করম জাওয়া পরব ২০২৬
নিজস্ব সংবাদাতা : ২২ সেপ্টেম্বর, সোনারপুর পূর্বশীতলায় ২৪ পরগনা আদিবাসী জনকল্যাণ সমিতির আয়োজনে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী করম জাওয়া পরব ২৬ অনুষ্ঠিত হল। সোনারপুরের এই করম উৎসব এ বছর দ্বাদশ বছরে পড়লো। ইতিমধ্যেই সোনারপুর করম উৎসব এই জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য হয়ে উঠেছে। এদিন করম উৎসব প্রাঙ্গনে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। করম উৎসবে মূলতঃ নারীদের উপস্থিতিই সবচেয়ে বেশি। কারণ এটি ফসলের উৎসব, জানালেন উদ্যোগক্তারা।
পাহান স্বপন সিং পরিচালনায় কারাম বৃক্ষের ডাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে কারাম পূজার শুভারম্ভ । আনুষ্ঠানিক কারাম দেবতার প্রণাম পরবের পর পৃথিবীতে গাছ গাছালি, বিভিন্ন জীবজন্তুর ও মানব জাতির সৃষ্টির কাহিনী মুন্ডারী ভাষায় পরিবেশিত হয়।
এদিন অতিথিদের মধ্যে সমিতির প্রাক্তন সভাপতি সম্পাদক ও প্রবীণ সদস্য হরেকৃষ্ণ সরদার, রজনীকান্ত সরদার, নিরাপদ সরদার, হরেকৃষ্ণ কয়াল, গনেশ সরদার রতন সরদার এবং পঞ্চায়েত সদস্য তরনী বিশ্বাস,সদস্যা রুমা মন্ডল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন ।
বিরসা মুন্ডা, বাবা সাহেব আম্বেদকরদের প্রতিকৃতি মাল্যদানের পর করমতীগণ আখড়া বন্দনা সংগীত ও নৃত্যের ছন্দে নৃত্য পর্বের সূচনা হয়। সারা রাত ধরে করম গানের সুরেলা সুর ও নৃত্যের ছন্দের বাঁশির সুর, ঢোল, মাদল, ধামসার ধ্বনিতে কারাম প্রাঙ্গণ আনন্দে মুখরিত ছিল।
করম আখড়া শুধু সোনারপুর নয় রাজ্য তথা দেশে প্রতিবছর আদিবাসী এলাকায় প্রকৃতি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে জনসমুদ্রে পরিনত হয়। ভাদ্রমাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর পবিত্র তিথিতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা আনন্দে মাতোয়ারা হয়।
করম পূজা শুধু একটি উৎসব নয়, এটি হলো আদিবাসীদের সংস্কৃতির প্রাণ, প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জানানোর এক পবিত্র মাধ্যম। বন-পাহাড়, গাছপালা আর ধরিত্রী মায়ের প্রতি আদিবাসীদের গভীর কৃতজ্ঞতারই বহিঃপ্রকাশ হলো এই উৎসব। করম ডাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উৎসব প্রাঙ্গণ পবিত্র হয়ে উঠে।
করম উৎসবের মূল বার্তা হলো ভাই-বোনের পবিত্র ভালোবাসার উৎসব, ভালো ফসলের কামনায় প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করার উৎসব। ‘আপন করম, ভায়েক ধরম’- এই মন্ত্রেই দীক্ষিত হয়ে বোনেরা তাদের ভাইদের মঙ্গল কামনা করে। কৃষিভিত্তিক এই সমাজে করম রাজা হলেন উর্বরতা ও সুরক্ষার দেবতা। প্রকৃতি বাঁচলে তবেই মানবজাতি বাঁচবে—হাজার বছর ধরে আদিবাসী পূর্বপুরুষেরা এই শিক্ষাই দিয়ে আসছেন, যা আজকের দিনে অন্যতম বড় প্রাসঙ্গিক বিষয়।
করম উৎসবের আসল আনন্দই তো লুকিয়ে থাকে নৃত্যের যৌথতায়, সবাই মিলে একসঙ্গে হাত ধরাধরি করে নাচার মধ্যে। আদিবাসীরা বিশ্বাস করেন করম রাজার আশীর্বাদে সবার জীবন সুখ, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্যে ভরে উঠবে।

