বিনোদন, সংস্কৃতি ও সাহিত্য 

মরিচঝাঁপি নাট্য উৎসব

শেয়ার করুন

গালিব ইসলাম : গত ১৮ ই এপ্রিল ২০২৬, শনিবার অনুষ্ঠিত হলো পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির তৃপ্তি মিত্র নাট্যশালায় মরিচঝাঁপি নাট্য উৎসব। সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের গোলপাতা অফ মরিচঝাঁপি নাট্য দল তাদের নিজস্ব এই আয়োজন। সূচনা হয় বোনোবিবি জহুরানামা অবলম্বনে ‘বনবিবি পালার’ বন্দনা গান দিয়ে। তারপর চলতে থাকে আলোচনা পর্ব “জঙ্গল জীবিকা ও বনবিবি

পালা ” চর্চার মাহাত্ম্য। আলোচক প্রফেসর ড: বিশ্বজিৎ হালদার ( যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় )। পালার গান করেন বিখ্যাত বনবিবি পালা শিল্পী গৌর সরকার মহাশয়। তার দীর্ঘ ৪৭-৪৮ বছর ধরে তিনি এখনও জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে যান এবং বনবিবি পালা গান করেন। এই দুটো কর্ম তার পিতার থেকে পাওয়া। তার ছোটোমোল্লাখালীতে যে পাড়ায় নিবাস তার নাম কাঁকড়া পাড়া। সবাই প্রায় জঙ্গল জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন আমাদের এই পালা চর্চা মূলত: হিংস্র জীব জন্তুর ভঙ্করাতার হাত থেকে বাঁচতে মা বনবিবি আরাধনায় আচার ও মানতের উদ্দেশ্যে এই চর্চা সুন্দরবনে চলে আসছে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে একত্রে জঙ্গলে যাওয়া ও বনবিবি পালা গান করা হয়। এছাড়া গান করেন ভগবতী বিশ্বাস, যিনি দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি স্বামীর সঙ্গে জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে যান এবং সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলেই গেয়ে ওঠেন ‘দেখো ধনা দুখে যেন কাঁদে না ‘। দুখের গান গায় খুদে শিল্পী পাখী বিশ্বাস। আলোচনায় উঠে আসে সুন্দরবন জঙ্গল জীবনের সঙ্গে পালা গান চর্চার মাধ্যমে শিল্প চর্চা করা কিন্তু বর্তমান যুগে তা কেহ আর চর্চা করতে চাইছেন না। তাদের অঞ্চলে বনবিবি পালা নাট্যদল নেই বললেই চলে। তাহলে কি সুন্দরবনের মানুষ তাদের নিজস্ব শিল্প চর্চা করতে ভূলে থাকতে চাইছেন !

Advertisement

দ্বিতীয় পর্বে মরিচঝাঁপির গোলপাতা থিয়েটার দলের দুটি নাটক। ” উগ্রবীর্য ” নাটকের পটভূমি জঙ্গলে কাঁকড়া ধরতে যাওয়া কেন্দ্রিক। বনবিবির থানে বাড়ির মহিলারা পাঁচালি পড়ে, মানত করে তাদের পরিবারের সকলে কুশলে যেন ফিরে আসে। দু’জন নৌকায় পাড়ি দেয়, গহিন জঙ্গলে খাঁড়ি নদী দিয়ে মাছের চারা লাগিয়ে দোন ফেলে। কিন্তু তাতে খুব বেশি পরিমাণে কাঁকড়া পড়ে। তখন তারা সিধান্ত নেয় ভাটায় জল নেমে গেলে ঝোরা দিয়ে আটোল পেতে কাঁকড়া ধরবে। নাটকটি দেখানো হয় বাউলে তার মন্ত্র বলে বাঘ-কুমিরের মুখ বন্ধ করে দিচ্ছে। খাঁড়ির ঝোরা দিয়ে আটোল পাতায় আসে বিপদ, ঘণ জঙ্গলের আড়াল দিয়ে বাঘ লাফিয়ে পড়ে মৎস্যজীবির উপর। অবশেষে বাঘ মানুষের লড়াইয়ে তার প্রাণ ফিরিয়ে আনে। নাটকটি সুন্দরবনের আঞ্চলিক ভাষায় ( সুন্দরী ) রচনা ও নির্মাণ করেন সীতাংশু মন্ডল। মঞ্চে – কালিপ্রসাদ গায়েন, বিশ্বনাথ মন্ডল, সুরজিৎ মন্ডল, স্নেহা রায় ও সৌমিলি সাহা। দোতারায় পিন্টু মন্ডল ও গীত কন্ঠে অনন্ত বৈদ্য। মঞ্চ সজ্জা বাঘের থাবা, আটোল, জাল এসব দিয়ে জঙ্গলের বিষয় তুলে ধরেন। দ্বিতীয় নাটক আইরিশ নাট্যকার জে. এম. সাইনের রাইডার টু সি অবলম্বনে শ্যামল ভট্টাচার্যের লেখা “জেলে পাড়ার গান “। নির্দেশনা ও অভিনয়ে স্নেহাশিস পুরকাইত অন্যান্য চরিত্রে ভাস্কর সরদার কন্ঠে ভাটিয়ালি গান ও যাত্রা পালার বিবেক গান ভালোই ফুটিয়ে তোলেন। অন্যান্য চরিত্রে কালিপ্রসাদ গায়েন, সীতাংশু মন্ডল, অমিত ঘরামী। নাটক মূল বিষয় ছিল জেলে পাড়ার জেলেদের জীবনসংগ্রাম। তাদের নেশায় যাত্রা পালা করা। কিন্তু এই সময় দাঁড়িয়ে তা আর করতে পারছে না। নাটকের মধ্যেই চাঁদ সদাগরের, সিরাজদ্দৌলা যাত্রার অংশ অভিনীত হয়। গভীর সমুদ্রে দুই সন্তান আগেই হারিয়েছেন শেষ সম্বল টুকুও তুফাণ ঝড়ের তান্ডবে হারিয়েছেন। তাই সবাই মিলে জবান চাইছেন আর কতদিন ধণতান্ত্রিক মানুষরা শুধু মুনাফা লোভের আশায় জেলেদের খাটিয়ে নেবেন? কোন দিন কি তারা ভালো ভালো নৌকা দেবেন না? সন্তানের মৃত্যুতে পিতা মাতা পিতা মর্মাহত। তাই তারা নিজেরা একটা শক্ত মজবুত নৌকা বানাবেন শপথ নিচ্ছেন।

শেষে গোলপাতা থিয়েটার দলের পক্ষে জানান তারা এই প্রথম কোন হলে নাটক করলেন। আগামীতে তারা বনবিবি পালা বড় আকারে কোলকাতায় কোন হলের মঞ্চে করতে চান।

 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ