শারদীয় উৎসব উপলক্ষে বাংলার জনরব এর বিশেষ সাহিত্যের ডালি /১
দুই বাংলায় শারদীয়া উৎসব খুবই জনপ্রিয়। আর এই উৎসব উপলক্ষে দুই বাংলা জুড়ে প্রকাশিত হয় অসংখ্য সাহিত্য পত্র পত্রিকা। এইসব পত্রিকাতে দুই বাংলার বিশিষ্ট কবি লেখক গল্পকারদের সেরা লেখা প্রকাশিত হয়। @বাংলার জনরব বেশ কয়েক বছর ধরে উৎসব সংখ্যা প্রকাশ করছিল। কিন্তু সম্প্রতি লকডাউনের পর থেকে তা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাই বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের লক্ষ্যে আমরা মহালয়ার দিন থেকে প্রকাশ করছি আমাদের সাহিত্য সংখ্যা অনলাইনে। আশা করি আপনাদের সকলের ভালো লাগবে। সবাইকে আগাম শারদীয়া উৎসবের প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই। সম্পাদক।

————————————————————————————————————————————-
৩৫০ বছর আগে আরামবাগের ভালিয়ার জমিদার বাবুরাম সরকার দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন
ড: ঋতা ভট্টাচার্য :
কবি সুমন বিশ্বাস লিখেছেন:-

“শিউলি ফুলের গন্ধ এলো
হাওয়ার ডানায় চড়ে
শরৎ যে আজ এসে গেছে
বাংলা মায়ের ঘরে।
কাশফুলেরা হাত নেড়ে কয়
এসো আমার ঘরে
পা দু’খানা ধুইয়ে দেবো
নদীর স্বচ্ছ জলে।
থোকা থোকা সাদা মেঘের
ফুটল যেন ফুল
নীল আকাশের বুকে তারা
আনন্দে মশগুল।”
শরৎ এলো শুধু কি ঘরে? শরৎ আসে প্রকৃতিতে। বাংলা ঋতুর হিসাব অনুযায়ী ভাদ্র-আশ্বিন এই দুই মাস শরৎকাল। ঋতুচক্রের বর্ষ পরিক্রমায় শরতের আগমন ঘটে বর্ষার পরেই। বর্ষার বিষন্নতা পরিহার করে শরৎ আসে। নীল আকাশে সাদা তুলোর মতো মেঘ উড়ে বেড়ায়।
নদীর দু’কূল ঘেঁষে কাশ ফুল ফোটে। শিউলি ফুলের গন্ধমাখা স্নিগ্ধ ভোর যেন যান্ত্রিক এই নাগরিক জীবনকে ভুলিয়ে দেয়।
কাশফুলের সৌন্দর্য শারদীয়কে পূর্ণতা প্রদান করে।

শরৎ শুভ্রতার ঋতু। শরৎ মানেই স্নিগ্ধতা। তাই তো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রিয় শরৎকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা-/নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা/এসো গো শারদলক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/এসো নির্মল নীলপথে…’।
তিনি শরৎকে ঘিরে প্রচুর কবিতা ও গান লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও সুবাসিত করে গেছেন-‘আজি কী তোমার মধুর মুরতি/ হেরিনু শারদ প্রভাতে’,
আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরি খেলা-/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই- লুকোচুরি খেলা…’। ইত্যাদি আরো অনেক।
কাজী নজরুল ইসলামকে ও শিউলি ফুল খুব আকৃষ্ট করেছিল। মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে।/এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে…’। অন্যত্র কবির উচ্চারণ-‘শিউলিতলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা।/শেফালি পুলকে ঝ’রে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা…’।
শরৎ সম্পর্কে কবি জীবনানন্দ দাশ বলেন, ‘যৌবন বিকশিত হয় শরতের আকাশে’।
সাধারণত: প্রকৃতির নিয়মে ঝকঝকে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা জানিয়ে দেয় শরৎ এসেছে। আবার কাশফুল, শিউলিফুল না ফুটলে শরৎ হয় না। শরৎ বিনা শারদীয়া দুর্গোৎসব হয় না।
শরত যখন বাঙালির ঘরে প্রবেশ করে তখন তাদের মন আনন্দে নেচে ওঠে কারণ আশ্বিনের মাঝামাঝিতে ঢাকের বাজনা দিয়ে শারদীয়া দু্গোৎসবের সূচনা।
দুর্গাপূজোতে ধর্মীয় আচার আচরণকে অতিক্রম করে সব ধর্মের ধনী-গরীব, নর-নারী, ছোট-বড়, সকল আনন্দে মেতে ওঠে, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে যায় ঠাকুর দেখতে। বস্তুতঃ দুর্গাপুজো হলো মানুষের মিলনের উৎসব।

এই পুজো সমাজের সব স্তরের মানুষের মধ্যে তৈরি করে আন্তরিকতা এবং সুসম্পর্ক। বাঙালিরা ভালো করেই জানে যে ধর্ম যার যার, কিন্তু দুর্গোৎসব সবার। তাই দুর্গাপুজোয় আছে ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক গুরুত্ব । এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৪০ হাজার কোটি টাকার উপরে ব্যবসা। বহু ধর্মের বহু মানুষের বছরের রোজগার দুর্গাপূজোর ওপর নির্ভরশীল। এখানে থাকে না কোন ধর্মের ভেদাভেদ। বাঙালির দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করেই সেরা বাণিজ্য, সেরা সাহিত্য, সেরা গান, সেরা পোশাক, পণ্য, খাদ্যের ভরপুর যে আয়োজন তা কি শুধু ধর্মের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকতে পারে?
এবছর ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দুর্গাপুজোকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আরও সাহায্য করবে বলে আশা ও বিশ্বাস জন্মায়।
সর্বজনীন শারদ উৎসব আজ এতো ই বর্ণময়, যা সত্যি “উৎসব” শব্দের যথার্থতায় পরিপূর্ণ। “উৎসব” শব্দের অর্থ হলো “যাহা সুখ প্রসব করে” অথবা “আনন্দজনক ব্যাপার”। তাই এই উৎসব ধর্মীয় লক্ষ্মণ রেখা পেরিয়ে সম্প্রীতির বার্তা বহন করে বলেই আনন্দজনক ব্যাপারে রূপান্তরিত হয়েছে।
দুর্গোৎসবের মাধ্যমে বহু স্থানে দেখা যায় সম্প্রীতির বন্ধন। জঙ্গলমহলের মা দুর্গার কাছে হিন্দু-মুসলমানের বা উচুঁ জাত নিচু জাতের কোনো ভেদাভেদ নেই। আবার মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে দেখা যায় ধর্মীয় গণ্ডির সীমা ভেদ করে সমস্ত ধর্মের মানুষ একত্রে আনন্দে মেতে ওঠে।
৩৫০ বছর আগে আরামবাগের ভালিয়ার বাবুরাম সরকার তাঁর জমিদারিতে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন ৷ যে পুজো শুরু হয় ভোরের প্রথম আজানের পর ৷ জানা যায়, সেই জমিদারির অধিকাংশ প্রজাই ছিলেন মুসলমান ৷ প্রগতিশীল ভাবধারার বাবুরাম সরকার তাই আজান শেষে দুর্গাপুজো শুরুর নিয়ম চালু করেছিলেন ৷ আর দুর্গামণ্ডপেই নমাজ পড়ার রীতিও চালু করেন ৷ যা আজও বর্তমান ৷ এই দুর্গাপুজো এখন ভালিয়ার সরকার বাড়ির দুর্গাপুজো নামে খ্যাত।

বস্তুত: দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদাহরণ এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় বহু পাওয়া যায়, কারণ হলো দুর্গাপুজো বিশ্বজনীন। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাংলা সম্প্রীতির বার্তা দিচ্ছে বিশ্বকে। বিশ্বজনীন এই উৎসবে নেই কোন ধর্মীয় গণ্ডি। আজ এই শরৎ কালের দুর্গোৎসব ধর্মীয় বিভেদ ভুলিয়ে বাঙালির হৃদয়কে দেয় অনাবিল আনন্দ।
দুর্গোৎসব এমনই বহুমাত্রিক, এমনই সর্বজনীন, এমনই সুখপ্রসবকারী যে সবাই আসে শুধু মিলনের টানে, মিলবে বলেই – কারণ আমরা যে বাঙালি।
আর বাঙালি বলেই তো শরতের আবির্ভাবে শারদীয়া দুর্গাপুজোর জন্য মন নেচে ওঠে, প্রাণ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। এই আনন্দময় উদ্দীপনায় হিন্দুর পাশে মুসলমানও মিলেমিশে হয় বৃহৎ বাঙালি।
অধ্যাপিকা মনীষা চক্রবর্তীর দুটি কবিতা :
অনির্বান

ওই শুনি তার আহ্বান
এক ব্যাকুল আকুলতার পরিনির্বাণ
দিলো ডাক দিলো দোল
রৌদ্রোজ্জ্বল নীল আকাশের কোল
ছুটে এসে করলো আলিঙ্গন
নির্মল বাতাসের বলিষ্ঠ বাহুত্ৰাণ
সৃষ্টি করলো নতুন স্পন্দন
সত্যান্বেষী পথিক বুঝলো অবশেষে
এসেছে সে সঠিক দ্বারে
অনেক পথ অতিক্রম করে
আর নেই কপটতার স্পর্শ
পেয়েছে স্থান তার আদর্শ
বিচ্ছিন্ন হয়েছে তার সংস্পর্শ
মুক্তির স্বাদে জেগেছে প্রাণ
গাইছে সুরে নতুন গান
অঘ্রান্বেষী পথিক হয়েছে অনির্বান
অব্যক্ত

জমে থাকা কথা
হয়েছে সে অবলা
বেঁধেছে নিবিড় আস্তানা
মনের গভীর আঙিনায়
জ্বালেনি দ্বীপ ভালোবাসার
প্রতিদিনের প্রতিনিয়ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায়
নীড়টি হয়েছে অন্ধকার
নেই কোনো জানালা
চারিদিক নিস্তব্ধ নির্বাক
নিঃস্বাশের ক্রমাগত স্বর
করেছে বড়োই অবাক
কেন সে নিস্প্রান ?
নিথর ও ম্লান
সময়ের কি পরিহাস
সহজাত মনের বহিঃপ্রকাশ
কি পেলো অবকাশ ?
লেখিকা : স্কুল অফ বায়োসায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং
যাদবপুর ইউনিভার্সিটি অধ্যপিকা।
বন্ধু

মঞ্জিলা শরীফ (বাংলাদেশ)
বন্ধু মানে বিশাল আকাশ
বন্ধু মানে নীল
বন্ধু মানে সকাল সাঁঝে
আনন্দ ঝিলমিল।
বন্ধু মানে আকাশ জোড়া
সাদা মেঘের ঢেউ,
বন্ধু মানে ঘোর আঁধারেও
আলোক শিখা কেউ।
বন্ধু মানে চৈত্র খড়ায়
দমকা হিমেল হাওয়া,
বন্ধু মানে মাঠ চৌচির
নতুন জলের ছোঁয়া।
বন্ধু মানে বৈশেখ দুপুর
লুকিয়ে চুড়ইভাতি,
বন্ধু মানে মধু মাসে
রঙিন মুখের হাসি।
বন্ধু মানে ঝুম বর্ষায়
এক ছাতায় দু’জন ,
বন্ধু মানে নিজে ভিজে
শুকায় অন্য জন।
বন্ধু মানে শরৎ আকাশ
মেঘ সরিয়ে চাঁদ,
বন্ধু মানে দু’কুল দোলা
শুভ্র নরম কাশ।
লেখিকা : বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ও অধ্যাপিকা
আমার দূর্গা
সুশান্ত পাড়ুই

আমার দুর্গা কাঁদে চিরকাল
অবহেলা আর অভাবে নাকাল
অতি অনাদরে মাতৃজঠরে অকালেতে ঝরে পড়ে,,,,,
আমার দুর্গা প্রতিদিন ভোরে
ঝাল মুড়ি বেচে রাস্তার মোড়ে
তবুও কপাল অনন্তকাল দুঃখের বারি ঝরে।
আমার দুর্গা নিষ্ঠুর পরিহাসে
জল ছবি আঁকে লোভের বালিশে
তবুও অযথা ঠুকে চলে মাথা সংসার কারাগারে,,,,,
আমার দুর্গা পিঠে বেঁধে ছেলে
লড়াই করছে দেখো চটকলে
ভোর হতে রাত ঝরে আঁখিপাত তবু মরে অনাহারে।
আমার দুর্গা জমাট আঁধারে
শকুনের নখে উপসংহারে
তবু চিরকাল হায়না-শৃগাল-সিংহের সাথে লড়ে,,,,
আমার দুর্গা জীবনের হাটে
আব্রু হারায় লোটে বড়লাটে
প্রতিবাদহীন ক্লান্তিবিহীন দুঃশাসনের ঘরে।
আমার দূর্গা মথলে সাগর
অমৃত আনে রত্ন আকর
জ্বালিয়ে বাতি জোটে অখ্যাতি নিজে থাকে আঁধারেতে,,,
আমার দুর্গা মানুষের তরে
সব সুখ দিয়ে মানুষের ঘরে
সংসার টানে তবু প্রাণপণে অসহায় সংকেতে।
আমার দুর্গা ছেড়ে হুংকার
করে দেবে আজ সব চুরমার
মাভৈঃ মাভৈঃ রব তোলে ওই শোনরে দূর্যোধন,,,,,
আমার দুর্গা মাতঙ্গিনী
আপদে-বিপদে রণরঙ্গিনী
ভাঙবে পাহাড় সইবে না আর নারীর নির্যাতন।
—————————-//————————–

