কাকদ্বীপের মূর্তি ভাঙার ঘটনায় গ্রেফতার আরএসএস কর্মী দাবি পুলিশের, বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নয় কেন? বাংলার মানুষের প্রশ্ন
সেখ ইবাদুল ইসলাম: সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার হয়েছিল বিজেপি চেষ্টা করেছিল এই রাজ্যে নতুন করে দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি করতে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কাকদ্বীপে কালীমূর্তি ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এমন কিছু মন্তব্য করেছিলেন তা এই রাজ্য এবং দেশের সংহতির পক্ষে বিপদজনক বললে ভুল হবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল রাজ্য পুলিশের তৎপরতায় কালীমূর্তি ভাঙার ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে একজন বিজেপি কর্মীকে। তিনি আবার আরএসএসের সক্রিয় কর্মী বলে জানা গেছে।
এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে একজন বিরোধী দলনেতা যিনি সংবিধানকে শপথ নিয়ে দেশ এবং জাতির মর্যাদার রক্ষায় কাজ করে চলেছেন এবং সেটা তার রক্ষা করাটা নৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব বলে একই সঙ্গে সাংবিধানিক দায়িত্বও বলা যেতে পারে তিনি যখন সেই দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ তখন তার বিরুদ্ধে এই রাজ্য সরকার কি ব্যবস্থা নিতে চলেছে সেটা প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জানাতে হবে। এই ঘটনার যদি একজন সাধারণ নাগরিক করতেন সেক্ষেত্রে রাজ্য সরকার কি ভূমিকা নিত? দেশের তথা রাজ্যের একটি বিশেষ সাম্প্রদায়কে নিশানা করে দিনের পর দিন যে মিথ্যা চার চালানো হচ্ছে তার বিরুদ্ধে সরকার কেন চুপ করে আছে?

শুধু বিবৃতি দিয়ে বা শুভেন্দু অধিকারী কে আক্রমণ করে এ কাজ করলে হবে না প্রয়োজন হলে হাইকোর্ট ছেড়ে সুপ্রিম কোর্টে যেতে হবে দেশের সংহতি এবং সম্প্রীতির স্বার্থে। রাজ্য সরকার যেখানে সামান্য ঘটনায় কথায় কথায় সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারেন সেখানে এই রাজ্যের সম্প্রীতি বিপন্ন করার দায়ে কেন শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করছেন রাজ্য সরকার সেটা বড্ড জানতে ইচ্ছা করে? যদিও এই ঘটনার পর তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুনাল ঘোষ সংবাদ মাধ্যমের কাছে মন্তব্য করেছেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বিজেপি এটায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রং চড়াল। শেষে দেখা গেল বিজেপির যুব মোর্চার নারায়ণ হালদার নামে একজন। এই ঘটনা অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় সে ঘটিয়েছে নাকি ঘটানো হয়েছে সেটা দেখা হবে। বিজেপির তরফে কেউ এ জিনিস ঘটিয়েছে কি না সেটাও দেখতে হবে।”
মঙ্গলবার গভীর রাতে কাকদ্বীপের হারউড পয়েন্ট কোস্টাল থানার সূর্যনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর চন্দননগর নস্করপাড়ায় কালীমূর্তি ভাঙাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ যায়। কমিটির কর্তারা পুলিশকে জানান, ভাসানের পর তাঁরা লিখিত অভিযোগ জানাবেন ও তারপরই যেন দ্রুত দোষীকে ধরা হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই অন্যান্য গ্রাম থেকে প্রচুর অবাঞ্ছিত বহিরাগত লোক সেখানে ঢুকে পড়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কালীমূর্তি ১১৭ নম্বর জাতীয় সড়কের উপর রেখে রাস্তা অবরোধ করে। স্থানীয় সূত্রে খবর, অবরোধে যুক্ত ছিলেন বিজেপির সমর্থক ও কর্মীরা। তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপিই পরিকল্পনা করে গোটা কাণ্ডটি ঘটিয়ে গ্রামের মানুষকে জড়ো করে পথ অবরোধ করে। উদ্দেশ্য ছিল, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর ও এলাকার শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করা। পথচলতি বহু সাধারণ মানুষ, যানবাহন এমনকী অ্যাম্বুল্যান্সও অবরোধের জেরে আটকে পড়ে। অবরোধকারীদের হাতে ছিল লাঠি এবং ইটপাটকেল। অবরোধ তুলতে এসে পুলিশকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। পুলিশকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ইটপাটকেল। একজন পুলিশকর্মী আহতও হন। পুলিশের বক্তব্য, “তখন কালীমায়ের সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষাকেই আমরা সবচেয়ে প্রাধান্য দিই। দ্রুত অ্যাকশন নিয়ে ইটবৃষ্টি থেকে বাঁচিয়ে কালীমূর্তি নিরাপদভাবে প্রিজন ভ্যানে তুলে নেওয়া হয়। কারণ, সেই সময় অন্য কোনও সুরক্ষিত গাড়ি আশপাশে ছিল না। আমরা যা করেছি, মা কালীর সম্মান ও পবিত্রতা রক্ষা করে শান্তি বজায় রাখার জন্য করেছি। এই নিয়ে অযথা বিভ্রান্তি ছড়াবেন না। গুজবে কান দেবেন না।”
সুন্দরবন পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার কোটেশ্বর রাও এদিন সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, মূর্তি ভাঙার ঘটনায় এ পর্যন্ত নারায়ণ হালদার নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি পুলিশের কাছে তার অপরাধের কথা স্বীকারও করেছে। ধৃত ব্যক্তি পুলিশকে জানায়, সম্পূর্ণ মদ্যপ অবস্থাতেই সে এই কাজটি করেছে যার জন্য সে অনুতপ্ত। ধৃতকে এদিন কাকদ্বীপ আদালতে তোলা হলে তাঁকে পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। তদন্ত এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান। মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদার বলেন, সারা বাংলায় যেভাবে মিথ্যে প্রচার করে বিজেপি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করছে কাকদ্বীপেও সেই একই চেষ্টা হয়েছিল। বিজেপির অভিসন্ধি ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কাকদ্বীপের ঘটনায় রাজ্য সরকার শুধুমাত্র ওই আরএসএস কর্মীকে গ্রেফতার করে দায় এড়াতে পারে না। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনরকম তথ্য-প্রমাণ না নিয়ে যারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নিয়ে নিচ্ছে না রাজ্য পুলিশ সেটা জানাতে হবে। এই ধরনের ঘটনা বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে চলেছে কিছুদিন আগে নদীয়াতে হয়েছে তারপরে মুর্শিদাবাদে হয়েছে তারপরে কাকদ্বীপে হলো এই ঘটনাগুলি অবিলম্বে প্রশাসনকে ঘটনার ভেতরে ঢুকে রহস্য বের করতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিপন্ন করা বা সংহতি কে বিপন্ন করার সঙ্গে যারা যুক্ত আছেন তারা যত বড় নেতাই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়াটা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজ ধর্মের মধ্যে পড়ে! সেটা কি তিনি করবেন? নাকি রাজনীতির যাতা কলে সবকিছুই চাপা পড়ে যাবে! এই রাজ্যের মুসলিম সমাজ এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না থেকেও অপরাধীর মতো তাদেরকে নিশানা করা হবে! মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে মানবিক বলে দাবি করেন একই সঙ্গে তিনি নিরপেক্ষ প্রশাসন চালান বলে দাবি করে থাকেন। জঙ্গিপুরে সাধারণ একটি ঘটনায় দিনের পর দিন বেশ কয়েকশ মানুষ জেলে আটকে আছে অথচ যারা দেশের সম্প্রীতি এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়ানোর চেষ্টা করছেন তাদের বিরুদ্ধে সেভাবে রাজ্য সরকার সক্রিয় নয় কেন?

