বেনোজলের ঢেউ / সুচরিতা চক্রবর্তী
সুচরিতা চক্রবর্তী : ” ইতিহাস অর্ধসত্যে কামাচ্ছন্ন এখনো কালের কিনারায় তবুও মানুষ এই জীবনকে ভালোবাসে ; মানুষের মন জীবনের মানে : সকলের ভালো করে জীবনযাপন।
কিন্তু সেই শুভ রাষ্ট্র ঢের দূরে আজ।

চারিদিকে বিকলাঙ্গ অন্ধ ভিড় ; অলীক প্রয়াণ।” জীবনানন্দ দাশ
বর্তমান এই বিশ্ব হনন মুখর। যেখানে যুদ্ধ, হিংসা মানুষের প্রিয় ব্যসন সেখানে কোনো নিরাময় প্রার্থনা করাই বাতুলতা মাত্র। তবুও মানুষ আশা রাখে একদিন সেই আশ্চর্য প্রদীপ জ্বলে উঠুক মানুষ তার ইচ্ছে নদীতে গা’ ভাসিয়ে স্বত:প্রণোদিতভাবে আনন্দের জীবন কাটাক।
মানুষ তার জন্মলগ্ন থেকে সমাজবদ্ধ জীব। সমজেই তার জন্ম সমাজেই তার মৃত্যু। এই সমাজই তার কাছে সবকিছু। শুধু যে মানুষের ক্ষেত্রে কেন যে কোনো প্রাণীর ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। অধ্যাপক ম্যাকাইভার ও পেজের (R.M.Maclver& Page) একটি বক্তব্যে আছে, সমাজ তত্ত্বে সর্বাধিক ও সর্ব পরিবেষ্টিত শব্দ হলো ‘সমাজ’। বস্তুত এই সমাজ হলো একটি সার্বজনীন ধারণা।
সামাজিক অস্থিরতা ও অসাম্য কখনো সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তি – শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে পারে না। মানুষ সততার সাথে চেষ্টা করলে তা দূর করতে পারে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করতে পারে।
হিংসার ব্যবহারে প্রতিহিংসা ও সংঘাত তৈরি হয় এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষতিকর অবস্থা তৈরি হয়, যা পরে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বিগ্রহের জন্ম দেয়। বৌদ্ধ মতে ‘ আত্মশক্তি ‘ জীবনের এক পরম সম্পদ। মানবজীবনে এ শক্তি উদবোধনের জন্য প্রত্যেক মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানে ভূষিত করেছে। মানুষ হিসেবে আমি যেমন শ্রেষ্ঠ, আত্মশক্তিতেও আমি শ্রেষ্ঠ। সুতরাং আমি যদি উত্তম হই, সর্বশ্রেষ্ঠ হই তাহলে আমার প্রতিটি কর্ম ও চিন্তাও হবে উত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ। উত্তম মানুষ কখনো অধর্মকাজ করতে পারে না। শাস্ত্রে বলেছে, ” কখনো হীন আচরণ করো না, প্রমত্ত হয়ো না “।
বিশ্বে এখন বিপন্ন মানবতা, মনুষ্যত্ব বিকাশের চরম বিপর্যয় অবস্থা, ধর্মের নামে অধর্মের প্রসার। ঠিক এখনই যদি সচেতন না হওয়া যায় তবে আর নয়।
বর্তমান সর্বগ্রাসী সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। সেই সঙ্গে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুশীলন, পরমত সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করাসহ সর্বক্ষেত্রে অশ্লীলতাকে শুধু বর্জনই নয় প্রতিরোধ করা আজ আমাদের সমান দায়িত্ব হয়ে পড়েছে যার শুরুটা হতে পারে পরিবার থেকেই। এটা সকলের মনে রাখা উচিৎ সামাজিক সমস্যা দূর করতে রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন আছে কিন্তু মূল দায়িত্ব পরিবার আর সমাজকেই নিতে হয়। প্রতিটি সন্তানের নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষার প্রয়োজন এবং তার দায় বর্তায় প্রতিটি বাবা- মা’য়ের। ধর্মের প্রকৃত রূপ কি! কিসের জন্য ধর্ম তার প্রয়োগ মানবজাতিকে কতটা পরিপূর্ণ করতে পারে! জীবনের দর্শন কি হওয়া উচিৎ এই সব শিক্ষা সন্তান পায় পরিবার ও সমাজ থেকে। মানবজীবনে তার প্রভাব সুদুরপ্রসারি।
সমাজ, ধর্ম ও দর্শন একে অন্যের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। সমাজের প্রগতির সাথে সাথে অন্য দুইটিরও প্রগতি হওয়াই স্বাভাবিক। আবার সমাজের নৈতিক অবনতির সাথে সাথে এগুলির অবনতি হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং যুগে যুগে যে তা বিদ্যমান তার সাক্ষ্য দিয়েছে ইতিহাস। ধর্ম ও শাসনের নামে যে নিদারুণ পীড়ন প্রভুত্ব চলে এসেছে তা স্বার্থ মুক্ত নয়। উত্থান, বৃদ্ধি, ক্ষয় ও ধ্বংস —- প্রকৃতির এই নীতিকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যা কিছু সবই এই নীতির বশে বশীভূত। সমাজ,মানুষ, ধর্ম ও দর্শন কোনোটাই এর অমোঘ প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে না।
আধুনিক জীবনে মহাপুরুষদের প্রজ্ঞা, অনুশাসন, এবং ধ্যান-এর মাধ্যমে মানুষকে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও আত্ম-উপলব্ধির পথ দেখানো সম্ভব , যা আজকের দ্রুতগতির ও মানসিক চাপের জীবনে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রকৃত শিক্ষায় মানসিক চাপ কমানো, নৈতিক জীবনযাপন, এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে সুস্থ ও উন্নত জীবনযাপনে সহায়তা করে, যা আধুনিক জীবনযাত্রার অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে।
তা না হলে বেনোজলে ভেসে যাবে মানবতাবোধ।
_____________________________


