কলকাতা 

পার্কসার্কাস এলাকার কফিহাউসের আড্ডাপ্রিয় মহারাজ ভাই আর নেই: একটি যুগের অবসান/মোহাম্মদ সাদউদ্দিন 

শেয়ার করুন

৬ মার্চ , সোমবার।একটি খবর আমার বা আমাদের কাছে বলা যায় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই লেগেছিল।পার্কসার্কাস এলাকার ট্রাম ডিপোর কাছে কংগ্রেস এক্সিবেশন রোডের সেই আড্ডাপ্রিয় মহারাজভাই আর আমাদের মধ্যে নেই।বিশিষ্ট শিক্ষক রফিক মীর আমাকে খবরটা প্রথম দেন।তারপর আমি একে একে কবি জিয়াদ আলী, কবি সৈয়দ হাসমত জালাল, তথ্যচিত্র নির্মাতা মুজিবুর রহমান, শিক্ষক মুজিবুর রহমান , সাংবাদিক জামিতুল ইসলাম, ইবাদুল ইসলাম সালেহা বেগম ও কাজী গোলাম গউস সিদ্দিকীর সঙ্গে যোগাযোগ করি।সকাল সওয়া এগারোটা নাগাদ তিনি যাদবপুর কেপিসি হাসপাতালে মারা যান। শিক্ষক মুজিবর রহমানের কাছ থেকে মহারাজ ভাই-এর বৌমা মেরিনার ফোন নম্বরটা নিয়ে ফোন করে জানতে পারলাম রিলিজ হতে ৪-৫ঘন্টা লাগবে।এও জানলাম যে, পার্কসার্কাসের বাড়িতে লাশ আসবে।সেখানেই গোসল করিয়ে নিয়ে মহারাজ ভাই-এর শেষ ঠিকানা হবে আরামবাগের ছাঁদড়া গ্রামে পৈতৃক ভিটায়।ঠিক সেটাই হয়েছে।

শারিরীকভাবে মহারাজ ভাই কমজুরি হয়ে উঠছিলন সেটা অনেক আগেই বোঝা গিয়েছিল।কিন্তু তার মনের জোর এতটাই ছিল যে, যখনই আমি বা অন্য কেউ দেখা করতে যেতাম, বলতেন আমি ঠিক আছি।তারপর শুনলাম যাদবপুর কেপিসিতে চিকিৎসাধীন। একদিন দেখতেও গেলাম।আমার সঙ্গে কথা বললেন কিছুটা হাত নেড়ে।তখনই বুঝতে পেরেছিলাম , আর মনে হয় তিনি খাড়া হতে পারবেন না।ঠিক সেই আশঙ্কাই সত্য হল।কঠোর প্রাণশক্তি ও মনোবলের অধিকারী ছিলেন মহারাজভাই।

প্রকৃত নাম মোশারফুল ইসলাম তরফদার। আমাদের কাছে তিনি ” মহারাজ”। যেন পার্কসার্কাস এলাকার আরেক কফিহাউসের নায়ক।লম্বা ও দীর্ঘকায়।ফরসা রঙের আরেক ” সেলিম”।পার্কসার্কাস এলাকার ঝাউতলা রোডের আমানত ফাউণ্ডেশনের বিভিন্ন সেমিনারে তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ।তারপর ঘনিষ্ঠতা।আমাকে বলতেন, আপনার লেখালেখিগুলো কলম, নতুনগতি, একদিন, প্রতিদিন, কালান্তর-এ পড়ি।আমাদের কালান্তর-এর অফিস তখন পাশেই কাশিয়াবাগান ক্লাবের কাছে ঝাউতলা রোডে।এখনকার কোয়েস্ট মলের পিছন দিকে।সেই সূত্রে অফিস করে আমি ওনার বাড়িতে চলে যেতাম।কবি-সাংবাদিক লেখক , শিক্ষক, অধ্যাপক , কে না যেতেন।তার ঐ বাড়ি হয়ে উঠেছিল যেন এলাকার আরেক আরেক ” কফি হাউস”।

ধর্মচর্চা থেকে ইতিহাসে সাহিত্য——-কী না আলোচনা হোত।কোনোদিন অস্বস্তিবোধ করতেন না।তারপর আড্ডা দিতে দিতে নিজেই চা করে খাওয়াতেন।দু-একদিন না গেলে ফোনে তাড়া দিতেন।আমাদের সমাজের লোকজন একটু হামবড়াই ভাব দেখান।মহারাজভাই সেদিক থেকে অন্যগুনের।সহজেই মানুষের‌ সঙ্গে মিশে যেতেন।বাড়িতে নানান পুস্তকের সংগ্রহ। মহারাজভাই আজ না ফেরার দেশে।যেখানেই থাকুন আপনি আবার ফোনে তাড়া দেবেন মহারাজ ভাই।আপনি আমাদের আত্মার আত্মীয়।যেন আড্ডা প্রিয় এক অভিভাবক।যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ