পরাজয় স্বীকার করে বড় বার্তা দিলেন তৃণমূলের সেনাপতি ! কী সেই বার্তা?
দলের ভিতরে বিদ্রোহ। ২০২৬ নির্বাচনের চূড়ান্ত ভরাডুবির পর তৃণমূলের অন্দরে কাটা-ছেঁড়া চলছে। দলীয় মুখপাত্ররা হারের কারণে মুখ খোলায় দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে শোকজ হয়েছেন। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমে পদত্যাগ করতে না চাইলেও রাজ্যপাল বিধানসভা ভেঙে দেন এবং শনিবার, ৯ মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী। একদিকে যখন, নির্বাচনে ভরাডুবিতে দিশেহারা তৃণমূল, তখন প্রথমবার সরকার গঠন করে বিজেপি ও শুভেন্দু অধিকারী সারাদিন লাইম লাইটে। নিঃস্তব্ধ হরিশ চ্যাটার্জী স্ট্রিট ও তৃণমূল কর্মীরা। এই আবহে তৃণমূলের সেনাপতি ও সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর টুইটারে দলীয় কর্মী ও রাজ্যবাসীর উদ্দেশে বার্তা দিলেন।
আজকের দিনটি আমাদের দলের জন্য, আমার জন্য এবং বাংলার মানুষের জন্য এক বড় পরীক্ষার দিন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা এই রাজ্যের সেবা করেছি, মানুষের সুখে-দুখে পাশে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে জনগণ। আজকের এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন এবং নতুন সরকারের শপথগ্রহণের মুহূর্তে আমি মাথা নত করে বাংলার মানুষের রায়কে মেনে নিচ্ছি।

হ্যাঁ, আজ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন সরকারের অভিষেক হচ্ছে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠন করছে। আমি তাঁদের অভিনন্দন জানাই। কিন্তু একইসঙ্গে আমি আমার অগণিত কর্মী-সমর্থকদের বলতে চাই– হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই। রাজনীতিতে জয়-পরাজয় থাকবেই, কিন্তু আদর্শের লড়াই থামলে চলবে না।
আমি মনে করি, একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। আজ থেকে আমরা রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি। আমাদের দায়িত্ব এখন আরও বেড়ে গেল। সরকার যদি জনবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, যদি বাংলার সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের ওপর আঘাত আসে, তবে আমি কথা দিচ্ছি—রাজপথ থেকে বিধানসভা, সর্বত্র আমি এবং আমার দল সাধারণ মানুষের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে লড়াই করবে।
ভোট গণনার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ইভিএম (EVM) নাড়াচাড়া বা পরিচালনার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ, কন্ট্রোল ইউনিটের হিসাবে গরমিল—এমন বেশ কিছু উদ্বেগজনক ঘটনা কোটি কোটি মানুষের মনে এই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে, জনগণের প্রকৃত জনাদেশকে আদৌ সম্মান জানানো হয়েছে কি না। আমি ইতিমধ্যেই গণনা কেন্দ্রগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ (CCTV FOOTAGE) প্রকাশ করার এবং ভিভিপ্যাট (VVPAT) স্লিপগুলোর স্বচ্ছ গণনার দাবি জানিয়েছি, যাতে সত্য মানুষের সামনে আসতে পারে এবং প্রতিটি সন্দেহ খোলাখুলি ও সততার সঙ্গে নিরসন করা সম্ভব হয়।
গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকতে পারে, যখন নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকদের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা যা প্রত্যক্ষ করেছি তা সেই বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
একই সঙ্গে, নির্বাচন পরবর্তী হিংসার রিপোর্ট, দলীয় কার্যালয়ে হামলা, আমাদের দলীয় কর্মীদের ভয় দেখানো এবং সমর্থকদের বিরুদ্ধে হুমকির ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বহু নিষ্ঠাবান তৃণমূল কর্মী এবং সমর্থক, যারা মাঠে নেমে অক্লান্ত লড়াই করেছেন, অভিযোগ উঠেছে যে তাঁদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁরা বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। একটি গণতন্ত্রে কোনো রাজনৈতিক কর্মীকে যেন কখনো তাঁর নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক বিশ্বাসের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়।
এই মহান দেশের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রেখে, তৃণমূল কংগ্রেসে আমার সহকর্মীরা এবং আমি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পাশে এবং সেই প্রতিটি তৃণমূল কর্মীর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকব, যাঁরা একটি আপস করা নির্বাচনী যন্ত্রের (আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী) বিরুদ্ধে জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করেছেন।
আমরা দিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গ–উভয় জায়গাতেই একটি শক্তিশালী, সোচ্চার এবং আপসহীন বিরোধী দল হিসেবে আমাদের ভূমিকা পালন করে যাব।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ ও নেতৃত্বে গণতন্ত্র, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং মানুষের অধিকার ও মর্যাদার জন্য আমাদের লড়াই ভয়হীনভাবে এবং কোনও আপস ছাড়াই চলবে।
আমি প্রতিটি তৃণমূল সমর্থক ও কর্মীকে এই কঠিন সময়ে শক্ত এবং ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। যদি কেউ নির্বাচন পরবর্তী হিংসা, ভীতি প্রদর্শন বা হুমকির শিকার হন, তবে আমি তাঁদের অনুরোধ করছি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বা আমাকে সরাসরি মেসেজ (DM) করে বিস্তারিত জানাতে। আপনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং প্রতিটি উপলব্ধ আইনি ও গণতান্ত্রিক প্রতিকারের পথ অনুসরণ করতে আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করব। সত্যের জয় নিশ্চিত করতে এবং বর্তমান উভয় সরকার যাতে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থে প্রকৃত অর্থে কাজ করে, তা নিশ্চিত করার এই লড়াইয়ে আমি প্রতিটি তৃণমূল কর্মী ও সমর্থকের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াব।

