প্রমথ চৌধুরীর বাড়ির ভগ্নপ্রায় অবস্থা
দীপাঞ্জন দে: বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলে যিনি এক প্রকার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, সেই প্রমথ চৌধুরীদের বাড়ি আজ ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চৌধুরী পরিবারের এই বাড়িটি নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে রয়েছে, সেখানে ডন বক্স রোডের ধারে সকলের অনাদরে জরাজীর্ণ অবস্থায় বাড়িটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনে আছে একটি বড় মাঠ। জায়গাটি এখন বৈশাখী ক্লাবের মাঠ নামেই বেশি পরিচিত, পুরনো মানুষেরা যদিও এটিকে এখনো রানিকুঠির মাঠই বলেন। এখন রানিকুঠির সকল গরিমা ম্লান হলেও, বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কারিগরেরা এক সময় কৃষ্ণনগরে চৌধুরীদের এই বাড়িতে নিয়মকরে আসতেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় থেকে শুরু করে রামতনু লাহিড়ী, কালীচরণ লাহিড়ী, অতুলপ্রসাদ সেন—তালিকাটি লম্বা। সেই তালিকায় রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। রবিঠাকুর তো এই বাড়িতে তিন-চারদিন ছিলেন বলেও জানা যায়। ‘রানিকুঠি’ নামটিও নাকি তারই দেওয়া। তবে বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
যাই হোক, আজকের ডন বক্স এলাকাটি শহরের সীমান্তে অবস্থিত হলেও, সেই সময় এই জায়গাটি ছিল কৃষ্ণনগরের হোয়াইট টাউন এলাকা। একজন শ্বেতাঙ্গ সাহেব এই বাড়িতে বসবাস করতেন। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে প্রমথ চৌধুরীর বাবা দুর্গাদাস চৌধুরী চাকরীসূত্রে কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন। তিনি এখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এসেছিলেন। দুর্গাদাস চৌধুরী তাঁর সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য শ্বেতাঙ্গ সাহেবের কাছ থেকে এই বাড়িটি ক্রয় করেন। চৌধুরী পরিবারের অনেকেই পরবর্তিতে বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক হয়েছিলেন। দুর্গাদাস চৌধুরীর সন্তান-সন্ততি আশুতোষ চৌধুরী, কুমুদনাথ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী, প্রসন্নময়ী দেবীর জীবনের অনেকটা পর্যায় কাটে কৃষ্ণনগরের এই বাড়িতে। প্রমথ চৌধুরীর অগ্রজ আশুতোষ চৌধুরী লেখক হিসেবে বেশ নাম করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর খুব সখ্যতা ছিল। কুমুদনাথ চৌধুরী শিকারি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। বাঘ শিকার করতে গিয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন প্রমথ চৌধুরীর বোন। তিনিও বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধিকা ছিলেন। প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় লিখেওছেন যে — “আমার বড়দাদা ইংরেজি ভাষা খুব ভালো জানতেন; আর আমার সেজ-দাদা কুমুদনাথ অল্পবয়েস থেকেই ছিলেন শিকারি। তিনি শিকারের বই পেলেই পড়তেন। শেষ বয়সে তিনি শিকার করতে গিয়ে বাঘের হাতে প্রাণ দিয়েছেন।”


প্রমথ চৌধুরীদের পরিবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। সেই সূত্রে ঠাকুর পরিবারের অনেকেই কৃষ্ণনগরের এই ভবনে এসেছিলেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ইস্টারের ছুটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশুতোষ চৌধুরীর জন্য তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভার সম্বন্ধ নিয়ে কৃষ্ণনগরের চৌধুরীদের বাড়িতে এসেছিলেন। প্রতিভা দেবীর সাথে আশুতোষ চৌধুরীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীও পরবর্তীতে চৌধুরী পরিবারের বৌমা হয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে ১৮৯৯ সালে তাঁর বিবাহ হয়। ইন্দিরা ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কন্যা। অল্প বয়সেই অনুবাদক হিসেবে তিনি বিশেষ নাম করেছিলেন। শুধু চৌধুরী পরিবারের পুত্ররাই নন, চৌধুরী পরিবারের কন্যা এবং পুত্রবধূরাও গুণী ছিলেন। এহেন সাংস্কৃতিক পরম্পরা বহনকারী কৃষ্ণনগরের চৌধুরী পরিবারের বাসভবন পরবর্তীতে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে নদিয়া রাজবংশের মহারানি জ্যোতির্ময়ী দেবী ক্রয় করেন। অনেকের মতে, তারপর থেকেই এই ভবনটির নাম হয় ‘রানিকুঠি’। চৌধুরী পরিবারের বসতবাটি এই রানিকুঠি আজ বিলুপ্তির পথে। এর ভগ্নদশা চিৎকার করে বলছে যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আগামীদিনে আর রানিকুঠির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না। কিন্তু বিস্ময় হয়— সেই চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছেন না!
লেখক: অধ্যাপক, চাপড়া বাঙ্গালঝি মহাবিদ্যালয়, নদিয়া।

