪ হাসিনা সরকারের কোটা সংস্কার নীতির বিরুদ্ধে ঢাকা হাইকোর্ট রায় দেওয়ার পরেই ছাত্ররা রাস্তায় নামে। অবিলম্বে কোটা ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে না হলে সংস্কার করতে হবে এই দাবিতে ছাত্ররা আন্দোলনে সামিল হয়। সব কিছু ঠিকঠাক ছিল কিন্তু ঢাকা হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকার সুপ্রিম কোর্টে গেলে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে দু মাসের বেশি সময় নিয়ে নেয় তাতেই শিক্ষার্থীরা আশঙ্কা করতে থাকেন এই সময়ের মধ্যে হাসিনা সরকার তাদের আন্দোলনকে দমন করে দিতে পারে। তাদের ঐক্যকে ভেঙে দিতে পারে তাই অবিলম্বে কোটা ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে কিংবা কোটা ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে এই দাবিতে আন্দোলনে নামে ছাত্র সমাজ। প্রায় এক মাসের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চললেও কোন অশান্তি হয়নি কিন্তু গত ১৬ই জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের এবং মেয়েদের হোস্টেলে ঢুকে যে নারকীয় তাণ্ডব হাসিনার দলের ছাত্রলীগের সদস্যরা করেছিলেন তারপরেই বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ।

এই ঘটনার রেস কাটতে না কাটতেই ঠিক তার দুদিন পরেই আমরা দেখলাম রংপুরে আবু সাঈদ নামে এক যুবককে,এক ছাত্রকে অহেতুক গুলি করল পুলিশ। সেই ছবি ভিডিও বাংলাদেশ জুড়ে ভাইরাল হয়ে যাওয়ার পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এর আগে হাসিনা মন্তব্য করেন যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপোতাদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে না তো রাজাকারদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে। যে সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল কোটা সংস্কার করা, সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী বলছেন যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি পোতাদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে না তো রাজাকারদের জন্য সংরক্ষণ থাকবে। এই কথাটি বলে হাসিনা যে কতটা ঔদ্ধত্যের পরিচয় দিয়েছেন তা সকলেই বুঝতে পেরেছেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এই কথা শোনার পরেই ছাত্র সমাজ আরোও করে ফেটে পড়ে। গানে গানে কবিতায় কবিতায় জনমত গড়ে উঠতে থাকে। আর হাসিনা নিজেই নিজের পতনকে ডেকে নিয়ে এলেন।

আসলে সব দেশেই যে সরকার স্বৈরাচারী মানসিকতা নিয়ে চলে যখন ক্ষমতায় থাকেন সেই ক্ষমতার দম্ভে অনেক কথা বলে ফেলে আর সেখান থেকেই পতন শুরু হয়। হাসিনার ক্ষেত্রেও সেই ঘটনা ঘটেছে। রংপুরে যদি আবু সাইদের মতো তরতাজা নিরস্ত্র যুবককে গুলি করে পুলিশ না মারতো এবং হাসিনা যদি রাজাকার শব্দটি ব্যবহার না করতো তাহলে হয়তো এই সরকারের এত দ্রুত পতন হত না। এ কথা বলতে কোন দ্বিধা নেই হাসিনা সরকার যতই গণহত্যা চালাক না কেন তাকে বিদায় নিতেই হবে। ক্ষমতাই থাকতে পারবেন না হাসিনা। কারণ নিরস্ত্র আবু সাঈদ এর মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধুর কন্যার যা করা উচিত ছিল। তা তিনি করেননি। প্রকৃত রাজধর্ম পালন তিনি করেননি। সুতরাং তার পতন অনিবার্য। তাই গতকাল চৌঠা আগস্ট সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে যেভাবে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগের ছাত্র যুব নেতারা কর্মীরা আন্দোলনকারীদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে গুলি চালিয়েছে। প্রথম আলোর খবর অনুসারে ৯৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে একদিনে। নিয়ন্ত্রণ যখন করতে পারছেন না এত রক্ত যখন ঝরছে তখন একজন মানবিক গণতন্ত্র প্রিয় নাগরিক এবং রাজনীতিবিদের প্রথম এবং প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে পদত্যাগ করা। হাসিনা পদত্যাগ করলেন না, নিয়তির পরিহাসে ক্ষমতা তাঁকে ছাড়তেই হবে।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ