কৃষ্ণনগরের নীল দুর্গা বাংলার এক ব্যতিক্রমী দুর্গা পুজো
দীপাঞ্জন দে: নীল রংয়ের দুর্গা প্রতিমা বিষয়টি শুনে অনেকে অবাক হবেন। দুর্গার রং আবার নীল হয় নাকি? তিনি তো অতসী বর্ণা। কিন্তু সমগ্র বাংলার মধ্যে একমাত্র কৃষ্ণনগরে নীল দুর্গা বাড়িতে এই ‘নীল দুর্গা’ পূজিত হন। কৃষ্ণনগরের দুর্গা পুজোর অন্যতম আকর্ষণ এই নীল দুর্গা। বহু মানুষ এই নীল দুর্গা দেখতে প্রতিবছর দুর্গাপুজোর সময় কৃষ্ণনগরে আসেন। কারণ শুধুমাত্র দুর্গাপুজোর সময়ই এই নীল দুর্গার দেখা মেলে। ঠিকানা কৃষ্ণনগরের নাজিরা পাড়ার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের নীল দুর্গা বাড়ি।
বাংলার একমাত্র নীল দুর্গা প্রতিমা দেখতে কার না মন চায় বলুন। পুজোর কটা দিন তাই নীল দুর্গা বাড়িতে দর্শনার্থীদের আনাগোনা লেগেই থাকে। ভক্তিভরে মানুষ নীল দুর্গাকে দেখতে আসেন। অনেক পূজার্থী আবার প্রত্যেক বছর এই নীল দুর্গার দর্শন করেন। নীল দুর্গাকে ঘিরে অনেক কাহিনীও রয়েছে। এখানে দেবী প্রথাগত দুর্গা প্রতিমার মতো নয়। তিনি অপরাজিতা ফুলের মতো নীলবর্ণা। এই নীল দুর্গার জন্ম বাংলাদেশের বরিশাল জেলার বামরাইল গ্রামে। দেশভাগের সময় বামরাইলের চট্টোপাধ্যায় পরিবার বাংলাদেশ থেকে কৃষ্ণনগরে চলে আসে। তারপর থেকে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের নীল দুর্গা পুজো কৃষ্ণনগরে হতে থাকে। দুর্গা যেহেতু নীল বর্ণা, সেহেতু কৃষ্ণনগরের নাজিরা পাড়ায় চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বাড়ির নামও হয়ে গিয়েছে নীল দুর্গা বাড়ি।
সাল, তারিখ নিয়ে সংশয় থাকলেও, চট্টোপাধ্যায় পরিবারের দাবি নীল দুর্গার বয়স আনুমানিক ২৯০ বছর। লোকশ্রুতি এই যে— অবিভক্ত বাংলার বরিশাল জেলার বামরাইল গ্রামে চিন্তাহরণ চট্টোপাধ্যায় এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। প্রথমে দুর্গার রং অতসী ছিল। কিন্তু একই রাতে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা নীল দুর্গার জন্ম দেয়। একদা বামরাইলের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের ঠাকুরদালানে দুর্গা প্রতিমা গড়ার কাজ চলছিল। তাদের পরিবারের প্রতিমাশিল্পী ছিলেন যথেষ্ট প্রবীণ। বয়সের ভার এবং পুজোর আগমনে বেশিদিন না থাকায় বৃদ্ধ প্রতিমাশিল্পী সেবার একটানা কয়েক রাত জেগে প্রতিমা গড়ার কাজ করেছিলেন। ফলে তিনি অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এদিকে দেবীর বোধন কাছে চলে আসায় হাতে সময় ছিল কম। এমতাবস্থায় একদিন তিনি রাত জেগে দুর্গা প্রতিমার রং করছিলেন। সেই রাতেই প্রতিমার গায়ের রং শেষ করতে হত, তা না হলে কম সময়ে রং শুকাবে না এবং অন্য রঙে হাতও দেওয়া যাবে না। বিদ্যুতের আলো তখন ছিল না। রাত জেগে কাজ করার সময় হ্যারিকেনের (মতান্তরে লম্ফ) তেল প্রায় ফুরিয়ে এসেছিল। আলো ছিল প্রায় নিভু নিভু। বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী কম আলো এবং ক্লান্ত শরীর হওয়া সত্ত্বেও রাত জেগে প্রতিমার রং করতে থাকেন। এক হাতে তার হ্যারিকেন, অন্য হাতে তুলি। সেই রাতেই তিনি প্রতিমার রং শেষ করেন। কিন্তু ভোর হতেই মাথায় হাত। ভোরের আলো প্রতিমার গায়ে পড়তেই দেখা যায় দুর্গা অপরাজিতা ফুলের ন্যায় নীল বর্ণা। বৃদ্ধ মৃৎশিল্পী ভেবে কুল করতে পারেন না যে— এর সমাধান কীভাবে হবে? নতুন করে রং করার সময়ও যে আর নেই! খবরটি নিমেষে ছড়িয়ে যায় এবং আশপাশ থেকে মানুষজন চট্টোপাধ্যায়দের ঠাকুরদালানে এসে উপস্থিত হন। সবাই চিন্তামগ্ন। এরই মধ্যে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কর্তা চিন্তাহরণ চট্টোপাধ্যায় ঠাকুরদালানে এসে উপস্থিত হন। তিনি সকলকে জানান, সেই রাত্রে দেবী তাঁর স্বপ্নে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং আদেশ দিয়েছেন দেবীকে যাতে নীল বর্ণে পুজো করা হয়। দেবীর সেই স্বপ্নাদেশ মেনে চট্টোপাধ্যায় পরিবার আজও নীল দুর্গাকে সেভাবেই পুজো করে আসছেন, যা বাংলার একমাত্র নীল দুর্গা পুজো।

দেবী দুর্গা কেবল এখানে নীল বর্ণা, তার পরিবারের আর কেউ নীল বর্ণা নন। দেশভাগের সময় বামরাইল গ্রামের চট্টোপাধ্যায় পরিবার কৃষ্ণনগরে চলে এসেছিলেন। তারা কৃষ্ণনগরের নাজিরা পাড়ায় বসবাস শুরু করেন। ১৯৪৭ সাল থেকে (মতান্তরে ১৯৪৮ সাল) তাদের কৃষ্ণনগরের বাড়িতে নীল দুর্গা পুজোর সূচনা হয়। কৃষ্ণনগরে এই নীল দুর্গা পুজো জীবনলাল চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে শুরু হয়। তবে ১৯৯৮ সাল নাগাদ চট্টোপাধ্যায় পরিবারে পুজোর নানা উপাচারকে কেন্দ্র করে শরিকি মতপার্থক্য তৈরি হয়। সেই বছর থেকে দুটি পরিবার আলাদাভাবে নীল দুর্গা পুজো করে থাকেন— একটি আদি নীল দুর্গা বাড়ি এবং অন্যটি নীল দুর্গা বাড়ি। এখনো সেই ধারাই বহমান। তবে উভয় পরিবারের দুর্গা প্রতিমার বিশেষ পার্থক্য নেই। উভয় পরিবারই একচালা ঠাকুর করেন। আর প্রতিমার পিছনে থাকে চালচিত্র। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পূর্বে নীল দুর্গার চালিতে ব্যবহৃত চালচিত্র শিল্পীরা হাতে আঁকতেন। যার মাধুর্য ছিল অন্যরকম। কিন্তু এখনকার প্রতিমা শিল্পীরা পরিশ্রম কমাতে চালচিত্র প্রিন্ট করে প্রতিমার চালি সাজাচ্ছেন। এর ফলে যেমন শিল্পের মান কমছে, তেমনি চালচিত্র শিল্পের ভয়ঙ্কর ক্ষতি হচ্ছে।
নীল দুর্গা বাড়ির পুজোর একাধিক বিশেষত্ব রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল দুর্গা প্রতিমার বাঁদিকে সরস্বতী ও গণেশের অবস্থান। আর দুর্গার ডান দিকে লক্ষ্মী ও কার্তিকের অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুজোয় মা দুর্গার সাথে তাঁর পরিবারের এই রূপ অবস্থান সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। নীল দুর্গার আরো কিছু আচার অনুষ্ঠানের কথা এ প্রসঙ্গে বলতে হয়। যেমন— উল্টো রথের দিন দেবীর পাটে মাটি দিয়ে হয় পাট-পুজো। ষষ্ঠীতে মন্দির প্রাঙ্গণে বেল গাছকে পুজো করে নীল দুর্গার পুজো শুরু হয়। দেবীর পুজো হয় শাক্ত মতে। সন্ধি পুজোতে ১০৮টি অপরাজিতা ফুল লাগে। পুজোর কটা দিন দেবীকে পরিবারের সদস্যের মতোই আদর যত্ন করে রাখতে হয়। পুজোর তিনদিন (সপ্তম, অষ্টমী, নবমী) দেবীকে মাছের বিভিন্ন পদ তৈরি করে ভোগ নিবেদন করা হয়। অবশ্যই সেই মাছ আঁশযুক্ত হওয়া চাই। মা-কে সপ্তমীতে সাত প্রকার ভাজা, অষ্টমীতে আট প্রকার ভাজা এবং নবমীতে নয় প্রকার ভাজা সহযোগে ভোগ দেওয়া হয়। আর দশমীর দিন অনেকটা পথ যেতে হবে বলে দেবীকে পান্তা ভাত খাইয়ে বিদায় জানানো হয়। সঙ্গে থাকে কচুর শাক, মটর ডালের বড়া, গন্ধরাজের বড়া। নীল দুর্গার নিরঞ্জনে বিশেষ উল্লেখনীয় কোনো রীতি নেই। স্বাভাবিক নিয়ম মেনেই দশমীর দিন কৃষ্ণনগরের জলঙ্গী নদীতে নীল দুর্গার ভাসান হয়। নীল দুর্গা বাড়ির পুজোয় এখন আর কুমারী পুজো হয় না। আগে ঘটা করে মহিষ ও পাঁঠা বলি দেওয়া হত। সেটিও প্রায় বন্ধ বলা চলে। এখন সেভাবে পশু বলি হয় না। আদি নীল দুর্গা বাড়িতে কেবল এক-দুটি পাঁঠা বলি এখনো হয়। পশুবলির পরিবর্তে এখন ‘শত্রু বলি’ দেওয়া হয়। নবমীতে আতপ চালের গুঁড়ো দিয়ে মানুষ তৈরি করা হয়। চালের পিটুলিকে কাল্পনিক শত্রু মনে করে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা শত্রু নিধন করেন। চালের পিটুলিকে লাল শালুতে মুড়ে কচু পাতায় জড়িয়ে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যের নেতৃত্বে ছেলেরা একসাথে খাঁড়া ধরে নয় কোপে বলি দেন। এভাবেই নীল দুর্গা পুজো এক ব্যতিক্রমী দুর্গা পুজো হিসেবে তিন শতবর্ষ অতিক্রমের পথে ধাবমান।
লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।

