সংসদীয় দলের চেয়ারম্যানের অনুমতি ছাড়া ‘ব্যক্তিগত’ উদ্যোগে কেউ সংসদে অবস্থান ঠিক করতে পারবেন না নির্দেশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের! এই নির্দেশের নেপথ্যে রহস্য?
বিশেষ প্রতিনিধি : ৩৬ ঘন্টার মধ্যে সংসদে নিজেদের অবস্থান বদল ঘটালেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এই বদলের পরে ই সন্দেহ দানা বেধেছে তাহলে কি এবার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংঘাত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে? গতকাল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লির সংসদীয় দলের বৈঠকে বলেছিলেন কারো ব্যক্তিগত ইচ্ছায় সংসদে মুলতবি প্রস্তাবকে আমরা সমর্থন করতে পারি না লক্ষ্য ছিল রাহুল গান্ধী। এই ঘটনার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ঝাড়খন্ডে যান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেমন্ত সরেনের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে কলকাতায় ফেরার পথেই তিনি জানিয়ে দেন দিল্লিতে সংসদীয় দলের বৈঠকে যা সিদ্ধান্ত হবে সেটাই চূড়ান্ত এর বাইরে অন্য কারো কোন ব্যক্তিগত মতামত থাকতে পারে না। একই সঙ্গে মমতা এও জানিয়ে দেন সংসদীয় দলের তিনিই সভানেত্রী।
বৃহস্পতিবার মমতা বলেন, ‘‘পার্লামেন্টে স্ট্যান্ডটা আমাদের কারও ইন্ডিভিজুয়্যাল ম্যাটার নয়।’’ অর্থাৎ, সংসদে অবস্থান কোনও ব্যক্তিবিশেষের বিষয় নয়। তার পরেই মমতা জানিয়ে দেন, ওই বিষয়ে অবস্থান নেবে তৃণমূলের সংসদীয় দল। সেই সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন যে তিনিই, তা-ও ঘোষণা করেন মমতা। পাশাপাশিই তিনি দলের অবস্থান ঠিক করার বিষয়ে লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে পাঁচ সাংসদের নামও ঘোষণা করে দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পদে হেমন্ত সোরেনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাঁচী গিয়েছিলেন মমতা। সন্ধ্যায় কলকাতায় ফিরে ওই ঘোষণা করেছেন। বিষয়ভিত্তিক দলের অবস্থান নির্ধারণ করার বিষয়ে তৃণমূলনেত্রী প্রাথমিক ভাবে যে পাঁচ জনের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁরা হলেন লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুখ্য সচেতক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন, উপ দলনেতা সাগরিকা ঘোষ এবং মুখ্য সচেতক নাদিমুল হক। মমতা বলেন, ‘‘ওঁরা আগে সিদ্ধান্ত নেবেন। তার পর আমায় জানালে আমি পরামর্শ দেব।’’
মমতার ওই ঘোষণার পরে তৃণমূলে আলোড়ন শুরু হয়েছে। কারণ, ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বুধবার দিল্লিতে দলীয় সাংসদদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তৃণমূলের কেউ ‘ব্যক্তিগত’ উদ্যোগে যেন সংসদে কোনও বিষয়ে মুলতুবি প্রস্তাব না আনেন। পাশাপাশিই তিনি ওই বৈঠকে সংসদে তোলার জন্য ‘মানুষের সঙ্গে জড়িত’ বিষয়গুলি চিহ্নিত করেছিলেন। সাংসদদের প্রতি তাঁর নির্দেশ ছিল, আগামী ২০ ডিসেম্বর (শীতকালীন অধিবেশনের শেষ দিন) পর্যন্ত ওই বিষয়গুলিতেই নোটিস দিয়ে সেগুলি আলোচনা করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যে বিষয়গুলি নিয়ে সংসদে সরব হওয়ার কথা অভিষেক বলেছিলেন, সেগুলির মধ্যে সবচেয়ে আগে ছিল পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রের ‘আর্থিক বঞ্চনা’। ছিল মূল্যবৃদ্ধি, কৃষকদের জন্য সারে ভর্তুকি, মণিপুরের হিংসার মতো বিষয়ও।
তার পরেই বৃহস্পতিবার মমতার বক্তব্য দলের একটি অংশের কাছে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ মনে হয়েছে। যেখানে তিনি বলেছেন, কোনও ‘ব্যক্তি’ সংসদে দলের অবস্থান ঠিক করবেন না। এবং পাশাপাশিই আরও এক বার জানিয়ে দিয়েছেন, তিনিই সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন। যে পাঁচ জনের নাম তিনি বলেছেন, তাঁরা ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে মমতা তাঁদের পরামর্শ দেবেন। দলের সর্বোচ্চ নেত্রীর এই বক্তব্য শোনার পরে শাসক শিবিরের একাংশের অভিমত, মমতার বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল অভিষেকের বুধবারের বৈঠক। তিনি স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, সংসদে দলের অবস্থান অভিষেকের (ব্যক্তিবিশেষ) বিষয় নয়। তিনি যাঁদের ঠিক করে দিয়েছেন, সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁরাই।
বস্তুত, ওই ঘটনাকে তাঁরা সোমবারের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চাইছেন। যেমন, ওই বৈঠকের পরে মন্ত্রী তথা দলের নেত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য অভিষেককে ‘দিল্লির মুখপাত্র’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। ওই তালিকায় আরও পাঁচ জনের সঙ্গে অভিষেকের নাম ছিল। বাকিরা ছিলেন ডেরেক, কাকলি ঘোষ দস্তিদার, কীর্তি আজাদ, সুস্মিতা দেব এবং সাগরিকা। বিষয়টি জানাজানি হতেই অভিষেকের ঘনিষ্ঠমহল থেকে জানানো হয়, তাঁকে ‘দিল্লির মুখপাত্র’ করা হয়নি। তাঁকে বলা হয়েছে, জাতীয় রাজনীতি এবং সংসদে যা যা হবে, তা দেখতে। দাবি করা হয়, মমতা বৈঠকে ‘মুখপাত্র’ শব্দটি অভিষেক সম্পর্কে বলেননি। চন্দ্রিমার বক্তব্যে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ তৈরি হয়েছে। সেই বক্তব্য অনুযায়ীই অভিষেক বুধবার ওই বৈঠক করেছিলেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি।
গতকাল বাংলার জনরব নিউজ পোর্টাল রেখেছিল আদানের পাশে রয়েছে তৃণমূল। একই সঙ্গে বলা হয়েছিল যে ওয়াকফ আইন সংশোধনী বিল তৃণমূল কংগ্রেস সংসদের সমর্থন করতে পারে! তারপরেই দেখা গেল এই খবরটি নিয়ে হইচই পড়ে যায় রাতেই দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন যে না তিনি বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা রেখে কাজ করতে চান।

