দেশ 

উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ঐতিহাসিক জয়ের নেপথ্য কাহিনী জানতে চান ? তাহলে ক্লিক করুন

শেয়ার করুন

সেখ ইবাদুল ইসলাম : উত্তরপ্রদেশে বিপুল জনাদেশ নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে এলো বিজেপি। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে উত্তরপ্রদেশে ফের বিজেপি রাজ শুরু হতে চলেছে। এই ঘটনাটি আক্ষরিক অর্থে ভারতীয় রাজনীতিতে একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলা যেতে পারে। কারণ মনে রাখতে হবে ১৯৮৫ সালের পর এই প্রথম উত্তরপ্রদেশে একই দল দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এলো। সেইবার ইন্দিরা গান্ধী হত্যার হাওয়াকে কাজে লাগিয়ে কংগ্রেস উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় বসে ছিল। তারপর থেকে বিগত ৩৫ বছর ধরে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে কোন দল একটানা দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসেনি।

গঙ্গা দিয়ে অনেক জল প্রবাহিত হয়েছে। যোগী আদিত্যনাথের নেতৃত্বে বিগত পাঁচ বছর ধরে উত্তরপ্রদেশে যে শাসন হয়েছে তাকে অনেকেই ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেছে ঠিকই কিন্তু  উত্তরপ্রদেশের জনতা যোগীকেই চেয়েছে। এর নেপথ্যে কারণ কি তা বিশ্লেষণ করার জন্যই আজকে আমার এই প্রতিবেদন।

প্রথমত উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে যোগী আদিত্যনাথ যে খুব বড় ধরনের আহামরি কিছু কাজ করেছেন তা বলা যাবে না। তা সত্ত্বেও তিনি বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। এর নেপথ্যে রয়েছে বিজেপির সাংগঠনিক দক্ষতা। আরএসএস তার নীতি নির্ধারণের মধ্য দিয়ে এই রাজ্যে তার প্রভাবকে  তৃণমূল স্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছে। বিরোধীরা যোগী আদিত্যনাথ সরকারের বিরুদ্ধে থাকা ক্ষোভকে ভোট বাক্সে প্রতিফলিত করতে পারেনি। ফলে সংগঠনের জোরে বিজেপি এই রাজ্যে তার সাফল্যকে ধরে রাখতে পেরেছে।

দ্বিতীয়তঃ উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথ এবং বিজেপি যে নতুন মতাদর্শের জন্ম দিয়েছে সেই মতাদর্শের সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা খানিকটা হলেও সংক্রমিত হয়েছে। যার ফলে ওই এলাকার মানুষ হাথ্রাস কান্ড, উন্নাও কান্ড এরপরেও এমনকি কৃষক আন্দোলনের পরেও বিজেপিকে সমর্থন দিয়েছে।

তৃতীয়তঃ অখিলেশ যাদব যেভাবে রাজনীতির কাজকর্ম করেছে তাতে তিনি সবটা নিজের অনুকূলে আনতে পারেননি। যদিও বিজেপি বিরোধী সিংহভাগ ভোট আখিলেশ যাদবের দল সমাজবাদী পাটির্র পেয়েছে। তবুও বলা যেতে পারে তিনি আরেকটু সামাজিক মেরুকরণের চেষ্টা করলে সাফল্য পেতে পারতেন। কংগ্রেসের সঙ্গে গোপন আন্ডারস্ট্যান্ডিং করতে পারতেন । একইসঙ্গে মায়াবতী কিংবা চন্দ্রশেখর আজাদ বা রাবন এবং কুশিয়ারা সমাজের সঙ্গে তার যোগাযোগ করা উচিত ছিল তিনি তা করেননি।

চতুর্থত যোগী আদিত্যনাথ সরকারের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল তাকে ধরে রাখা বা সেই ক্ষোভকে মানুষের মধ্যে আরও বেশি সঞ্চারিত করার দক্ষতা বিরোধী দল হিসাবে কংগ্রেস এবং সমাজবাদী পার্টি ব্যর্থ হয়েছে। কারন মনে রাখতে হবে হাথ্রাস কান্ড, উন্নাও কান্ড এবং কৃষক আন্দোলন, করোনা মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা এগুলো নিয়ে কংগ্রেস দলের নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী যতটা বেশি প্রচার করেছে ততটা বেশি প্রচারে ছিলেন না সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব। ফল যা হবার তাই হয়েছে।

পঞ্চমত মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও তাকে ভোটবাক্সে প্রতিফলন করার যে সংগঠন ও দক্ষতা দরকার ছিল বিরোধীদের মধ্যে ছিল না। মিডিয়ার প্রচার এবং সোশ্যাল মিডিয়ার জোরে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায় কিন্তু তাকে যে ভোটবাক্সে প্রতিফলিত করা যায় না সেটা উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন প্রমাণ করেছে।

ষষ্ঠতঃ অখিলেশ যাদব সমগ্র পিছিয়ে পড়া মানুষকে একসঙ্গে নিতে পারেননি। স্বামী প্রসাদ মৌর্যকে নিলেও চন্দ্রশেখর আজাদ থেকে শুরু করে মায়াবতী কুশিয়ারা এই আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর বাইরে ছিল তারা বড় অংকের ভোট কেটে অনেকের যাত্রা ভঙ্গ করেছে।

সপ্তমত মুসলিম সমাজকে অবজ্ঞা অবহেলা করা। অখিলেশ যাদব বলুন এবং কংগ্রেস বলুন এরা সবাই মুসলিম সমাজকে উত্তরপ্রদেশে অবহেলা করেছে। আসলে এই সকল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলির একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা মনে করে মুসলিম ভোট তারা তাদের পৈতৃক অধিকার। এজন্য আমরা দেখলাম উত্তর প্রদেশের মুসলিম সমাজের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ইমরান মাসুদকে যেমন কংগ্রেস গুরুত্ব দেয়নি একইরকমভবে অখিলেশ যাদবের দল সমাজবাদী পার্টিও তাকে গুরুত্ব দেয়নি বা এবারের নির্বাচনে প্রার্থী করেনি। আমরা সকলেই জানি ইমরান মাসুদ যতদিন কংগ্রেসে ছিলেন ততদিন কংগ্রেস অন্তত সাত থেকে আট টা আসন উত্তরপ্রদেশে ধরে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এবার ইমরান মাসুদকে সমাজবাদী পার্টি তাদের দলে নেয় এবং কংগ্রেস ইমরান মাসুদকে গুরুত্ব না দেয়ার জন্য তিনি সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দেন।  ফলে যা হবার তাই হয়েছে ইমরান মাসুদকে সমাজবাদী পার্টির প্রার্থী করেনি। এর ফলে উত্তরপ্রদেশের জনতার মধ্যে একটা ক্ষোভ ছিল সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখেছি উত্তর-পশ্চিম উত্তরপ্রদেশে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়।

এই সব এলাকায় যেখানে মনে করা হচ্ছিল বিজেপি শূন্য হয়ে যাবে সেখানে তা বিজেপি হয়নি বরং বিজেপি অনেক ভালো ফল করেছে।

অষ্টমত বিজেপি নেতাদের নিবিড় প্রচার। তারা সাধারন মানুষকে বোঝাতে পেরেছে ভুল হতে পারে কিন্তু এই ভুলের জন্য তাদেরকে যদি সরিয়ে দেয়া হয় তাহলে আরো বেশি মারাত্মক ভুল হয়ে যাবে। কারণ অখিলেশ যাদব যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে গুন্ডারা গুরুত্ব পাবে।

নবমত, বিজেপি তার নিজের  দল থেকে কোন মুসলিম প্রার্থী না করলেও জোট শরিক দল মুসলিম প্রার্থী করেছে এর ফলে একটা বার্তা মুসলমানদের কাছে গেছে যে বিজেপি মুসলিমদের একবারে অচ্ছুৎ ভাবে না। এছাড়াও অখিলেশ যাদবের ইদানিং কাজকর্মগুলো অবশ্যই মুসলিমদের নজরে পড়েছে উত্তরপ্রদেশের মুসলিমরা খুব বেশি সন্তুষ্ট ছিল না।

সবশেষে বলা যেতে পারে, উগ্র হিন্দুত্ববাদ মোকাবিলা করার জন্য নরম হিন্দুত্ব ব্যবহার করতে গিয়েই আসলে বিরোধীরা ভুল করে ফেলেছেন। কারন, হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে একমাত্র অস্ত্র হতে পারে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ এবং উন্নয়নের স্লোগান। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বিজেপির বিরুদ্ধে এই অস্ত্র প্রয়োগ করে থাকেন তিনি হিন্দুত্বের মোকাবিলা হিন্দুত্বকে সামনে আনেননি। তিনি হিন্দুত্বের মোকাবিলায় সবসময়ই উন্নয়নের প্রশ্নকে সামনে এনেছেন। সেই জন্য অরবিন্দ কেজরিওয়াল মাত্র ৮ বছরের মধ্যেই দুটি রাজ্যের ক্ষমতায় বসে গেলেন। আপের এই সাফল্য কে সামনে রেখে সব রাজনৈতিক দলকে শিক্ষা নেয়া উচিত বলে আমার মনে হয়েছে।

অখিলেশ যাদব যদি উন্নয়নের প্রশ্নে ভোট চাইতেন ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে ভোট চাইতেন এবং আগে যে তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল সেই অবস্থানে যদি ভোট চাইতেন তাহলে হয়তো এই ফল উল্টো হতে পারত। কারণ তিনি নরম হিন্দুত্বকে ব্যবহার করতে গিয়ে বিজেপির মুকাবিলা করতে পারলেন না। উল্টো দিকে নরম হিন্দুত্বকে ব্যবহার করতে গিয়ে সচেতন নাগরিক হিন্দু এবং মুসলমানদের ভোট হারালেন এর ফলে বিজেপি বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসে গেল। ১৯৮৫ সালে কংগ্রেস দলের পর দ্বিতীয়বারের জন্য আবার সেই কৃতিত্ব অর্জন করলেন যোগী আদিত্যনাথ বা বিজেপি দল।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ