জেলা 

বিশ্বভারতী উপাচার্যের বিরুদ্ধে থানায় এফ আই আর, বিদায়ের মুখে এ কোন অশনি সংকেত!

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলার জনরব ডেস্ক : বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর বিদায় যে আসন্ন তা নিয়ে কোন সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই। আগামী ৮ ই নভেম্বর বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর উপাচার্য পদের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। এর মধ্যে যদি তাকে পুনরায় নিযুক্তি না দেওয়া হয় তাহলে তিনি আর বিশ্বভারতীর উপাচার্য থাকতে পারবেন না। কিন্তু বিগত পাঁচ বছর ধরে তিনি রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়ে যেভাবে কর্মকান্ড করেছেন তাতেই বাঙালি হিসেবে আমরা লজ্জিত। আরএসএস-এর নীল নকশাকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছেন রবীন্দ্রনাথের বিশ্ববিদ্যালয় যেটা এক কথায় দৃষ্টিকটু।

শুধু তাই নয় বিদায় বেলায় নিজের গদিকে অটুট রাখার জন্য তিনি যে কাজটি করলেন তা বাঙালি সংস্কৃতির বিরোধী বলে আমাদের মনে হয়েছে। বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর জেনে রাখা উচিত ছিল যে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে রয়েছে সেটা একটা ট্রাস্টের জমি। সেই ক্রাশ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই ট্রাস্টের জমিতে ইউনেস্কোর নামের একটা ফলক তিনি জোর করে লাগিয়ে দিলেন। আর সেই ফলকে যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তার নাম রইলো না শুধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বিদ্যুৎ চক্রবর্তী এই দুজনের নাম জ্বলজ্বল করছে। আর এখানেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে রবীন্দ্র অনুরাগীরা।

Advertisement

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের সাধারণ ভক্তকুল এতটাই বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছে যে এখনই যদি বিদ্যুৎ চক্রবর্তীকে বিশ্বভারতীর বিশ্ববিদ্যালয়ের পদের উপাচার্যের পর থেকে সরিয়ে না দেয় মোদী সরকার তাহলে এই রাজ্যে বিজেপির আসন সংখ্যা শূন্যে গিয়ে ঠেকবে। এদিকে শান্তিনিকেতনের ট্রাস্টের পক্ষ থেকে আজ বোলপুর থানায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে।

বিদায়ী উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী বিরুদ্ধে এই এফ আই আর এ ট্রাস্টের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন তাদের কোন অনুমতি না নিয়েই তিনি তাদের জমিতে ফলক বসিয়েছেন অবিলম্বে এই ফলক সরিয়ে দেয়া হোক একই সঙ্গে বিনা অনুমতিতে এই ধরনের ফলক বসানোর দায়ে বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। আসলে এই শান্তিনিকেতনকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ মর্যাদা দিয়েছে। আর সেই ফলক বিশ্বভারতীর উপাচার্য রবীন্দ্রনাথের নাম বাদ দিয়ে নিজের এবং প্রধানমন্ত্রীর নাম দিয়ে জমিতে বসিয়েছেন। আর এই ফলক বিতর্কই বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর বিদায়ের পথকে সুগম করেছে।

কারণ এই ফলক নিয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে রাজ্যের রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোসও বিশ্বভারতীর উপাচার্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। এমনকি তৃণমূল নেতৃত্ব ইতিমধ্যে ধরনায় বসে গেছে। উল্টোদিকে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ গর্জিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, এমনকি এই রাজ্যের বিজেপি নেতারা ও বিরোধী দলনেতার শুভেন্দু অধিকারী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই তাল মিলিয়ে বিদ্যুৎ চক্রবর্তীর সমালোচনা করেছেন। আর এই বিদায় বেলায় শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের সদস্যদের থানায় এফ আই আর বিষয়টিকে আরো জটিল করে তুলতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।

ট্রাস্টের বক্তব্য, শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহ, ছাতিমতলা, শান্তিনিকেতন গৃহ-সহ মূল আশ্রম এলাকা তাদের সম্পত্তি। অথচ তাদের অনুমতি ছাড়া এ ভাবে ফলক বসানোয় শান্তিনিকেতনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিঘ্নিত হয়েছে উপাসনাগৃহের শান্তিও। ট্রাস্টের সম্পাদক অনিল কুমার বলেন, ‘‘আমাদের সঙ্গে কোনও পরামর্শ এবং কোনও অনুমতি না নিয়েই শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের জায়গায় ফলক বসিয়েছেন বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। যা অতীতে কখনও ঘটেনি। এ ছাড়াও শান্তিনিকেতনে নাম ফলক দেওয়ার রীতিও নেই। আর আমাদের সম্পত্তির উপরে এ ধরনের ফলক বসানোর কোনও ক্ষমতাই নেই কর্তৃপক্ষের। তাঁরা আইনবিরোধী কাজ করেছেন। এই মর্মেই আমরা শান্তিনিকেতন থানায় উপাচার্যের বিরুদ্ধেই অভিযোগ জানিয়েছি।’’

এই মুহূর্তে শান্তিনিকেতনে নেই বিদ্যুৎ। বিশ্বভারতী শুক্রবার প্রেস বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, অফিস সংক্রান্ত কাজের জন্য বাইরে গিয়েছেন উপাচার্য। তাঁর অনুপস্থিতিতে উপাচার্যের দায়িত্ব সামলাবেন সঞ্জয়কুমার মল্লিক। বিশ্বভারতীর একাংশের বক্তব্য, চলতি মাসের ৮ তারিখ উপাচার্য হিসাবে বিদ্যুতের পাঁচ বছরের কার্যকালের স্বাভাবিক মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ বৃদ্ধির চেষ্টা করতেই দিল্লি গিয়েছেন উপাচার্য। এর মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়া নিয়ে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ মুখ খুলতে চাননি। তবে কর্তৃপক্ষের একটি সূত্রের বক্তব্য, যে সব এলাকায় ফলক বসানো হয়েছে, তা খাতায়কলমে ট্রাস্টের সম্পত্তি হলেও, দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছে বিশ্বভারতী। আর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই)। কর্তৃপক্ষ দেখাশোনার দায়িত্বে রয়েছেন মানে ফলক তাঁরা বসাতেই পারেন। সে ক্ষেত্রে ট্রাস্টের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। শুধুমাত্র উপাচার্যকে চাপে ফেলার জন্যই পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে ট্রাস্ট।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা এক্স (সাবেক টুইটারে) হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘‘গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে যে বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র বিশ্বভারতীকে তৈরি করেছিলেন, বর্তমানে তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। কিন্তু বর্তমান কর্তৃপক্ষ সেই স্থানের স্মারক হিসাবে যে ফলকটি বসিয়েছেন, তাতে উপাচার্যেরও নাম রয়েছে, বাদ কেবল গুরুদেবের নাম!’’ মমতার বার্তা, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারকে পরামর্শ, এই অহংকারী, আত্মপ্রদর্শনবাদের নমুনাটিকে সরিয়ে দেওয়া হোক এবং গুরুদেবকে যাতে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দেশ জানাতে পারে, তার ব্যবস্থা হোক।’’ পরে মুখ্যমন্ত্রীকেও পাল্টা চিঠি দিয়েছেন বিদ্যুৎ। চিঠিতে মমতাকে নিশানা করে লিখেছেন, ‘‘স্তাবকেরা আপনাকে যা বলেন, আপনি তা-ই বিশ্বাস করেন। আপনি আসলে এখনও কান দিয়ে দেখেন।’’ ফলক সরানো নিয়েও উপাচার্য চিঠিতে জানিয়েছেন, ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (এএসআই)-এর নির্দেশ মতো ফলক তৈরি হচ্ছে। কিছু দিনের মধ্যেই তা সকলে দেখতে পাবেন।

এ ব্যাপারে মমতার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন রাজ্যপাল বোস। রাজভবন সূত্রে খবর, রাজ্যপালও বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। বোস সংবাদমাধ্যমের সামনেও বলেছেন, “গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবেগ এবং অনুভূতি। তিনি গোটা ভারতের সংস্কৃতির প্রতিনিধি। তাঁকে উপেক্ষা করা কখনওই উচিত নয়।” একই কথা বলেছেন বিরোধী দলনেতা। তিনি বলেন, ‘‘এটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়। কতগুলি বিষয়ে বাংলা ও বাঙালির ইমোশান আছে, রেসপেক্ট আছে। তা হল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁদের সম্মান দেওয়ার বিষয়ে কোনও রকম জেদাজেদি থাকতে পারে না।’’ বিদ্যুৎকেও নিশানা করেছেন শুভেন্দু। তাঁর মন্তব্য, ‘‘এটা নিয়ে উপাচার্যের এত ইগোর কী আছে? এটা তৃণমূল বলেছে বলে আমি বলব না, তা তো হতে পারে না। এই ফলক নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। ভিসি (উপাচার্য বিদ্যুৎ) যদি এই ফলকটি করে থাকেন, তা হলে সংশোধন করুন।’’

বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথের নাম বাদ যাওয়ায় ক্ষুব্ধ আশ্রমিক থেকে শুরু করে প্রাক্তনী ও বিশ্বভারতীর শিক্ষকদের একাংশ। এমন ঘটনা অতীতে কোনও দিন ঘটেনি বলেও বিশ্বভারতীর অনেকের দাবি। বিশ্বভারতীর প্রথা অনুযায়ী কোনও উদ্বোধনী ফলক বা স্বীকৃতি ফলকে সাধারণত কারও নাম উল্লেখ করা হয় না। ঠাকুর পরিবারের সদস্য তথা প্রবীণ আশ্রমিক সুপ্রিয় ঠাকুর আক্ষেপ করে আগেই বলেছেন, “বর্তমান উপাচার্য বিশ্বভারতীর হর্তা-কর্তা-বিধাতা হয়ে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বলে কেউ ছিলেন, আজ বোধহয় তাঁরা ভুলে গিয়েছেন। এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি এখানে।’’ আর এক আশ্রমিক তথা প্রাক্তনী অনিল কোনারেরও মন্তব্য, “৭০ বছরে আমি কোনও উপাচার্যের নামের কোনও ফলক এখানে দেখিনি। এই রীতি এখানে চলে না। উনি নিজের মতো করে একের পর এক ঐতিহ্য ভেঙে চলেছেন।’’

বিশ্বভারতীর শিক্ষক সংগঠন ভিবিইউএফএ-র সভাপতি সুদীপ্ত ভট্টাচার্যও আগে দাবি করেছেন, যেখানে যেখানে ফলক লাগানো হয়েছে, তার মালিকানা হয় শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের, নয়তো পূর্ত দফতরের। তাই ফলক বসানোর কোনও আইনি অধিকার উপাচার্যের নেই। তিনি বলেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথকে মুছে দিয়ে নিজের নামে এই প্রচার করার ব্যাপারটি নিয়ে আইনি পরামর্শ করছি। যে ভাবে আচার্যের নাম ব্যবহৃত হয়েছে, তাতে তাঁর সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা-ও আমরা প্রধানমন্ত্রীর দফতরে জানতে চাইব।’’

সব মিলিয়ে উপাচার্য বিদ্যুৎ চক্রবর্তী অনেকটাই চাপে আছে তবে  তাঁর গদি রক্ষা হয় কিনা সেটাই এখন দেখার। সূত্রের খবর রবিবার তিনি ইডেন গার্ডেনে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট খেলা দেখবেন আর সেখানেই তিনি দেখা করার সেখানে তিনি দেখা করবেন অমিত শাহের পুত্র জয় সাহেবের সঙ্গে। সমালোচকরা বলছেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য পদে পুনরায় থাকার জন্য এখন তিনি নাকি শরণাপন্ন হয়েছেন জয়ের। জয় তার বাবাকে বলে কি বিদ্যুৎ চক্রবর্তীকে পুনরাবহল করতে পারেন কিনা সে দিকেই তাকিয়ে আছে এ রাজ্যের জনতা।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ