সিঙ্গুরে এলেন মন জয় করতে পারলেন না, মোদিজীর সভার পর দক্ষিণবঙ্গ মমতার দখলেই থেকে গেল!
সেখ ইবাদুল ইসলাম : প্রধানমন্ত্রী এলেন বক্তব্য রাখলেন বড় বড় কথা বললেন বাংলাকে সোনার বাংলা গড়ে তোলার কথা বললেন কিন্তু যেটা বললেন না সেটা মানুষ চেয়েছিলেন। মানুষ কি চেয়েছিল? মানুষ চেয়েছিল এই রাজ্যের সাধারণ মানুষের রুটি-রুজির সন্ধান দেবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী তা তিনি দিতে পারেননি। মালদহের সভাতে জনসমাগম খুব ভালো হয়েছিল সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই সীমান্তবর্তী এলাকা সেখানে তিনি অনুপ্রবেশের ইস্যু তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করেছিলেন। কিন্তু হুগলিতে তো অনুপ্রবেশ ইস্যু কাজ করবে না। হুগলি জেলা সমৃদ্ধশালি জেলা তাও আবার সিঙ্গুরের মতো জায়গা যেখানে তারা শিল্প করতে এসে ফিরে গিয়েছে মমতার চাপে বলে অভিযোগ। কয়েকদিন ধরে বিজেপির নেতারা বলে আসছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাকি সিঙ্গুরে এসে শিল্প বার্তা দেবেন বাংলার মানুষকে কাজের প্রতিশ্রুতি দেবেন। আমাদের রাজ্যের বেশ কয়েকজন প্রবীণ সাংবাদিক যারা এখন ইউটিউব আর হিসাবে বিখ্যাত হয়েছেন তারাও বলতে শুরু করলেন বিজেপির মাস্টার স্ট্রোক। কিসের মাস্টার স্ট্রোক? ৩৬ মিনিট প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিয়েছেন তার মধ্যে তিনি একবারের জন্যও সিঙ্গুরে শিল্প হবে কথাটি বলেননি। এই রাজ্যের মানুষ চাকরি পাবে এই কথাটি বলেননি। তিনি যা বলেছেন এই রাজ্যের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করতে হবে তৃণমূল মুক্ত করতে হবে তবে নাকি বিনিয়োগ আসবে!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন পশ্চিমবঙ্গ সফরে আসছেন ঠিক তখনই ডাবল ইঞ্জিনিয়ার সরকার মধ্যপ্রদেশের ইন্দরের কয়েকশো পরিবার স্বচ্ছ জলের দাবিতে রাহুলের কাছে কান্না দিচ্ছে। তারা মনে করছেন দেশের বিরোধী দল নেতা রাহুল গান্ধী একমাত্র তাদের ত্রাতা। তাই প্রধানমন্ত্রীর সিঙ্গুরে এলেও সাধন মানুষের মন জয় করতে পারেননি। সে জন্যই হয়তো তৃণমূলের কটাক্ষ। প্রধানমন্ত্রী আশার অনেক আগেই চিত্রনাট্য লেখা হয়ে গিয়েছিল।রবিবারই তৃণমূলের তরফ থেকে শশী পাঁজা বলেছেন, ‘‘সকাল থেকে যেন একটা চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী এসে সিঙ্গুরকে উদ্ধার করে দেবেন। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা অসম্পূর্ণ ছিল, না কি অস্পষ্ট ছিল, জানা নেই। আমরা দেখলাম, বিজেপি নেতৃত্ব যে প্রত্যাশার কথা বলছিলেন, সে রকম কোনও প্রত্যাশা বা আশার আলো তিনি দেখাতে পারেননি।’’ সিঙ্গুরের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনে ‘হতাশ’ হয়েছেন বলে দাবি করেছে তৃণমূল।

হুগলির সিঙ্গুরে মোদী জনসভা করবেন বলে যে দিন জানা গিয়েছিল, সে দিন থেকেই আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল মোদীর কাছ থেকে সম্ভাব্য ‘শিল্পবার্তা’ পাওয়া নিয়ে। সে জল্পনা শুধু সাধারণ জনতার মধ্যে বা সিঙ্গুরবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির নেতারাও বার বার নানা মন্তব্যে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর জনসভা থেকেই শিল্প পুনরুজ্জীবনের আশ্বাস পাবে সিঙ্গুর তথা পশ্চিমবাংলা।
প্রধানমন্ত্রীর সভামঞ্চ থেকেও রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্বের মুখে সে সব কথা ফের শোনা গিয়েছিল। সভামঞ্চে মোদী পৌঁছোনোর আগে এলাকার প্রাক্তন সাংসদ তথা রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার ভাষণ দেন। সেই বক্তৃতা বলছিল, প্রধানমন্ত্রী যে সিঙ্গুরে শিল্প ফেরানোর বার্তা দিয়ে যাবেন, সে বিষয়ে তাঁরা প্রায় নিশ্চিত। প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে পৌঁছোনোর পরে দু’জন ভাষণ দেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং রাজ্য সভাপতি শমীক। রাজ্য সভাপতি সিঙ্গুরকে ‘শিল্পের বধ্যভূমি’ আখ্যা দিলেন। কিন্তু তাঁর পরেই ভাষণ দিতে উঠে মোদী সে সব প্রসঙ্গে ঢুকলেন না। ‘বধ্যভূমি’ হোক, সিঙ্গুর থেকে টাটার বিদায় হোক বা তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালে গুজরাতের সাণন্দে টাটার পদার্পণ, কোনও প্রসঙ্গেই গেলেন না। বরং সিঙ্গুরকে ‘পবিত্রভূমি’ বলে প্রণাম জানালেন।
ত পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়ন নিয়ে মোদী যা বলেছেন, ‘‘এ রাজ্যে বিনিয়োগ তখনই আসবে, যখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক হবে। কিন্তু এখানে মাফিয়াদের ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে সব কিছুতে সিন্ডিকেট ট্যাক্স বসিয়ে রাখা হয়েছে। এই সিন্ডিকেট ট্যাক্স এবং মাফিয়াবাদকে বিজেপিই শেষ করবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি।”
রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব প্রত্যাশিত ভাবেই মোদীর ‘ঢাল’ হয়ে ওঠার চেষ্টায়। সভার পরে শমীক বলছেন, ‘‘সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, সেটাই তো এ রাজ্যের শিল্পায়ন সম্ভাবনার বিষয়ে মোদ্দা কথা! আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক না-হলে কেউ পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করতে আসবেন না। আর আইনশৃঙ্খলা ঠিক করবে বিজেপি। এটাই আসল কথা। সিঙ্গুরই ছিল এই বার্তা দেওয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান।’’ রাজ্য বিজেপি সভাপতির মতে, ‘‘মোদীজি সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে গ্যারান্টি দিয়ে গিয়েছেন। গ্যারান্টি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করার এবং তার মাধ্যমেই বিনিয়োগ ফেরানোর।’’
সব মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদিজির সিঙ্গুরের সভা থেকে বাংলার মানুষ শুধু শূন্য পেল এর বেশি কিছু পেল না। বাংলার মানুষ কে এসআইআর নিয়ে যেভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে তা নিয়েও নরেন্দ্র মোদির চুপ। হিন্দুদের হৃদয় সম্রাট নরেন্দ্র মোদি র আমলে কেন হিন্দু সমাজ এস আই আর এর নামে ম্যাকানি চোবানি খাবে। সে প্রশ্নের উত্তর বিজেপি নেতাদের কাছে নেই। এই পরিস্থিতিতে বাংলার বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে মমতার বিকল্প বিজেপি হতে পারছে না তার জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল মোদিজীর সভার পর।
শমীক যে ব্যাখ্যাই দিন, বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বও যে খানিক হতাশ, সে খবর বিজেপি সূত্রে মিলছে। সিঙ্গুরকে সভাস্থল হিসাবে বেছে নেওয়ার যে তাৎপর্য, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে তার আঁচ যে তেমন মেলেনি, তা বিজেপির অনেক প্রথম সারির নেতাও মনে করছেন। আগামী কয়েক দিনে এ সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের মোকাবিলা যে করতে হবে, সে বিষয়েও রাজ্য বিজেপির অন্দরে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।
প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠতেও শুরু করেছে। রবিবারই তৃণমূলের তরফ থেকে শশী পাঁজা বলেছেন, ‘‘সকাল থেকে যেন একটা চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল। মনে হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী এসে সিঙ্গুরকে উদ্ধার করে দেবেন। কিন্তু তাঁর বক্তৃতা অসম্পূর্ণ ছিল, না কি অস্পষ্ট ছিল, জানা নেই। আমরা দেখলাম, বিজেপি নেতৃত্ব যে প্রত্যাশার কথা বলছিলেন, সে রকম কোনও প্রত্যাশা বা আশার আলো তিনি দেখাতে পারেননি।’’ সিঙ্গুরের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনে ‘হতাশ’ হয়েছেন বলে দাবি করেছে তৃণমূল।

