কলকাতা 

উৎসশ্রী পোর্টালের সৌজন্যে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মীর বদলির ফলে উচ্চমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকের অভাবে অংকের ক্লাশ নেন কেরানি, বিদ্যালয় সাফাই করেন ছাত্রীরা

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলার জনরব ডেস্ক : সংবাদে প্রকাশ পড়ুয়াদের অভাবে প্রায় ৮২০০ প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্কুল বন্ধ করে দিতে চলেছে রাজ্য সরকার। শুধু তাই নয়, এই রাজ্যের কয়েকশো মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শুধুমাত্র শিক্ষকের অভাবে পড়ুয়ারা পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে। খোদ কলকাতা শহরে এমন কিছু মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসা রয়েছে যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক হলেও তুলনায় কম শিক্ষক রয়েছে ফলে শিক্ষার পরিবেশ অনুকূল নয় রাজ্য সরকারি অফিসাররা সব জেনেও নিরব রয়েছে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।

সংবাদ মাধ্যমের দৌলতে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের খবর ইতিমধ্যে সমগ্র রাজ্যজুড়ে প্রচারিত হয়েছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই তাই বেশিরভাগ ক্লাসই হয় না জোড়াতালি দিয়ে কোনো রকমে স্কুল চালানো হচ্ছে। শিক্ষকের অভাবে পড়ুয়ারা পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, শুধু তাই নয় কেরানিও ক্লাস নিচ্ছেন, তাতেও পড়ুয়াদের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না ঠিকমতো ক্লাস হচ্ছে না শিক্ষকের অভাবে। এখানেই শেষ নয়, সময়ে স্কুল ঘর খোলা ও স্কুল সাফাই করার কর্মীও নেই। তাই সাফাইয়ের কাজে হাত লাগাতে হয় ছাত্রীদের।

এই বিদ্যালয়টি অবস্থিত বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী ২ ব্লকে। বিদ্যালয়ের নাম সাবিত্রী বালিকা বিদ্যালয়। আর এই ঘটনার কথা স্বীকার করে নিয়ে প্রধান শিক্ষিকা মৌসুমী পাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, “উৎসশ্রী চালু হওয়ার পর স্কুলের ২৪ টি পদের মধ্যে বর্তমানে ১৭ টি পদ ফাঁকা হয়ে গেছে। বেশিরভাগই স্বাস্থ্যের কারণ দেখিয়ে অন্য স্কুলে বদলি নিয়ে চলে গিয়েছেন। ফলে অনেকসময় ছাত্রীদের ক্লাসও বন্ধ থাকে। ক্লার্ককে দিয়ে ক্লাসও নেওয়াতে হয়। গ্রুপ ডি-র কেউ না থাকায় স্কুল খোলার জন্যও ভাবতে হয়।”

পূর্বস্থলী ২ ব্লকের পূর্বস্থলীতে রয়েছে সাবিত্রী বালিকা বিদ্যালয়টি। উচ্চ-মাধ্যমিক এই স্কুলে ছাত্রীর সংখ্যা ৮৩০ জন। কিন্তু হলে কি হবে, এই স্কুলে তিনভাগের দু-ভাগ শিক্ষক-শিক্ষিকা নেই। বিজ্ঞান বিভাগের অংক, জীবন বিজ্ঞান, ভৌত বিজ্ঞানের শিক্ষক-শিক্ষিকা না থাকায় ছাত্রীদের পড়াশোনা উঠেছে শিকেয়। প্রধান শিক্ষিকা জানান, “বর্তমানে আমাকে নিয়ে ৭ জন শিক্ষক রয়েছেন। সামনের জুনে একজন আবার অবসর নেবেন। বিজ্ঞান বিভাগের কোনও শিক্ষক নেই।” এছাড়াও ওই স্কুলের ২ জন গ্রুপ-ডি কর্মী থাকলেও একজন অবসর নিয়েছেন, আর একজন বদলি নিয়ে চলে গিয়েছেন। স্বাভাবিক কারণেই সময়ে স্কুল খোলা ও স্কুল সাফাইয়ের কর্মী না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষের কপালে পড়েছে ভাঁজ।

স্কুলকে পরিষ্কার রাখতে তাই বিভিন্ন ক্লাসের ছাত্রীরাও নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েই স্কুল সাফাই করেন। এছাড়াও অধিকাংশ সময় ক্লাস বন্ধ থাকায় তাই স্কুলের ক্লার্ককে নিতে হয় অংকের ক্লাস। সুমন্ত সাহা নামের ওই ক্লার্ক বলেন, “প্রধান শিক্ষিকার অনুরোধে কাজের ফাঁকে-ফাঁকে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অংকের ক্লাস নিতে হয়। আমার অংকে অনার্স ছিল।”

স্কুলের পঠন পাঠনের এমনই এক বেহাল দশা দেখে মেয়েদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই চিন্তায় রয়েছেন অভিভাবকরাও। ওই স্কুলেরই ইংরাজি বিষয়ের শিক্ষিকা ও অভিভাবক রানী ভট্টাচার্য বলেন, “আমার মেয়েকে আমার স্কুলেই ভরতি করেছি। কারণ অন্যান্য ছাত্রীদের মত আমার মেয়েকেও আমি দেখতে পারব। স্কুলে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় রুটিন অনুযায়ী ক্লাস হচ্ছে না। জোড়াতালি দেওয়ার মত পড়াশোনা চলার কারণে চিন্তায় রয়েছি।” কালনা মহকুমা সহকারি বিদ্যালয় পরিদর্শক জহরলাল প্রামাণিক বলেন,“সমস্যার সমাধানের জন্য বিষয়টি জেলার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”

আসলে মমতা সরকারের শিক্ষা দফতর উদর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে গিয়ে যেভাবে বদলি প্রক্রিয়া চালু করেছিল তাতেই গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো শূন্য হয়ে গেছে। সরকারি আধিকারিক থেকে শুরু করে এই রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রীর যে শিক্ষার প্রতি কোন দরদ নেই এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়েছে। কোন বিদ্যালয়ের শিক্ষককে কোথায় বদলি করলে শিক্ষার পরিবেশ ঠিকমতো নিয়ন্ত্রিত হবে সে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই শিক্ষা দফতরের আধিকারিকদের। শুধু তাই নয় একই কথা বলা যেতে পারে মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের বদলি নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম কানুন আছে। এই সমস্ত নিয়ম কানুনকে অগ্রাহ্য করে যেভাবে সার্ভিস কমিশন শিক্ষক বদলি করছে তাতে আর যাই হোক আগামী দিনে মাদ্রাসা গুলোতে শিক্ষকের অভাব দেখা দেবে।

এই রাজ্যে মাদ্রাসার সংখ্যা মাত্র ৬১৪ টি সরকার অনুমোদিত। তা সত্ত্বেও বদলি করার ক্ষেত্রে পড়ুয়া শিক্ষকের অনুপাত কেন পর্যালোচনা করছে না মাদ্রাসা শিক্ষা দফতর তা নিয়ে অভিভাবক মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংখ্যালঘুদের উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা বলেন, তিনি যদি একটু খুঁটিয়ে খোঁজ নেন দেখতে পাবেন শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য মাদ্রাসার শিক্ষা দফতরের আধিকারিকরা কিভাবে যেখানে বহু সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে সেখান থেকে শিক্ষক বদলি করে নিয়ে এসে ছাত্র বা পড়ুয়া যেখানে কম আছে সেখানে পাঠানো হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে আগামী দিনে যেসব মাদ্রাসায় পড়ুয়ার সংখ্যা বেশি রয়েছে সেই সব মাদ্রাসায় শিক্ষকের সংখ্যায় এতটাই কমে যাবে যে ওই মাদ্রাসাগুলোকে তুলে দিতে হবে।


শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ