রাজ্য বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনে হাইকোর্টের প্রশ্নের মুখে স্পিকারের ভূমিকা!
উলুবেড়িয়া পূর্ব কেন্দ্রের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত করা নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের প্রশ্ন, তৃণমূলের পক্ষ থেকে দু’টি প্রস্তাব এসেছিল বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত করার ব্যাপারে। তাহলে স্পিকার কীভাবে দ্বিতীয় প্রস্তাবটি গ্রহণ করলেন ? বিচারপতির আরও প্রশ্ন,” তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত করার ব্যাপারে প্রথম চিঠি দেওয়ার পরও কেন স্পিকার অপেক্ষা করলেন (দ্বিতীয় চিঠি আসা পর্যন্ত)?
অধ্যক্ষের পক্ষের আইনজীবী বিল্বদল ভট্টাচার্য উত্তরে জানান, তৃণমূল কংগ্রেসে দু’টি গোষ্ঠী রয়েছে। দু’জন বিধায়ক স্পিকারের কাছে অভিযোগ দায়ের করে জানান, তাঁরা 6 মে মিটিংয়ে হাজির ছিলেন না। তাঁদের সই জাল করা হয়েছে ৷ কোনও রেজোলিউশন নেওয়া হয়নি ওই দিন। পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে যে চিঠি দেওয়া হয়েছিল সেখানে বিরোধী দলনেতা ঠিক করা নিয়ে কোনও মিটিং হয়েছিল কি না, সে ব্যাপারে পরিষ্কার করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি ৷
শুনানিতে অংশ নিয়ে তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষে সাংসদ-আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে বলেন, “লোকসভাতেও একইরকম ঘটনা ঘটেছে । সেখানেও একটি রাইভাল গ্রুপ তৈরি হয়েছে ৷ সাংসদরা স্পিকারকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সুবিধা করতে না-পেরে নতুন একটি রাজনৈতিক দলে যোগদান করেছেন তাঁরা।”
শুনানিতে কী কী হল ?
শুনানির শুরুতে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও জানতে চান, যেদিন বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত করা হয় সেদিন ক’টা রাজনৈতিক দল উপস্থিত ছিল বিধানসভায় ? সরাসরি জবাব এড়িয়ে বিল্বদল জানান, বিধানসভায় বিধায়কদের সংখ্যা যা ছিল তাই আছে। বিচারপতির প্রশ্ন, স্পিকার কি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মধ্যে থেকেই বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত করেছিলেন ?
বিল্বদলের উত্তর, 9 মে বিরোধী দলনেতা সহ-চিফ হুইপের ব্যাপার তথ্য চাওয়া হয়। 19 মে একটা রেজোলিউশন জমা দেওয়া হয় ৷ সেখানে বিধায়কদের 6 মে’র সাক্ষর দেখানো হয়। কিন্তু এই সাক্ষরের বৈধতা নিয়ে সংশয় আছে ৷ সুপ্রিম কোর্ট বিভিন্ন মামলায় জানিয়েছে, স্পিকার রাবার স্ট্যাম্প নন। তিনি এই সাক্ষর সঠিক কি না তা যাচাই করার চেষ্টা করেন। তারপর বিরোধী দলনেতার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয় ৷ এরপর বিচারপতি বলেন, স্পিকার যখন দেখলেন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের স্বাক্ষর রয়েছে সেখানে তিনি যাচাই করতে গেলেন কেন ?
বিল্বদলের জবাব- ইতিমধ্যে পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন হয়। দু’জন নির্বাচিত বিধায়ককে বিরোধী দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি বিধায়করা স্পিকারের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁদের সই জাল করা হয়েছে ৷ তা নিয়ে এখন তদন্ত চলছে ৷ বিধায়কদের বহিষ্কার করার বিষয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিধানসভায় কোনও চিঠি দিয়ে যোগাযোগ করা হয়নি।
এই পর্বে বিচারপতি জানতে চান, বিরোধী দল তাদের নেতা মনোনীত করে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে ৷ স্পিকার সেটাকে অগ্রাহ্য করলেন কি করে ? তাছাড়া সই-জাল করার ব্যাপারে এফআইআর দায়ের হয়েছে মে মাসের 27 তারিখ। তার আগে স্পিকার কী করছিলেন ?
বিল্বদলের জবাব- ইতিমধ্যে স্পিকারের কাছে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের 58 জন নির্বাচিত বিধায়ক চিঠি দিয়ে বিরোধী দলনেতা নিযুক্ত করার আর্জি জানান। তাঁরা একই রাজনৈতিক দলের (তৃণমূল) সদস্য।
বিচারপতি জানতে চান, যদি স্পিকারের কাছে একই রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে দু’টি প্রস্তাব আসে, তাহলে তাঁর ভুমিকা কী ? স্পিকার কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন দ্বিতীয় প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে ? জবাবে বিল্বদল ভট্টাচার্য জানান, 1937 সালের ওয়েস্ট বেঙ্গল লেজিসলেটিভ পার্টি রুল অনুযায়ী বিরোধী রাজনৈতিক দলের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে সেক্ষেত্রে স্পিকারের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত।
শুনানির এই অংশে বিচারপতি কৃষ্ণা রাও জানতে চান, স্পিকার নিজের চেম্বারে বসে কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন একটা প্রস্তাব ভুল আর একটি প্রস্তাব সঠিক। বিল্বদল ভট্টাচার্য জানান, দু’টি রাইভাল গ্রুপ এখানে রয়েছে ৷ এই মামলা দায়ের করার আগে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিধায়কদের সদস্যপদ খারিজ করার কোনও আবেদন করা হয়নি।
পাল্টা বিচারপতি বলেন, “সব ঠিক আছে। কিন্তু স্পিকার কীভাবে সিদ্ধান্ত নিলেন সেটা আমাকে জানান ৷” বিল্বদল আবারও জানান, দুই বিধায়ক স্পিকারের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা মে মাসের 6 তারিখ হওয়া মিটিংয়ে হাজির ছিলেন না । কোনও রেজল্যুশন হয়নি ওই দিন।” এরপর এদিনের শুনানি শেষ হয়ে যায় ৷ আগামিকাল আবারও এই মামলার শুনানি হবে ৷

