আজব কান্ড উত্তরপ্রদেশের বিধান পরিষদ নির্বাচনে! ভোটার তালিকায় অদ্ভুত নামের ছড়াছড়ি! গলদ স্বীকার করে নির্বাচন কমিশন কী বার্তা দিল?
বাংলার জনরব ডেস্ক : নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যতই বলুক না কেন কংগ্রেসসহ বিরোধীরা ভোট চুরি নিয়ে মিথ্যা প্রচার করছে এবং তারা অনুপ্রবেশকারীদের উৎসাহিত করছেন। কিন্তু বাস্তব সত্য হল যত দিন যাচ্ছে ততই নির্বাচন কমিশনের ভোট চুরির তথ্য বেশি করে সামনে আসতে শুরু করেছে। এবং সেটা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। আজ তেইশে অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের ১১ টি বিধান পরিষদ আসনের নির্বাচন হচ্ছে।
আর এই নির্বাচনের জন্য যে ভোটার তালিকা তৈরি করা হয়েছে তা করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সেই কমিশনের তালিকায় এমন সব অদ্ভুত নাম দেখা যাচ্ছে যা শুনে অনেকেই বিস্মিত হয়ে পড়েছেন। যেমন, এক ভোটারের নাম ‘রাম নে যাদব কো মারা’, বাবার নাম ‘মূর্খ চন্দ্র যাদব’! অন্য এক ভোটারের নাম ‘রাম নে শর্মা কো মারা’, বাবার নাম ‘বি.কম’! কোনও কৌতুকের চিত্রনাট্য নয়, উত্তরপ্রদেশ বিধান পরিষদ নির্বাচনে ইলাহাবাদ-ঝাঁসী স্নাতক কেন্দ্রে ভোটার তালিকায় এ রকমই অদ্ভুত সব নাম ঘিরে ভোটার রেকর্ডের বিশ্বাসযোগ্যতা ও যাচাইপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অদ্ভুত এই নামগুলি নিয়ে ক্ষোভ ও সমালোচনা বাড়তেই বৃহস্পতিবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) নবদীপ রিণওয়া জানিয়েছেন, এই প্রথম বার স্নাতক এবং শিক্ষক কেন্দ্রগুলির জন্য জেলাভিত্তিক ‘ম্যানুয়াল’ ব্যবস্থার বদলে অনলাইনে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্বাচন দফতরের আইটি দল মাত্র চার মাসের মধ্যে এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করে। এই সিস্টেমে ভোটার রেজিস্ট্রেশন, আবেদনপ্রক্রিয়া, অনুমোদন, বাতিল, ডুপ্লিকেশন চেক, সিরিয়ালাইজ়েশন এবং ভোটার তালিকা ডাউনলোডের মতো একাধিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের সময় ইংরেজিতে টাইপ করা নাম হিন্দিতে রূপান্তরের সময় এই প্রযুক্তিগত ত্রুটি ঘটে। সফটওয়্যারটি ইংরেজি উচ্চারণকে হিন্দিতে লেখার বদলে শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ করে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, ‘রামহিত যাদব’ নামটি ভুলবশত ইংরেজিতে ‘রাম হিট যাদব’ টাইপ করা হয়েছিল। সফটওয়্যারটি ‘হিট’ শব্দের অনুবাদ করে নামটির অর্থ দাঁড় করায় ‘রাম নে যাদব কো মারা’। একই রকম ভুল আরও বেশ কিছু এন্ট্রিতে দেখা গিয়েছে। অন্য দিকে, বাবার নামের জায়গায় ‘বি.কম’ লেখার পিছনে কর্মীদের গাফিলতিকেই দায়ী করা হয়েছে।
রিটার্নিং অফিসার (আরও) এবং নির্বাচন আধিকারিকদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল বৈঠকে রাজনৈতিক দল ও সমাজমাধ্যমের অভিযোগের কথা স্বীকার করে নেন সিইও। তিনি জানান, রাজ্যের মোট ১৪ লক্ষ ৮১ হাজার ৩১০ জন ভোটারের মধ্যে ১৫৮টি (০.০১ শতাংশেরও কম) এন্ট্রিতে এই ধরনের ভুল পাওয়া গিয়েছে। তবে সিইও-র বিবৃতিতে এই বিষয়টি স্পষ্ট নয় যে, কী ভাবে এই অদ্ভুত নামগুলি যাচাইপর্ব পার করে গেল এবং এই ভুলগুলি ঠিক কোন স্তরে হয়েছে। আবেদনে, ডেটা এন্ট্রিতে না কি পরবর্তী প্রসেসিং পর্যায়ে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, ভোটার তালিকা ত্রুটিমুক্ত রাখার দায়িত্ব ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা ইআরও (বিভাগীয় কমিশনার) এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার বা এইআরও-র (সংশ্লিষ্ট জেলার জেলাশাসক)। ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা থাকলেও, সংশ্লিষ্ট স্তরে যথাযথ নজরদারির অভাবেই ভুলগুলি থেকে গিয়েছে। এই ঘটনায় আধিকারিকদের কাছে জবাবদিহি চেয়েছে প্রশাসন। তবে ছাপার ভুল বা করণিক ত্রুটির কারণে যাতে কোনও বৈধ ভোটারের ভোটদানের অধিকার কেড়ে নেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে জেলাশাসকদের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইলাহাবাদ-ঝাঁসীর বিতর্কের মধ্যে পীলীভীত সদর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় ব্যাপক অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয় উত্তরপ্রদেশ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি। তাদের অভিযোগ, এসআইআর-এর পর প্রকাশিত ভোটার তালিকার চূড়ান্ত খসড়ার কয়েক সপ্তাহ পরেই ১৩,১৫০ জন ভোটারের তথ্য বদলে দেওয়া হয়েছে।
কংগ্রেসের রাজ্য স্তরের ভারপ্রাপ্ত নেতা রাজেন্দ্র পাল গৌতম বলেন, “গত ১০ এপ্রিল ভোটার তালিকার চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশিত হয়। এর অর্থ ছিল, ভোটারদের ক্রমিক নম্বর, নাম, নামের বানান, ঠিকানা এবং এপিক নম্বর সঠিক আছে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পর পীলীভীত সদর বিধানসভা কেন্দ্রের ১৩,১৫০ জন ভোটার দেখেন যে, তাঁদের এপিক নম্বর ও ক্রমিক নম্বর এক থাকলেও বদলে গিয়েছে নাম! সমস্ত প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও ৮০০ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং ওই ঠিকানায় থাকেন না এমন ২,৬০০ জনের নাম তালিকায় ঢোকানো হয়েছে।” সমাজবাদী পার্টিও (এসপি) এই নিয়ে সোচ্চার হয়।
বৃহস্পতিবার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিণওয়ার লখনউয়ের দফতর থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, তদন্তে পীলীভীতে বেনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। গত ৩১ মে থেকে ২৯ অগস্টের মধ্যে ভোটার নথিভুক্তিকরণ কেন্দ্রের এক জন কম্পিউটার অপারেটর ভোটার তথ্যে পরিবর্তনের জন্য ১৩,৭৭৯টি ‘ফর্ম-৮’ জমা করেন। এর মধ্যে ১০,৪৭০টি আবেদন অনুমোদিত হয় এবং ৩,৩০৯টি বাতিল হয়। অথচ এই সংক্রান্ত কোনও আবেদনপত্র বা সহায়ক নথিপত্র দফতরে পাওয়া যায়নি।
এই বেনিয়ম ধরা পড়ার পরই বৃহস্পতিবার পদক্ষেপ করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। পীলীভীতের জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক অলোক কুমার সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করছি। মহকুমাশাসক (এসডিএম) পদমর্যাদার দু’জন ইআরও-কে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে এবং এক জন কম্পিউটার অপারেটরকে বরখাস্ত করা হয়েছে।”
প্রশাসন সূত্রে খবর, বরখাস্ত হওয়া ওই কম্পিউটার অপারেটরের নাম অনিল কুমার। অন্য দিকে, ১০,৪৭০টি এন্ট্রিতে বেনিয়মের অভিযোগে ওই দুই ইআরও ময়ঙ্ক গোস্বামী এবং হেমন্ত চৌধরীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

