শারদীয়া উৎসব ২০২৪ : এক গুচ্ছ কবিতা

১.
ক্ষতবিক্ষত মা
সিরাজুল ইসলাম ঢালী
মায়ের হাসিকান্নায় বিরাজমান জ্বলন্ত সূর্য
বিস্ফোরণ আর বিস্ফোরণ !
সত্যি বলতে রক্তের আদান প্রদানে মা,
মায়ের পদ্মা গঙ্গা প্রবাহ মা,
আত্মজ সৃষ্টির কেন্দ্রীয় রহস্য মা,
শোকতাপ বিষবৃক্ষ নীলকন্ঠ মা ।

যুবতী নারী প্রিয়তমা বধূ
কিংবা প্রিয়তমা একদিন মা,
আলিঙ্গন সম্ভোগ ক্রিয়া বিক্রিয়া
কিংবা রাসায়নিক পরিবর্তন মা,
লয় প্রলয় সুখ দু:খ প্রেম বিরহ
সব ছারখার ধ্রুব চিহ্ন মা,
দুগ্ধ রস রক্ত আদি অনন্ত
যুদ্ধ বিগ্রহ স্বর্গ মর্ত্য পাতাল মা ।
যত সহ্য যত কোমল যত নিরীহ
ততটাই চণ্ডাল কপাল কুণ্ডলা মা,
এক কোষ থেকে কোটি কোটি
ভিক্ষুক থেকে কোটিপতি মা ।
২.
নেই মানবিকতা
কৃষ্ণা গুহ
দিনে দিনে কেমন গতি হারাচ্ছে আনন্দময়দা– সবাইতো আকাশ ছুঁতে চায়, মাটি ছুঁতে চায় কজনা !!
আগুনের মাঝে হাটছে সবাই
ঝলসে উঠেছে দিক-বিদিক ,
শান্তির মলম লাগাবে কে?
সিঁটিয়ে আছে মানব শরীর !!
শুধুই ব্যস্ততা আর চাওয়া , ট্রাফিকের ঘনঘটা ,সিগনালে কোলাহল —
বাকি সবেতেই নিস্তব্ধতা।
সম্প্রীতির মেলবন্ধন নেই আছে শুধু সম্প্রদায়ের ভেদাভেদ!! মনুষ্যত্ব যাচ্ছে হারিয়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা আজ বৃদ্ধাশ্রমে !!
অস্তিত্ব ভুলেছি আমরা অলীক সুখের কল্পনায় কাটাই সারাবেলা।
৩.
স্তম্ভ
শংকর কুমার ঘোষ
ইচ্ছে করে বয়সের স্তম্ভের উপর
চওড়া সেতু বেঁধে
সেই পথ ধরে অনায়াসে হেঁটে যেতে।
দূর থেকে দূরে আরো বহুদূরে
হাঁটতে হাঁটতে সীমার বাঁধন ছিঁড়ে,
অসীমের রাজ্যে প্রবেশ করতে চাই।
বয়সের সংখ্যাগুলো জড় পদার্থের মত
কেবল স্তম্ভ হয়ে
ক্রমাগত অতীত হোক।
প্রাকৃতিক নিয়মে জন্ম হোক
নতুন নতুন স্তম্ভের।
আর সেতু হোক দীর্ঘ মেয়াদের।
পিছনে না তাকিয়ে
আমি এগিয়ে যেতে চাই
আগামীর দিকে।
৪.
খেয়াল খুশি
অদ্রিজা সাহা
(পঞ্চম শ্রেণী, কলকাতা )
আঁকার ব্যাপারে সত্যিই আমার
এমন ভালো হাত!
যা দেখার পরে তোমরা
হবেই কুপোকাত।
কালো রঙে আকাশ আঁকি
নীল রং দিয়ে মাটি।
বেগুনি রঙে সূর্য এঁকে
করি পরিপাটি।
হাতের কাছে যে রং পাই
সেটা নিয়েই বসি,
একটা কিছু আঁকার পরে
তার গায়েতে ঘষি।
তাইতো আমার আঁকা দেখে
দিও না আমায় দোষ।
যদি কমলা রঙের হাতি আঁকি
আর সবুজে খরগোশ।
হলুদ রঙের বিড়াল হল
টিয়া হল সাদা,
গোলাপি রঙের ময়ূর হাঁটে,
লাল রঙের গাধা।
ইচ্ছেমতো রং লাগাই
যেমন খেয়াল খুশি।
আঁকা দেখে লুটিয়ে পড়ে
একা একাই হাসি!!
৫.
বইবে না আর রক্তনদী
সামসুল হুদা আনার
চারিদিকে কেন গন্ডগোল?
প্রেম প্রীতি হারা মন্দবোল?
সত্য নিয়েছে অন্ধকোল?
কে বলবে আজ দ্বন্দ্ব ভোল?
এত কেন বল রক্তখেলা?
হয়েছে সবাই তখত ঠেলা —
কম-বেশি সবে ভক্ত চেলা?
কে নড়াবে এই শক্ত ঢেলা?
এত কেন ঘোরে যুদ্ধ বিমান?
মুখে হাসি নেই, ক্রুদ্ধাভিমান?
কোথায় আছো আজ মুগ্ধ শ্রীমান,
এসো এসো সে-ই শুদ্ধ ধীমান।
সব ছুড়ে ফেলে আমরা যদি,
দুষ্টকে বধি, জাগাই বোধি,
লোহিতকণার প্লাবন রোধি,
বইবে না আর রক্তনদী।
৬.
রাজপথের রাজনীতি
নাসিরুদ্দিন আহমেদ
রাজপথের রাজনীতি আজ কদাকীর্ণ,
দুখিনীর পেটে পাথর বাঁধা ঘর জরাজীর্ণ।
সন্তানের রক্তে ভেজা মায়ের আঁচল,
প্রতিবাদ চলছে চলবেই হবে রাত দখল।
রাম রহিম ঠাঁই পায় ওদের ছায়াতলে,
কোটি জনতার প্রতিবাদ শেষে যায় রসাতলে।
উস্কানিমূলক কাজে পটু ওরা
ঘোরে চেনা চেহারায়,
আমাদের ভোটে জিতে ওরাই
রাখে স্বাধীনতা হীনতায়।
পাতি নেতারা মিটিং মিছিলে দেয়
যত ইনকিলাবের আওয়াজ,
সমবেদনার নামে ঘুষের লোভ দেখাতে
ওদের নেইকো লোকলাজ।
ওরা শিকারি কুকুর চেনে না
মা-বোন-নারী,
পূজার বেদীতে অঞ্জলি দিয়ে
সম্ভ্রম লোটে তারই।
ওরা লম্পট লাশ ছিঁড়ে খেয়ে
দলবেঁধে মদ খায়,
ওরা অন্যায় করে ঠাঁই পায়
সস্তা রাজনীতির আখড়ায়।
৭.
জীবনের এপিগ্রাফ
আলমগীর রাহমান
ভবের হাটের মুসাফির,
ভাবের ঘরে বসবাস।
ভাব-ভাবনার সন্ধিক্ষণে,
জীবন প্রশ্নে মন উদাস।
মিলন-বিচ্ছেদ,আশা-নিরাশা,
জীবনের ছায়া সাথী।
পালা বদলের রঙ্গমঞ্চ,
রং-তুলি-র কারসাজি।
মুক্তার খোঁজে দিন-রাত সমান,
সুখ-সম্পদে,সন্ধানী মন হয়রান।
বাউল মনের ইচ্ছে-ভেলায়,
মন,ভোলা মন,জীবন বোহেমিয়ান।
৮.
কেঁদে ফেরে কামদুনি
সুশান্ত পাড়ুই
আমার দুর্গা পায় না বিচার
ঘরের মেয়ে’র রাজ্যে
ধর্ষণ খুন ছোট্ট ঘটনা
নিত্য-নিধন কার্যে।
খালাস হয়েছে যাবজ্জীবন
আমার বোনের খুনি
“বিচারের বাণী নিভৃতেই কাঁদে”
কেঁদে ফেরে কামদুনি।
রাষ্ট্র তোমার শোষণ যন্ত্র
করে দেব চুরমার
ভোরের মিছিলে আমরা ঘোচাব
এ ঘোর অন্ধকার।
৯.
শরতের আগমন
আঞ্জু মনোয়ারা আনসারী
শিশির স্নাত শিউলির ডাকে আজও শরৎ আসে
আকাশ-নীলের গায়ে তাই সোনা গলা রোদ হাসে!
বরষণ বাদল গেছে চলে দূর…বহুদূর…
বাতাসের কানে কানে বাজে আগমনী সুর!
খুশির দোদ্যুল দোলায় কাশফুল নদীর চরে
খুশির জোয়ারে বুনোহাঁস জলকেলি করে!
হৃদয় বীণার তারে অনাবিল আনন্দ আমেজ
ছোট বড়ো সকলেরই নব নব সাজ!
রাম-রহিম মিলে হাতে হাত রেখে মিনতি জানায়
ভেদাভেদ ভুলে মোরা ব্যাথির ব্যাথায় যেন দুহাত বাড়ায়!
আহা এমন মহোৎসবে আকাশ মাটির দাওয়ায়
চুপিচুপি মিলেমিশে মহা মিলনের গান গায়।
১০.
কর্ষণ
সন্দীপ রায় নীল
দৃষ্টির আলপথে
জেগে উঠছে শোক
চারিদিকে মৃতদের ভিড়
বুক থেকে নাভি, নগ্ন উরু
ইন্দ্রজাল।
জীবাশ্ম হৃদয় খুঁড়ে ধাপচাষ
দেয় কৃষাণী
রতিবাসর,
সামনের বর্ষায় ফসল
ঘরে আনতেই হবে।
১১.
অপেক্ষমান খিলান
আজমত হক
সবুজ গালচে পাতা মরচে হৃদয়ে
তোমার আলতো ছোঁয়া –
গ্রিসের রাজ খিলানের মতো
আজও অপেক্ষারত অবিচল!
কালের অমোঘ সত্যকে বয়ে নিয়ে চলে
অ্যাটলাসের অন্তিম সজ্জা !
হ্যাপি প্রিন্সের পদতলে
এখনো শয়ালো মাথা কুটে মরে!
ভিঞ্চির তুলিতে আজও লেগে আছে
মোনালিসার গন্ধ !
ম্যাজিলানের নৌকা আজও ছুটে চলে
নতুন আমেরিকার সন্ধানে !
ক্রুশ বিদ্ধ হয়েও যীশু
প্রেমের শোণিত স্রোতে মিশতে চেয়েছে !
হারিয়ে যেতে চাই সবাই !
হারিয়ে খুঁজে পেতে বড়ো সুখ !
জোনাকিরা আজও
প্রত্যাশার আলো জ্বেলে ডাকে!
গভীর নিশীথে ঝিঁঝিঁর ডাকের মতো
তুমিও সত্য !
সৃষ্টির সকালের মতো তুমি
নরম রোদে আদ্রিত !
আর আমি –
সভ্যতার নিদর্শন গৌরবে
কালের কণ্ঠ ধ্বনি হয়ে স্থানু প্রায় ফসিল!
১২.
” শুভ বিজয়া ” – র পাঁচালী
সামসুজ জামান
দুর্গতিনাশিনী তিনি করুণায় ভরা।
জগতের অশুভ, ক্লেশ, অশান্তি হরা।।
আমাদের কন্যারূপে আশীর্বাদ হয়ে।
আসেন যেন পিতৃগৃহে আমাদেরই মেয়ে।।
ষষ্ঠী-সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী কোথা দিয়ে পার।
ফুরোলো মধুর ক্ষণ তাই মনোভার।।
অবশেষে এলো সেই বিজয়া দশমী।
কোলাকুলি মিষ্টিমুখ বয়োজ্যেষ্ঠদের নমি।।
এয়োতীরা মিলেমিশে করে সিঁদুর দান।
চোখ ভ’রে ওঠে জলে, কষ্টে ভরে প্রাণ।।
আবার আসুক ফিরে এই পুণ্য তিথি।
করজোড়ে গেয়ে যাই মঙ্গল গীতি।।
জগতে উঠুক ভ’রে শান্তি দয়া মায়া।
মন থেকে জানালাম ঁশুভ বিজয়া।।
সামসুজ জামান লিখি এই পাঁচালী।
ভরে যাক সকলের পূর্ণতার ডালি।
১৩.
অসমাপিকা
বন্দনা মালিক
জীবন আমার জীবন থেকে
জীবনী কেড়ে নিয়েছে,
সুবিন্যস্ত সরণীর বুকে হাঁটতে হাঁটতে শুনেছি
কর্তব্যের ক্ষমাহীন প্রতিধ্বনি।
কাগজের বুক চিরে যেদিন কলমের চাষ করেছিলাম
সেদিন ভুবেনশ্বরের লোমশ বুকে কান পেতে শুনেছিলাম
হৃদপিন্ডের জাগরণের পদধ্বনি—
বছরের পর বছর কেটে গেছে
নিরন্তর আঁকছি কালির লেখচিত্র ,
তবুও কবিতার বালুচরে জন্ম দিতে পারিনি
একটি সজীব সবুজ ইউক্লিপটাস।
একদিন শিশিরের কোলাহল শুনে
জেগে উঠে দেখি,
বাংলা বর্ণমালাগুলো মিছিল করছে
আমার পান্ডুলিপির বুভুক্ষু উঠোনে।
১৪.
হোক আনন্দলোক
সেখ আব্দুল মান্নান
ঝড় বৃষ্টির ওপার থেকে
ডাকলে তোমরা আমায়,
মর্তের অপশক্তি কে বলো
আমার শক্তি থামায়।
পুজোর নামে তোমরা শুধু
আনন্দ ফুর্তি করো,
বিজয়া দশমীর পরে তোমরা
পুরোনো রূপ ধরো।
সারা বছর অশুভ কাজে
মগ্ন হও তোমরা,
সমাজ থেকে যায় উড়ে
সুখ শান্তির পায়রা।
বিবেক নামে চিন্তা চেতনা
তোমাদের সবার আছে,
স্বার্থের মোহে তোমরা তাকে
রাখ ন্যায়ের পিছে।
মা বোনেদের সম্মান নিয়ে
করো তোমরা খেলা,
পুজোর নামে ঢাক পিটিয়ে
তাদের কর অবহেলা।
মায়ের মতো তবুও বলি
তোমাদের বোধদয় হোক,
তোমারাই আবার সমাজটাকে
করে তোলো আনন্দলোক।

