ফরম ৬ বদলের অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট! কে দিয়েছে ?কমিশনের কাছে জানতে চাইলেন প্রধান বিচারপতি
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে যত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, নতুন ভোটারের নাম তোলার ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি। এ নিয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন একটি বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছিল, ফর্ম ৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের যে ঘোষণাপত্র দিতে হয়েছে, তা বহাল রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এ বার কমিশনের সেই বক্তব্য নিয়েই প্রশ্ন তুলল শীর্ষ আদালত। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বলল, ফর্ম ৬-এর পরিবর্তনে অনুমোদন দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। কারা সেই পরিবর্তনে অনুমোদন দিয়েছিল, তা-ও জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
ফর্ম ৬ ব্যবহার করে নতুন ভোটারেরা ভোটার তালিকায় নাম তোলার আর্জি জানান। এ বার এসআইআরের সময় নতুন ভোটারদের ফর্ম ৬-এর সঙ্গে দেওয়া অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রে জানাতে হয়েছে, আগের এসআইআরে তাঁদের নিজের, বাবা-মা বা পিতামহ বা পিতামহীর নাম ছিল কি না। সেই নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। এ নিয়ে অভিযোগ উঠেছিল, এর ফলে বৈধ ভোটারদের নামও বাদ পড়তে পারে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সঁধু সতর্ক করেছিলেন যে, সরকার এই সংক্রান্ত ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স রুলস-এ সংশোধন করার আগে ফর্ম বদলানো ঠিক হবে না। কারণ, আইন বলছে, সংশোধন না করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু সেই সতর্কতা কানে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সঁধু ফর্ম-৬-এ ওই পরিবর্তনকে ‘অননুমোদিত এবং বেআইনি’ বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং তা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। ২৬ সেপ্টেম্বর বিবৃতি দিয়ে কমিশন দাবি করেছিল, ফর্ম ৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের যে ঘোষণাপত্র দিতে হয়েছে, তা বহাল রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এসআইআর প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য সময়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স নীতি মেনে সাধারণ ফর্ম ব্যবহার করতে হবে।
সোমবার প্রধান বিচারপতি কান্ত প্রশ্ন তুলে বললেন, ‘‘পরিবর্তিত ফর্ম ৬-এর অনুমোদন আমরা দিইনি। এটা স্পষ্ট করা দরকার।’’ তার পরে তিনি বলেন, ‘‘যখন নথি জমা করা হয়, তখন দেখতে চাই, কে এটা করেছে।’’ এই নিয়ে কটাক্ষ করেছেন বিরোধী নেতারা। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘কে দেশকে ভুলপথে চালিত করছে? এই দ্বন্দ্ব আমাদের দেশের হৃদয় পর্যন্ত বিস্তৃত।’’ তিনি আবার দাবি করেছেন, ভোট চুরি করা হয়েছে।
পটনার বাসিন্দা রাকেশকুমার সিংহ এবং আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর করা মামলায় এই পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে মামলা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। মামলাগুলির সুরাহা না-হওয়া পর্যন্ত জ্ঞানেশকে সাসপেন্ডের আর্জিতেও একটি জনস্বার্থ মামলা রুজু হয়। এসআইআর পর্বে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন কিংবা একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনেরও আর্জি জানানো হয় আদালতে। এই সংক্রান্ত মামলাগুলি সোমবার শুনানির জন্য ওঠে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে। তদন্তের আর্জির প্রেক্ষিতে কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে শীর্ষ আদালত। কেন্দ্র এবং নির্বাচন কমিশনকে নোটিস পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা করে এসআইআর সংক্রান্ত একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিবেদন ঘিরে তোলপাড় হচ্ছে জাতীয় রাজনীতি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিক ভাবে বিক্ষোভ চলছে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে। তবে সোমবার সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনও সংবাদপত্রের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত কোনও নির্দেশ দিতে পারে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, “কোনও সংবাদ প্রতিবেদন ১০০ শতাংশ সঠিক, আংশিক সঠিক বা ভুল হতে পারে, তাই তার ভিত্তিতে আদালত এই মুহূর্তে নির্দেশ দিতে পারে না। আমরা অবশ্যই তাদের (কমিশনের) জবাব চাইব। যদি আমরা দেখি যে কোনও ক্ষেত্রে আইন মানা হয়নি, তাহলে আমরা তা বাতিল করে দিতে পারি।”
জ্ঞানেশকে সাসপেন্ড করার যে আবেদন জানানো হয়েছে, তা নিয়েও এ দিন কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়নি আদালত। এ দিন প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কমিশনকে নোটিস পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে বলে, “নোটিসের পরে যদি দেখা যায় কোনও সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়নি, তবে আমরা সেই সিদ্ধান্তগুলি প্রত্যাহার করে নেব। সব সিদ্ধান্তই একতরফা ভাবে নেওয়া হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না।”

