তৃণমূল কাউন্সিলরকে কুত্তা বলে অভিহিত করলেন সাংসদ, খোদ কলকাতায় গোষ্ঠী কোন্দলে উত্তাল তৃণমূল!
বিধানসভা নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। উত্তর কলকাতার তৃণমূল সংগঠনেও সেই বিতর্ক চেপে রাখা গেল না। দলের সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে ক্ষোভ উগরে দিলেন খোদ কাউন্সিলর। সুদীপ নিজে এবং তাঁর ঘনিষ্ঠেরা পাল্টা জবাব দিলেন। কুকথার বন্যা বয়ে গেল গ্রুপ জুড়ে। সেই সমস্ত হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশট ফাঁস হয়ে গিয়েছে।
বিধানসভা ভোটে গোটা রাজ্যের মতো কলকাতাতেও মুখ থুবড়ে পড়েছে তৃণমূল। হাতে গোনা কয়েক জন নেতা জিততে পেরেছেন। বাকিরা উড়ে গিয়েছেন বিজেপির ঝড়ে। অভিযোগ, ভোটের ফলঘোষণার পর থেকে অনেক তৃণমূল নেতাই ঘরছাড়া। ভোট-পরবর্তী হিংসার আতঙ্কে তাঁরা ত্রস্ত। এই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের উত্তর কলকাতার ‘অফিসিয়াল’ হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে সুদীপের বিরুদ্ধে সরাসরি তোপ দাগেন ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। সাংসদের নাম করে তাঁর উদ্দেশে লেখেন, ‘‘আপনি উত্তর কলকাতার অঘোষিত সম্রাট। আপনার তো উচিত ঘরছাড়াদের ঘরে ঢোকানো। সেই জায়গায় আপনি তো নিজেই ঘরে ঢুকে আছেন। অনেক দিন ধরে পদ আঁকড়ে বসে আছেন। অনেক হয়েছে, এ বার ছাড়ুন। সুস্থ থাকুন, ভাল থাকুন।’’

সুব্রতের এই মেসেজের পর হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপটিতে কার্যত রে রে করে তেড়ে আসেন সুদীপ-ঘনিষ্ঠ তৃণমূল কাউন্সিলরেরা। কেউ কেউ শশী পাঁজার ভূমিকা নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন তোলেন। ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুদীপ-ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর সুনন্দা সরকার সুব্রতকে উদ্দেশ করে লেখেন, ‘‘তোমার এমএলএ কী করছে? যার এত ক্ষমতা, সে নিজের দলের কর্মীদের থানায় বসিয়ে রাখত। এখন উনি কোথায়?’’ সুব্রত এর উত্তরে বলেন, ‘‘শশী পাঁজা আর এমএলএ নেই, কিন্তু সুদীপদা এখনও এমপি, প্রেসিডেন্ট উত্তর কলকাতার।’’ কাউন্সিলরদের এই দলাদলির মধ্যে সুদীপ নিজে উত্তর দেন। সুনন্দার উদ্দেশে তিনি গ্রুপেই লেখেন, ‘‘এদের একটাই উত্তর। হাতি চলে বাজার, কুত্তা ভোকে হাজার। জবাব দিও না। আমি দিয়ে দেব।’’ সুব্রত পাল্টা লেখেন, ‘‘দাদা, আমি দলের সৈনিক। ‘কুত্তা’ নই। আমরা দলের সৈনিক আর আপনি আমারই চেয়ারম্যান। আমি তো আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করেছি।’’ তৃণমূলের হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপের এই চ্যাট সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
এ প্রসঙ্গে সুদীপের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি ফোন ধরেননি। কাউন্সিলর সুব্রতের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যায়নি। সুনন্দাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। তবে চ্যাটের বিষয়টি অস্বীকারও করেননি। তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘‘এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।’’
হোয়াট্সঅ্যাপ চ্যাট প্রকাশ্যে আসার পর থেকে তৃণমূলের অন্দরে বিতর্কের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তবে প্রকাশ্যে কেউ তেমন কোনও মন্তব্য করছেন না। কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ (পরিবেশ) তথা উত্তর কলকাতা জেলা তৃণমূলের কোর কমিটির সদস্য স্বপন সমাদ্দার বলেন, ‘‘আমি সর্বক্ষণের রাজনীতিক। তা ছাড়াও প্রশাসনিক কিছু দায়িত্ব আমার রয়েছে। হোয়াট্সঅ্যাপ, ফেসবুক কিংবা কোনও সমাজমাধ্যমে আমি সে ভাবে সক্রিয় নই। দলের হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপে কী হয়েছে, বলতে পারব না। তবে যদি সাংসদের সঙ্গে কাউন্সিলরদের কোনও বিষয়ে মতপার্থক্য হয়েও থাকে, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার সময় যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে বলে শুনছি, তা কাম্য নয়।’’
উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপকে নিয়ে দলের অন্দরে একাংশের মধ্যে যে ক্ষোভ রয়েছে, তা কারও অজানা নয়। এর আগেও সেই ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে এসেছিল। বেলেঘাটার জয়ী তৃণমূল প্রার্থী কুণাল ঘোষের সঙ্গেও তাঁর দ্বন্দ্ব চাপা থাকেনি। দলের বিপর্যয়ের পর সেই অন্তঃকলহ আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। বিজেপি সরকার গঠন করার পর রাজ্যে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় এ বার দেখা যাবে তৃণমূলকে। ইতিমধ্যে দলের তরফে বিরোধী দলনেতা হিসাবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। সুদীপের স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে করা হয়েছে বিধানসভায় তৃণমূলের উপদলনেতা। দলের একাংশ এই নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ। তাঁদের অভিযোগ, নয়নাকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার নেপথ্যেও ‘প্রভাব’ খাটিয়েছেন সুদীপ। নেতা-কর্মীদের ক্ষোভ এ বার দলের বাইরেও বেরিয়ে পড়তে শুরু করল।

