কলকাতা 

ওআরএসের জনক কৃতি বাঙালি চিকিৎসক দিলীপ মহলানবিশ নিরবে চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে, রেখে গেলেন এক বিরাট কর্মযজ্ঞের ইতিহাস , বাঙালি কী মনে রাখবে তার কৃতি সন্তানকে?

শেয়ার করুন

বাংলার জনরব ডেস্ক : বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে কলেরা বা ডায়েরিয়া রোগ থেকে মুক্তি দিতে অল্প খরচে ওআরএস ব্যবহার চালু করে চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুগান্তর সৃষ্টি যিনি করেছিলেন, সেই প্রখ্যাত কিংবদন্তী বাঙালি চিকিৎসক দিলীপ মহলানবিশ শনিবার রাতে পরলোকগমন করেছেন । প্রচার বিমুখ এই কিংবদন্তী চিকিৎসক বাইপাশের ধারে এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন । বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর । দীর্ঘদিন ধরে বয়স জনিত কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন ।

দুঃখের হলেও সত্য যে হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন সেই হাসপাতালের চিকিৎসকরা এই কিংবদন্তী চিকিৎসকের পরিচয়ও জানতে পারেননি । নিরবে তিনি চলে গেলেন । বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময় হাজার হাজার মানুষ কাতারে কাতারে পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তে জড়ো হয়েছিল । এই মানুষদের মধ্যে কলেরা ও ডায়েরিয়ার সংক্রমণ প্রবলভাবে দেখা যায় । সেই সময় দিলীপ মহলানবিশ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আর্ত-মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন । এই সময়  স্যালাইন সূচের মাধ্যমে ধমনীতে প্রবেশ করানোর বদলে পানীয়ের সাহায্যে খাওয়ানো শুরু হয়। নুন-চিনি-বেকিং সোডার জল দিয়ে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন দিলীপ, অথচ তখনও ওআরএসের প্রয়োগে স্বীকৃতিই দেয়নি বিশ্ব চিকিৎসার নিয়ামক সংস্থা। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করেছিলেন এই চিকিৎসক। পরে তাঁর হাত ধরেই স্বীকৃতি পায় ওআরএস।

১৯৫৮ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ডাক্তারি পাশ করে সেখানেই শিশু বিভাগে ইনটার্নশিপ শুরু করেন দিলীপ। ১৯৬০-এ লন্ডনে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস চালু হতে প্রচুর ডাক্তারের চাহিদা তৈরি হয়। দিলীপ আবেদন করতেই সুযোগ পান। এর পর লন্ডনে ডিসিএইচ করেন। এডিনবরা থেকে এমআরসিপিও। তার পর কুইন এলিজ়াবেথ হসপিটাল ফর চিল্ড্রেন-এ রেজিস্ট্রার পদে যোগ দেন এই বাঙালি চিকিৎসক। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৮। ওই পদেও তিনিই প্রথম ভারতীয়।

এর পর আমেরিকায় জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির মেডিকেল কেয়ার ফেলো পদে যোগ দেন দিলীপ। তখন ওই প্রতিষ্ঠানের একটি আন্তর্জাতিক কেন্দ্র ছিল বেলেঘাটার আইডি হাসপাতালে। কলেরা আক্রান্তদের চিকিৎসা হত সেখানে। ১৯৬৪-তে দেশে ফিরে দিলীপ সেখানে যোগ দেন। শুরু করেন ওআরএস এবং স্পেশাল মেটাবলিক স্টাডি নিয়ে গবেষণার কাজ। হাতেকলমে সাফল্য পেলেও গবেষণাপত্র বার করা হয়ে ওঠেনি। তার পরেই ঘটে ১৯৭১ সালের ওই ঘটনা।

তিনি বিশদ তথ্য দিয়ে ওআরএসের প্রয়োগ নিয়ে পেপার লেখেন যা ১৯৭৩-এ জন হপকিনস মেডিক্যাল জার্নালে তা প্রকাশিত হয়। পরে ‘ল্যানসেট’ পত্রিকাও স্বীকৃতি দেয় ওই গবেষণালব্ধ পর্যবেক্ষণকে। কলেরা কিংবা ডায়েরিয়া রোগে আর আইভি-র (ইন্ট্রাভেনাস) পরিবর্ত হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি পায় ওআরএস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনিসেফ সসম্মানে ডেকে নেয় তাঁকে।

১৯৮০-র মধ্যপর্ব থেকে ১৯৯০-এর প্রথম পর্ব পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডায়রিয়া ডিজ়িজ় কন্ট্রোল প্রোগ্রাম-এর মেডিক্যাল অফিসার ছিলেন তিনি। ১৯৯০-এ বাংলাদেশে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়ারিয়াল ডিজ়িজ় রিসার্চ-এর ক্লিনিক্যাল সায়েন্সের ডিরেক্টর হন। পরে ১৯৯৪-এ রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স-এর সদস্য নির্বাচিত হন। পার্ক সার্কাসে ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ-এও যুক্ত ছিলেন।

তাঁর জন্ম হয়েছিল অবিভক্ত বাংলার কিশোরগঞ্জে। স্বাধীনতার সময় তাঁর পরিবার পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন। প্রথমে বরাহনগর, পরে শ্রীরামপুর। কাজের জন্য অসংখ্য পুরস্কার এবং সম্মান পেয়েছেন। বাংলার এই কৃতি চিকিৎসক নিরবে বিদায় নিলেন । ওআরএস এর আবিস্কার কর্তা চলে গেলেন নিরবেই । প্রচারবিমুখ এই মানুষটি মৃত্যু পরেই অন্তরালে চলে গেলেন । তাঁর এই বিরাট কর্মযজ্ঞের ইতিহাস হয়তো অজানা থেকেই যাবে ।

তথ্য সূত্র : ডিজিটাল আনন্দবাজার।


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ