মীযান পত্রিকার সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠান
বিশেষ প্রতিনিধি : মীযান পত্রিকা ৫০ বছর অতিক্রম করে ৫১ বছরে পদার্পণ করেছে। সেই উপলক্ষে কলকাতার ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস অডিটোরিয়ামে সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠান হল রবিবার ১৭ ডিসেম্বর। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের গ্রন্থাগার ও জনশিক্ষামন্ত্রী মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান তথা পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান। অন্যান্য সম্মানিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন অল ইন্ডিয়া মুলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের সদস্য ও মীযান পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক ডা. রইসুদ্দিন, প্রাক্তন সম্পাদক ও বিআইপিটি-র বর্তমান সেক্রেটারি রহমত আলি খান, প্রাক্তন সম্পাদক মুহাম্মদ নূরুদ্দিন, বর্তমান সম্পাদক তথা জামাআতে ইসলামী হিন্দের রাজ্য সভাপতি ডা. মসিহুর রহমান, জামাআতের সর্বভারতীয় সম্পাদক মাওলানা আব্দুর রফিক, মীযান পত্রিকার প্রকাশক সেখ নাসিম আলী প্রমুখ।

প্রোগ্রাম শুরু হয় মাওলানা এএফএম খালিদ সাহেবের তাযকির বিল কুরআনের মাধ্যমে। প্রারম্ভিক ভাষণে মীযান এর সম্পাদক ডা. মসিহুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার আগে-পরে অনেক পত্র-পত্রিকা তৈরি হয়েছে। অনেকে খুব ভালভাবে সময়োপযোগী কাজও করেছে। আবার অনেক পত্র-পত্রিকা কালের স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে। মীযান কিন্তু ৫০ বছর অতিক্রম করে আল্লাহর রহমতে ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতের খিদমতে অব্যাহত রয়েছে। ইসলাম ও মিল্লাতের স্বার্থে সচেতনতা, সঠিক দিশা ও দৃষ্টিকোণ, পথ নির্দেশনা দিতেই মীযান এর পথ চলা শুরু হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। আজও এই পত্রিকা সাধ্যমতো ইসলামী চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধের ছাপ রেখে চলেছে। বৈচিত্রময় এই দেশে আমাদের দায়িত্ব হল জাতি গঠন, দেশ বিনির্মাণ এবং দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করা। সেই লক্ষ্যেই ইসলামী মতাদর্শের আলোকে মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে চলেছে মীযান পত্রিকা। তাঁর কথায় মীযান কেবল খবরের কাগজ নয়; সংবাদের পাশাপাশি ইসলামের বিভিন্ন দিক ও বিভাগের ওপর গবেষণামূলক প্রতিবেদন ও প্রবন্ধ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে চলেছে। দেশজুড়ে অসহিষ্ণুতা, বিভাজন, মেরুকরণের এই আবহেও মীযান সম্প্রীতি, সংহতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের লক্ষ্যে জনমত গঠনে প্রয়াস জারি রেখেছে। মীযান তার নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে এতটুকু বিচ্যুত হয়নি, তার মূল্যবোধ এবং আদর্শগত অবস্থানে আজও অটল-অবিচল রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দেশভাগের পর অনেক জ্ঞানীগুণি মানুষ ওপারে চলে গেছেন। ফলে সেই সময় চৈন্তিক ও বৌদ্ধিক জগতে এক বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হয়। মীযান সেই শূন্যস্থান অনেকখানি পূরণ করেছে। মুসলিমদের দ্বারা সম্পাদিত ও পরিচালিত সমসাময়িক অন্যান্য পত্র-পত্রিকাগুলিও অনেক কাজ করেছে। মীযান এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক নাসীর আহমেদ সাহেবের অবদান, তাঁর ত্যাগ-কুরবানী, অধ্যবসায় ও গবেষণামূলক লেখালিখি মীযানের বুনিয়াদ গড়ে দিয়েছিল। মীযান এর জন্য তিনি নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মেধা নিঙড়ে দিয়েছেন, উজাড় করে দিয়েছেন নিজের জীবন যৌবন। তাই মীযান পরিবার নাসীর সাহেবকে কখনোই ভুলতে পারবে না। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডা. রইসউদ্দিন, রহমত আলি খান, মুহাম্মদ নূরুদ্দিন সাহেব মীযান এর সম্পাদনা করেছেন। তাদের সবার অবদান অনস্বীকার্য।

প্রাক্তন সম্পাদক ডা. রইসুদ্দিন সাহেব তাঁর বক্তব্যে মীযান পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে প্রথম সম্পাদক নাসীর আহমেদ সাহেব এবং সেই সময় যারা মীযানের কাফেলায় শরিক ছিলেন, লেখালিখি করতেন তাঁদের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন। তিনি আরও বলেন, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে ইসলামের বার্তা বাঙালি মুসলমানদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই মীযান পত্রিকার আবির্ভাব হয়েছিল। নাসীর আহমেদ সাহেবের বলিষ্ঠ লেখনী মানুষের চিন্তাভাবনার জগতে আলোড়ন ফেলেছিল। মীযান হল মুসলিম মিল্লাতের মুখপত্র ও কাণ্ডারী। আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নীতি ও আদর্শগত ক্ষেত্রে মীযান কখনও সমঝোতা করেনি।

প্রাক্তন সম্পাদক মুহাম্মদ নূরুদ্দিন সাহেব বলেন, ফিলিস্তিনে মাস দুয়েকের যুদ্ধে যত সাংবাদিককে ইজরায়েলি বাহিনী হত্যা করেছে, তা বিশ্বের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এত কম দিনে এত বেশি সংখ্যক সাংবাদিক ও লেখককে আর কোথাও কখনও হত্যা করা হয়নি। তাদের অপরাধ ছিল, যুদ্ধবাজ ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণমূলক নীতির বিরুদ্ধে লেখালিখি করা। এরা ছিলেন কলমযোদ্ধা। হত্যা, গ্রেফতার, জেল-জরিমানা সত্ত্বেও কিন্তু লেখক, সাংবাদিকরা কলম ছেড়ে দেয়নি। যে সাহিত্য সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায়, ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ায়, তাদের বাজার আছে। এমনকী সরকারও তাদেরকে পুরষ্কৃত করে। কিন্তু মীযান হল ইনসাফভিত্তিক পত্রিকা। তাই এই পত্রিকা ক্ষুদ্র সামর্থ্য নিয়েও ৫০ বছর ধরে চলছে, ৫১ বছরে পদার্পণ করেছে।
বিআইপিটির প্রাক্তন চেয়ারম্যান মাওলানা আব্দুর রফিক সাহেব বলেন, সংবাদের একটা মানবিক মুখ থাকে। সেটা অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম জলাঞ্জলি দিয়েছে। কর্পোরেট পুঁজির কাছে তারা তাদের বস্তুনিষ্ঠতা সোপর্দ করে দিয়েছে। মীযান কিন্তু সেদিক থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। মীযান এই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে না দিয়ে রীতিমতো অস্তিত্বের সংগ্রাম করে ভিন্ন ধারার মানবিক ন্যারেটিভ তৈরির কাজে লিপ্ত রয়েছে সুদীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে। তিনি আরও বলেন, নবী ঈশা (আ.) চলে যাবার ৬০০ বছর পর কুরআন নাযিল শুরু হয়। সেই কুরআনে নাযিল হওয়া প্রথম শব্দটা ছিল ‘ইকরা’ অর্থাৎ ‘পড়ো’। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল কুরআনের ধারক-বাহক মুসলিম জাতি আজ পড়াশোনার জগত থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে। তার মানে হল আমরা কুরআন-বিমুখ হয়ে গেছি। ইসলামের শিক্ষা থেকে বহুদূরে রয়েছি আমরা মুসলমানরা। এই জায়গাটার কথা বিবেচনা করেই মুসলমানদের পড়াশোনার জগতে ফেরানোর লক্ষ্যে তৈরি হয়েছিল মীযান পত্রিকা।

অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিআইপিটি-র সেক্রেটারি রহমত আলি খান, প্রাক্তন সেক্রেটারি সেখ নাসির উদ্দীন, মীযান এর প্রকাশক সেখ নাসিম আলি, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মাওলানা তাহেরুল হক। এছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ট্রাস্টি মেম্বার মশিউর রহমান, শাদাব মাসুম। এদিন প্রায় ৫০ জন লেখক, সাংবাদিক, সম্পাদককে সম্মানিত করা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন দৈনিক আপনজন সম্পাদক জাইদুল হক, দিনদর্পণ সম্পাদক মহসীন আলি খান, নতুন গতির সম্পাদক এমদাদুল হক নূর, বাংলার জনরব সম্পাদক ইবাদুল ইসলাম, জনতার আদালত এর সম্পাদক মতিউর রহমান, রেণেসাঁ সম্পাদক আজিজুল হক, বুলবুল পত্রিকার সম্পাদক এসএম সিরাজুল ইসলাম, নাবিক পত্রিকার সম্পাদক মুহা আমিনুল ইসলাম, লেখক মাওলানা মঈনুদ্দিন খান ফালাহী, জয়নুল আবেদিন, ইকবাল হোসেন, গোলাম রাশিদ, মইদুল ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, লিয়াকত হোসেন, মুদাসসির নিয়াজ প্রমুখ। এছাড়াও মীযানের প্রাক্তন ম্যানেজার আবুল হাসান, হাবিব মুস্তাফা, বর্তমান ম্যানেজার সেখ মহিমুদ্দিন, ট্রাস্টির সদস্য হেদায়েত আলি, মাহবুবুর রহমান প্রমুখকে সম্মাননা জানানো হয়। সংগীত পরিবেশন করেন অনন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনের শিল্পীরা। সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নূর আলম মোল্লা।

