জন্মদিনে স্মরণ : দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন : অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ত্যাগের এক অনন্য প্রতীক
জন্মদিনে স্মরণ
*দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন : অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও ত্যাগের এক অনন্য প্রতীক*
নাফিসা ইসমাত
পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি কেবল একজন ক্ষুরধার ব্যারিস্টার বা দক্ষ রাজনীতিবিদই ছিলেন না, বরং ছিলেন চরম আত্মত্যাগ এবং গভীর অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার এক মূর্ত প্রতীক। দেশের ডাকে তিনি তাঁর বিপুল আয়ের ব্যারিস্টারি পেশা এবং নিজের বাড়ি ও সমস্ত সম্পত্তি অবলীলায় বিলিয়ে দিয়ে দেশবাসীর কাছ থেকে লাভ করেছিলেন ‘দেশবন্ধু’ উপাধি।
চিত্তরঞ্জন দাসের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল তাঁর দৃঢ় অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, হিন্দু-মুসলিম একতা ও অধিকারের সাম্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া ভারতের প্রকৃত স্বাধীনতা বা স্বরাজ অর্জন অসম্ভব। এই চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিতে ১৯২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর তিনি ঐতিহাসিক ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ স্বাক্ষর করেন, যা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এই চুক্তির মাধ্যমে তিনি জনসংখ্যা অনুযায়ী আইনসভায় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করেন, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সংখ্যাগুরু মুসলমানদের জন্য ৬০ শতাংশ আসন বরাদ্দ করেন এবং সরকারি চাকরিতে পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ৫৫ শতাংশ পদের ঐতিহাসিক ব্যবস্থা করে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার সাহসী পদক্ষেপ নেন। পাশাপাশি, পারস্পরিক ধর্মীয় ভাবাবেগকে সম্মান জানাতে মসজিদের সামনে বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ করার মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়ও তিনি এতে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং তৎকালীন বহু শীর্ষনেতার বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির স্বার্থে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন।
‘মালঞ্চ’ ও ‘মালা’ কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা এই কবি-রাজনীতিবিদ তাঁর সংবেদনশীল মন দিয়ে এমন এক মুক্ত ও উদার সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সাথে বসবাস করতে পারবে। মাত্র পঞ্চান্ন বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনকালে তিনি যে তিতিক্ষা, অসাম্প্রদায়িক আদর্শ ও নিখাদ মানবতাবাদের বীজ বপন করে গেছেন, তা শত বছর পরেও প্রতিটি প্রগতিশীল ও সম্প্রীতিপ্রিয় মানুষের মনে অনুপ্রেরণার আলো জ্বালিয়ে চলেছে এবং তাঁকে আজীবন আপামর বাঙালির হৃদয়ে এক অবিসংবাদিত ও প্রাতঃস্মরণীয় অধিনায়ক হিসেবে অমর করে রেখেছে।

