মনিপুরের হৃদয় কাঁপানো ঘটনা মনে করিয়ে দিলো ব্রাহ্মণ দ্বারা শাসিত ভারতের নির্মম অত্যাচার : হাকিকুল ইসলাম
হাকিকুল ইসলাম : দুজন কুকি সম্প্রদায়ের মেয়েকে মাঠে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ, উলঙ্গ অবস্থায় নির্যাতন করতে করতে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া, মনিপুরের হৃদয় কাঁপানো ঘটনা মনে করিয়ে দিলো ব্রাহ্মণ দ্বারা শাসিত ভারতের নির্মম অত্যাচার । মনিপুরে হওয়া ঘটনা ব্রাহ্মণ দ্বারা শাসিত ভারতবর্ষের যে নির্মম অত্যাচার, অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তির স্বাদ পাইয়ে ছিল মুসলমানরা, সেই নির্মম অত্যাচারের বাস্তব চিত্র প্রকাশ করছে আজ ।
সপ্তম শতকে মুসলমানরা যখন ভারতে ব্যবসা করতে এসেছিল, তারা অঝর নয়নে কেঁদেছিল যেই রূপ মনিপুরের ঘটনা দেখে সারা ভারত কেঁদেছে আজ । যখন তারা ভারতে প্রবেশ করেছিলো তাদের সম্মুখে ছিল অন্যায় অবিচার, জুলুম নির্যাতন আর নারীদের পণ্য হিসেবে ব্যাবহার। তারা দেখেছিল একটা শ্রেণীর মানুষ গলায় মাটির হাঁড়ি, আর পিছনে ঝাটা বেঁধে রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করছে, আর তাদের মহিলারা উলঙ্গ অবস্থায় চলাফেরা করছে। তাদের গলায় এই জন্য হাঁড়ি ছিল তারের থুথু রাস্তায় পড়ে গেলে রাস্তা অপবিত্র হয়ে যাবে, সেই রাস্তা দিয়ে ব্রাহ্মণ হেঁটে গেলে অছুত হয়ে যাবে, তাদের পিছনে এই জন্য ঝাটা বাঁধা থাকতো তাদের পায়ের ছাপ রাস্তায় থেকে গেলে সেই রাস্তা দিয়ে ব্রাহ্মণ সমাজ হেঁটে যেতে পারবে না, তাদের মহিলারা উলঙ্গ এই জন্য থাকতো, তাদের লজ্জা স্থান ও স্তন ঢাকতে কর দিতে হতো, কর দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তাদের উলঙ্গ অবস্থায় চলাফেরা করতে হতো।
সেই সময়ে ব্রাহ্মণ সমাজের নীতি ছিল নিচু জাতি দলিত আদিবাসীরা সবাই অপবিত্র, অছুত কিন্তু তাদের মহিলাদের স্তন ও লজ্জা স্থান পবিত্র, ব্যবহার যোগ্য তাই তারা নির্দ্বিধায়ায় তাদের ধর্ষণ করত কোনো রকম সাজার ব্যবস্থা ছিল না। পাশে স্বামী শুয়ে থাকলে তাকে বের করে স্ত্রীর সাথে সহবাস, ঘরে সন্তান থাকলে বের করে মায়ের সাথে সহবাস এই রকম মর্মান্তিক দৃশ্যের সম্মুখীন হয়েছিল তারা। ব্রাহ্মণদের এই সমস্ত অত্যাচার থেকে মুক্তির স্বাদ পাইয়েছিল তৎকালীন ভারতে আসা মুসলমানরা যে কারণে দেশের এক তৃতীয়াংশ হিন্দু মুসলমান হয়ে গেছিল, এই কথা স্বামী বিবেকানন্দ ওনার লেখা বই বাণী ও রচনা ৩য় খণ্ডতে লিখে গেছেন।
সামান্য একটু পিছনে, ১৮ শতকের প্রথম দিকে গেলেই আমরা দেখতে পাবো কেরালার চেরথালার সেই ঐতিহাসিক ঘটনা, যেখানে নিচু জাতির মেয়েদের স্তন ঢাকার জন্য স্তন মেপে মেপে ব্রাহ্মণ ত্রাভাঙ্কোরকে কর দিতে হতো। কিন্তু নাঙ্গেলি নামের এক সাহসী মহিলা কর না দিয়েই নিজের স্তন ঢাকার সিদ্ধান্ত নেই, কর না দেওয়াই প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাকে, একদিন রাজার স্তন কর আদায়কারী নাঙ্গেলির বাড়ি যায় তার স্তন মেপে কর আদায় করতে, নাঙ্গেলি তাদেরকে বাইরে বসতে বলে ভেতরে ঢুকে একটি ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের স্তন কেটে কলা পাতাতে তাদের হাতে ধরিয়ে দেই, সেই দৃশ্য দেখে সবাই অবাক হয়ে যাই। নাঙ্গেলি অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে মারা যায়, তাকে যেই চিতায় অন্তিম সৎকার করা হচ্ছিল তার স্বামী চিরুকন্দন দুঃখ বেদনায় সেই জ্বলন্ত চিতাই ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। সেই ঘটনায় গোটা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে, দেশব্যাপী এই ব্রাহ্মণ্যবাদিদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়, তারপর থেকে ত্রাভাঙ্কোর রাজ বংশ থেকে স্তন কর বন্ধ হয়ে যায় ।
সেই ব্রাহ্মণ দ্বারা শাসিত অতীতের ভারতবর্ষকে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে চলেছে বর্তমান সরকার । ২০০২ সালে গুজরাটের বিলকিস বানুকে কি ভাবে গণ ধর্ষণ করা হয়েছিল সারা পৃথিবী জানে, মেলেনি ন্যায় বিচার, মুক্তি করে দেওয়া হয়েছে ধর্ষকদের। ২০২০ সালে উত্তর প্রদেশের হাতরাসে ১৯ বছরের মনিশা বালমিকি, নিচু জাতির সেই মেয়েটিকে ৪ জন উচু জাতির ব্রাহ্মণ – সন্দীপ ঠাকুর, রামু ঠাকুর, লাভকুশ ঠাকুর, রাভি ঠাকুর গণ ধর্ষণ করে হত্যা করে দেই।
ব্রাহ্মণ সমাজ তন্ত্রে নিচু জাতির মেয়েকে ভোগ করা কোনো রকম অপরাধ না হওয়ায় উত্তর প্রদেশ প্রশাসন দ্বারা রাতের অন্ধকারে মেয়েটিকে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, প্রশাসনের হাত পা ধরার সত্ত্বেও দেখতে দেওয়া হয় না মা বাবাকে, মেয়ের ন্যায় বিচার চাইতে যাওয়ায় পিতাকেও হত্যা করে দেওয়া হয়, মুক্তি করে দেওয়া হয় ৪ জন ধর্ষকের মধ্যে তিনজনকে।
শতাধিক মেয়েকে নিজের আশ্রমে ধর্ষণকারী বাবা রাম রহিমকে গত দুই বছরে ৫ বার জেল থেকে বেরিয়ে আশ্রম যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয় । মহিলা খেলোয়াড়দের উপর হওয়া যৌন নির্যাতনের মামলা থাকা বিজেপি মন্ত্রী ব্রিজ ভূষাণ সিংকে কয়েকদিনেই জামিন দিয়ে দেওয়া হয় আর আজ মনিপুরের ঘটনা নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দিচ্ছে প্রধান মন্ত্রী যেই ঘটনা ঘটেছে ৭৬ দিন পূর্বে।
দুজন কুকি সম্প্রদায়ের মেয়েকে উলঙ্গ করে যৌনাঙে হাত দিয়ে নির্যাতন করতে করতে মাঠে নিয়ে যাওয়া সেখানে সবাই মিলে গণ ধর্ষণ করার এই দৃশ্য হৃদয় কে চুরমার করে দিয়েছে ১৪২ কোটি দেশবাসীর। প্রধানমন্ত্রী এতদিনে কুমিরের কান্না করছে, ঘটনা তো মে মাসের ৪ তারিখের। এই তিন মাসে মনিপুরে শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি, প্রধানমন্ত্রীর কাছে কি কোনো খবর ছিল না যে আজ এই একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুমিরের কান্না কাঁদছে।
সারা দেশে হওয়া মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতন ও মনিপুরের অশান্তিকে মৌন সমর্থনকারী বিজেপি সরকারকে ধিক্কার জানাই। মিডিয়ার সামনে কুমিরের কান্না বন্ধ করে দোষীদের ফাঁসির সাজা দিয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থাকে তুলে ধরুক সরকার। কেন্দ্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে মনিপুরের অশান্ত পরিবেশকে শান্ত করুক, মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করুক সরকার ।

