জেলা 

মাছি-জোনাকি-পাতিকাক হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের পরিবেশ থেকে, দুর্দিনের আশঙ্কা ব্যক্ত করলেন বিশিষ্ট পরিবেশবিদেরা, মহিষাদল কলেজের ওয়েবিনারে

শেয়ার করুন

নায়ীমুল হক: বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান। কবিগুরুর এই মিলনের আহ্বান নানা ভাষা ও নানা মতাবলম্বী মানুষের সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত বৈচিত্র্যের নিরিখে হলেও আজ তা আমাদের সমগ্র জীবজগতের বৈচিত্র্যের জন্যেও কতখানি অপরিহার্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

সম্প্রতি 27 শে জুন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জীববৈচিত্র্য বাঁচানোর আবেদন নিয়ে একদিনের এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার – মহিষাদল রাজ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে l

Advertisement

 

পরিবেশের স্বাস্থ্য ভালো আছে কিনা তা বোঝা যায় পরিবেশের উপাদানরা কেমন আছে তা দেখে৷ তাই উপাদানের বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে আমাদের পরিবেশকে৷ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন গবেষক, পরিবেশকর্মী সকলেই গেল গেল রব তুলেছে ঠিকই কিন্তু সঠিক পথ খোঁজা তখনই সম্ভব যখন ল্যাবরেটরির জ্ঞানটা সর্বসমক্ষে সাধারন মানুষের কাছে অতি সহজ সরলভাবে তুলে ধরা যায়৷ সেই উদ্দেশ্যেই হাত মিলিয়েছিল চার সংস্থা৷ মহিষাদল রাজ কলেজের প্রানিবিদ্যা বিভাগ, দীনদয়াল উপাধ্যায় কৌশল কেন্দ্র; হাওড়া জেলার Live & let live এবং হাওড়া জেলার বিখ্যাত আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন সেচ্ছাসেবী সংস্থা “হাওড়া সুপর্ণা’৷ এই চার সংস্থার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হল এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারের৷ বক্তা হিসেবে ছিলেন কানাডার গবেষক ডঃ সৈকত বাসু, ‘সুপর্ণা’ র সেক্রেটারি ডঃ সুপর্ণা সান্যাল মুখার্জী এবং মহিষাদল রাজ কলেজের প্রানিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডঃ শুভময় দাস সহ আরও তিন ছাত্র গবেষক৷

 

সুদূর কানাডায় বসে দীর্ঘ প্রায় দুই দশক গবেষণা করছেন প্রখ্যাত উদ্ভিদবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানি ড: সৈকত বসু l আজকের তাঁর আলোচনা ছিল পরাগমিলনে মৌমাছির ভূমিকা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ l প্রথমে তিনি বিভিন্ন প্রকার মৌমাছি ও তার সনাক্তকরণ পদ্ধতি নিয়ে সবার সংগে পরিচয় ঘটান l তিনি বলেন মৌমাছির ভূমিকা বিশেষ করে পাহাড়ি মৌমাছি বা ওয়াইল্ড বা বুনো মৌমাছি কি ক’রে আমাদের জীববৈচিত্র রক্ষা করে l বিদেশে কিভাবে এক বৃহৎ অঞ্চলে চাষ আবাদ হয় এবং আমাদের এলাকা থেকে কিভাবে এর পার্থক্য সেটি বলেন l ওদেশে ন্যানোকালচার কিভাবে প্রযুক্ত হয় এবং কিভাবে হেলিকপ্টার থেকে পেস্টিসাইড প্রয়োগ করার ফলে মৌমাছির প্রজতিকুল আজ বিপন্ন , কিভাবে দিনের পর দিন একে একে বিভিন্ন ওয়াইল্ড মৌমাছিরা পরাগমিলন ঘটাতে এসে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছে, কিভাবে দিনের পর দিন মৌমাছিরা পেস্টিসাইড মাখা ফুল কে এড়িয়ে পড়াগমিলন না করে অনাদরের অনাহারে থাকছে, এবং সর্বোপরি কিভাবে ফসল উৎপাদনের হার দিনের পর দিন প্রভাবিত হচ্ছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করলেন আজকের আন্তর্জাতিক মঞ্চে।

ডঃ মূখার্জী বলেন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে থাকা জ্ঞান সাধারণ মানুষের সমক্ষে এলে তা জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করবে৷ প্রফেসর সুপর্ণা সান্যাল মূখার্জী তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমিকা তুলে ধরেন৷ উনি আরও বলেন, পরিবেশের একটি নিজস্ব নিয়ম আছে৷ জঙ্গল, নদী, জীবজগৎ প্রত্যেকেই একটি নিয়মে এবং ছন্দে বাঁধা৷ মানুষ তার বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগিয়ে নিজেদের সুবিধা মতো পরিবেশকে চালনা করতে চাইলে সেই নিয়মের সুতোতে টান পড়ে৷ সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে আদিবাসী সম্প্রদায় প্রকৃতির অনেক কাছাকাছি থাকে বলে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের সাথে তারা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ্য৷ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের সংস্কৃতি, আচার অনুষ্ঠান, রীতিনীতির যথেস্ট গুরুত্ব রয়েছে৷ জীববৈচিত্র্য রক্ষার তাগিদে 1992 সালের 5 ই জুন রিও ডি জেনেরোতে যে আর্থ সামিট হয়েছিল তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হলে গ্রাম্য লোকজ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে৷ সম্প্রতি জুয়ালভাঙা গ্রামে ফরেস্ট ফ্লোর ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ডঃ দাস বলেন, এই অনুষ্ঠানের মুখ্য বক্তা মহিষাদল রাজ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান শুভময় দাস বলেন এই পৃথিবীকে বাঁচাতে গেলে চারদিক সবুজ-মলাটে বাঁধিয়ে রাখতে হবে ঠিকই কিন্তু তার আগে প্রয়োজন এই পৃথিবীকে নীল করা l গাছ লাগানোর আগে আরো বেশি মন দিতে হবে জল সংরক্ষণেl এই পৃথিবীতে জল সংরক্ষণ যদি না হয় তাহলে গাছ লাগানোর কোন চিন্তা ভাবনা করা উচিত নয় l আমাদের প্রত্যেক দিনের জলের বাজেট থাকা উচিতl অডিট হওয়া উচিত l জল কর থাকা উচিত l আমাদের দেশের জল সমস্যার মূল কারণ কৃষি ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জলের ব্যবহার l তিনি বলেন “একজোড়া জিন্স তৈরি করতে গেলে প্রায় ৪০ হাজার লিটার জল লাগে, আবার এক কেজি ধান তৈরি করতে গেলে দুই হাজার লিটার জল লাগে!’ l এই পৃথিবীটা তেলে চলেনা – এই পৃথিবীতে চলে- জলে l আমাদের দেশে বিভিন্ন শহর হায়দ্রাবাদ, বাংগালোর, দিল্লি জলকষ্টে ভুগছে l যতদিন না আমাদের দেশে জল নিয়ে কোন বাজেট না হচ্ছে, জল নিয়ে কোন পরিকল্পনা না হচ্ছে , জলে কোন ট্যাক্স না বসছে – ততদিন ভূগর্ভস্থ জলের অপচয় রোধ করা যাবে না l কৃষি ক্ষেত্রে জলের অপচয় বন্ধ না হলে ভারতবর্ষ ভবিষ্যতে গভীর অন্ধকারের দিকে হারিয়ে যাবে l এর সঙ্গে তিনি তার ডলফিন সংরক্ষণ , বাদুড় সংরক্ষণ , জোনাকি সংরক্ষণ নিয়ে পরীক্ষাগারে করা গবেষণার কথা বিশদে ব্যাখ্যা করেন l আমাদের পরিবেশ থেকে প্রত্যেকদিনের দেখা পাতিকাক, মেছো বেড়াল হারাচ্ছে l পাতিকাক হারানোর জন্য তিনি দায়ী করেন – রোপণের জন্য ভুল বৃক্ষ নির্বাচনকে পদ্ধতিকেl এর ফলে কাক তার বাসা তৈরি উপযুক্ত জায়গা পাচ্ছে না l আবার চড়ুইও হারিয়ে যাচ্ছে অতি দ্রুত।

এদিন তিন গবেষক ছাত্র জোনাকি, বাদুড় এবং এক ধরনের খোলকহীন শামুকের কথা তুলে ধরেন ৷ এই ওয়েবিনারের মধ্য দিয়ে পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানের গুরুত্ব, তাদের স্বাস্থ্য ইত্যাদি খুব সহজ ভাবে মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হতে পেরেছে বলে উপস্থিত সকলের অভিমত l


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ