কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির ১১৮তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্যাপন
নিজস্ব প্রতিবেদন : কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি (Calcutta Mathematical Society), এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন গণিত গবেষণা ও প্রচারকেন্দ্র, এ বছর তার ১১৮তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্যাপন করল গত শনিবার ৬ সেপ্টেম্বর এক গৌরবময় আবহে। ১৯০৮ সালে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, মহামান্য সরোজিনীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ মনীশিদের উদ্যোগে যে প্রতিষ্ঠানটি সূচনা করেছিল, আজ তা শুধু বাংলার গর্ব নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের গৌরব। গণিতপ্রেমীদের কাছে এই দিনটি তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই বছরের অনুষ্ঠানের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের ডেপুটি সেক্রেটারি ড. পার্থ কর্মকার এবং কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির কোষাধ্যক্ষ ড. বাবলু বিশ্বাস। তাঁদের সুনিপুণ পরিকল্পনা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে সমগ্র অনুষ্ঠানটি এক অনন্য মাত্রা লাভ করে।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা মহামান্য স্যার অশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে মাল্যদান দ্বারা। উপস্থিত ছিলেন সোসাইটির বর্তমান সহ-সভাপতিগণ অধ্যাপিকা উমা বসু, অধ্যাপক রাজকুমার রায়চৌধুরী, অধ্যাপিকা পৃথা দাস, সম্পাদক অধ্যাপক অরিন্দম ভট্টাচার্য, সহ-সম্পাদক ডাঃ পার্থ কর্মকার, পত্রিকা সম্পাদক ডাঃ কৌশিক ঘোষ ও অন্যান্য সম্মানিত সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকাগণ ও ছাত্রছাত্রীরা । এই শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদানের মধ্য দিয়েই নব প্রজন্মকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে—এই প্রতিষ্ঠান এক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

এরপর সোসাইটির সম্পাদক অধ্যাপক অরিন্দম ভট্টাচার্য স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন। তিনি সোসাইটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, গবেষণা কার্যক্রম, পত্রিকা প্রকাশ, এবং ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও কর্মশালার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় সোসাইটির নিরলস প্রচেষ্টা—গণিতকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণিতচর্চার অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলা।
যুগ্ম আহ্বায়ক ও সহকারী সম্পাদক ড. পার্থ কর্মকার এই দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরেন। তিনি ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে বলেন যে গণিত শুধু পরীক্ষার বিষয় নয়, বরং চিন্তার দিগন্ত উন্মোচনের এক অসীম শক্তি। কীভাবে গণিতের প্রতি কৌতূহল সৃষ্টি করা যায়, কীভাবে গণিতের আনন্দ আবিষ্কার করা যায়—এই প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য সকলকে অনুপ্রাণিত করে।
প্রথা অনুযায়ী এই বিশেষ দিনটিতে প্রতি বছরের মতো এই বছরেও
বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস নিয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয় যা এই বছর এন.আর. সেন স্মারক বক্তৃতা হিসাবে পালিত হয়। বক্তা ছিলেন অধ্যাপক সুবিনয় চক্রবর্তী (অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়)। এই আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপিকা উমা বসু (অবসরপ্রাপ্ত, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)। অধ্যাপিকা বসু বক্তার পরিচয় করিয়ে দেন এবং এন.আর. সেন স্মারক বক্তৃতার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, “এই বক্তৃতা শুধু ইতিহাসের কথা নয়, নতুন প্রজন্মকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উদ্বুদ্ধ করার অন্যতম উপায়।” এরপর অধ্যাপক সুবিনয় চক্রবর্তী অত্যন্ত সহজ ও প্রাণবন্ত ভাষায় আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Theory of Relativity) নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি এর উদ্ভব, ক্রমোন্নতি, বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য এবং মানবসভ্যতার উপর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে তিনি জটিল গণিতীয় দিকগুলি বাদ দিয়ে বাস্তব উদাহরণ ও গল্পের মাধ্যমে স্কুল শিক্ষার্থীদের কাছে বিষয়টি আকর্ষণীয় করে তুলেছিলেন।
শ্রোতৃমণ্ডলীর মধ্যে ছিলেন কলকাতা ও আশেপাশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষিকাগণ ও ছাত্রছাত্রীরা। এমনকি দূরবর্তী বর্ধমান জেলার গুসকরা ও অন্যান্য প্রান্তিক অঞ্চল থেকেও কয়েকজন শিক্ষার্থী এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে গণিতচর্চার আলো শুধু শহরেই নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে।
এই বিশেষ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল উন্নত গাণিতিক দক্ষতার পরীক্ষা (Advanced Mathematical Ability Test)। প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হয় Advanced Mathematical Ability Test—যা এই বছর ছিল মূলত একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য।
প্রখ্যাত প্রফেসর রাজকুমার রায়চৌধুরী (প্রাক্তন সভাপতি, কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির) ও প্রফেসর দিলীপকুমার গাঙ্গুলি (সহ-সভাপতি, কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির) মহাশয় এর পরামর্শ অনুযায়ী এবং ডাঃ পার্থ কর্মকার ও ডাঃ কৌশিক ঘোষের সহযোগিতায়, কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি এর কোষাধ্যক্ষ ড. বাবলু বিশ্বাস পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন পরীক্ষাটি অনলাইন পদ্ধতিতে নেওয়া হয়, যাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারে। বহু সংখ্যক শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় উৎসাহের সঙ্গে অংশ নেয়। প্রশ্নপত্র ছিল বিশ্লেষণধর্মী ও কৌতূহল উদ্দীপক, যা শিক্ষার্থীদের গণিতচিন্তাকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। ফলাফল এখনও প্রকাশিত হয়নি, তবে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণই এই উদ্যোগের সাফল্যের প্রমাণ বহন করে।
অনুষ্ঠানের সমাপনী অধিবেশনে ড. বাবলু বিশ্বাস, সোসাইটির পক্ষ থেকে উপস্থিত সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অতিথিবৃন্দকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ভবিষ্যতে গণিতচর্চার আরও বিস্তার ঘটানোর অঙ্গীকার। বিশেষত ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশে তিনি বলেন—“আজকের অংশগ্রহণই আগামী দিনের সাফল্যের ভিত্তি। গণিতকে ভালোবাসুন, প্রশ্ন করতে শিখুন, এবং সমাজকে আলোকিত করুন।”
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে সঞ্চালনা করেন সোসাইটির জার্নালের সম্পাদক ড. কৌশিক ঘোষ। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনা ও সময়নিয়ন্ত্রণ অনুষ্ঠানটিকে আরও সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
কলকাতা ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির ১১৮তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদ্যাপন শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল গণিতপ্রেমী মানুষদের এক মিলনমেলা। এই দিনটি নতুন প্রজন্মকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে গণিত কেবল সংখ্যা নয়, বরং চিন্তার জগৎ প্রসারিত করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের স্বপ্নের এই প্রতিষ্ঠান আজও তার ঐতিহ্য অটুট রেখে অগ্রযাত্রা করছে। গবেষণা, শিক্ষা ও ছাত্রসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সোসাইটির আগামী ভবিষ্যৎ আরও সমৃদ্ধ হোক—এই প্রত্যাশাতেই সমগ্র অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।

