কলকাতা প্রচ্ছদ 

সংবিধানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার যে অধিকার সংখ্যালঘুদের দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের জন্যই আমরা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিঃ আবু সোহেল

শেয়ার করুন
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার ও পরিচালনা  করার যে অধিকার সংবিধান দিয়েছে, দুঃখের হলেও সত্য সেই অধিকার স্বাধীনতার ৭২বছর পরও ভালভাবে সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে মুসলিমরা পায়নি। সেই সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে মামলার প্রেক্ষিতে রাজ্যের মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। আর এই মামলার জন্য দীর্ঘ ৫ বছর ধরে মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। শিক্ষকের অভাবে ধুঁকছে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা। গত ১৭ মে সুপ্রিমকোর্টে এই মামলার উপর বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ দিয়েছে বিচারপতি অরুণ মিশ্র বিচারপতি উদয় উমেশ ললিতের ডিভিশন বেঞ্চ। কিন্তু মাদ্রাসাগুলিতে  শিক্ষক নিয়োগের ভার পরিচালন সমিতি নাকি সার্ভিস কমিশন পাবে শীর্ষ আদালতের রায়ে তা স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে আগামী ১২ জুলাই। শেষপর্যন্ত মাদ্রাসায় শিক্ষক নিয়োগের ভার কে পাবে তা নিয়ে সার্ভিস কমিশন থেকে শুরু করে পরিচালন সমিতির কর্তারা পর্যন্ত যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। কিন্তু সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের বিরুদ্ধে পরিচালন সমিতির করা মামলার নেপথ্যে কি কারণ রয়েছে, ‘বাংলার জনরব’ প্রতিনিধি শেখ মিজানুর রহমানের সঙ্গে তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করলেন সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে মামলাকারী আইনজীবী আবু সোহেল-

প্রশ্নঃ দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ করছে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন। কিন্তু হঠাৎ আপনারা সার্ভিস কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করলেন। এর নেপথ্যে কারণ কী?

আবু সোহেলঃ ১৯৯৭ সালের আগে স্কুল ও মাদ্রাসাগুলিতে ম্যানেজমেন্ট কমিটিই শিক্ষক নিয়োগ করত। পরবর্তীতে স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) আইন চালু হয়। সেই আইন মোতাবেক রাজ্যের সমস্ত স্কুল ও মাদ্রাসায় এসএসসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ হত। এসএসসি আইনের একটা ধারায় বলা রয়েছে যদি কোনও স্কুল বা মাদ্রাসা সংখ্যালঘুু স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়, তাহলে তার ক্ষেত্রে এসএসসি আইন প্রযোজ্য হবে না। ২০০৭ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার রাজ্যের সমস্ত মাদ্রাসা গুলিকে সংখ্যালঘু স্বীকৃতি প্রদান করে। এর পরেই ২০০৭ এর অক্টোবরে সরকারের তরফে আর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। যাতে বলা হয়, যেহেতু এসএসসি আইনে বলা রয়েছে যে, সংখ্যালঘু স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসএসসি অাইন প্রযোজ্য হবে না, তাই এক্ষেত্রে এসএসসি আইন বাতিল করা হোক।  সেইসঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়, মাদ্রাসাগুলিতে কিভাবে শিক্ষক নিয়োগ হবে পরবর্তীতে তা জানিয়ে দেওয়া হবে। এর পর ২০০৮ সালে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন চালু করে রাজ্য সরকার। সেই থেকে ২০১৩ পর্যন্ত মাদ্রাসা গুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করেছে কমিশন। কিন্তু সংবিধানের ৩০ এর এ ধারায় বলা রয়েছে, সংখ্যালঘু স্বীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগসহ নিজেদের মত করে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারবে সংখ্যালঘুরা। আবার ৩০ এর বি ধারায় বলা রয়েছে, কোনও সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে সরকার অনুদান দেবে না এটা হতে পারে না। অর্থাৎ, সংখ্যালঘু স্বীকৃৃত         শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে সংখ্যালঘুুদের নিজেদের মত করে পরিচালনা করারঅধিকার সংবিধান দিয়েছে। সংবিধানের ৩০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাজ্যের অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা সেই ক্ষমতা ভোগ করে। রাজ্যে মুসলিম বাদে অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৪ টি স্কুল রয়েছে। সেগুলিতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকার একটা পৃথক বোর্ড গঠন করেছে। সেই বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালন সমিতি শিক্ষক নিয়োগ করে। আর সরকার সেই শিক্ষকদের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সমান বেতন দেয়। তাহলে এক্ষেত্রে মুসলিমরা কেন বঞ্চিত থাকবে?  মুসলিমদের সংবিধান প্রদত্ত অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্যই কমিশনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কাঁথি রহমানিয়া হাইমাদ্রাসা।

প্রশ্নঃ অনেকের অভিযোগ ম্যানেজমেন্ট কমিটির মাধ্যমে মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ হলে স্বজনপোষণ হবে। যার ফলে মেধাবী শিক্ষক পাওয়া যাবেনা। এবিষয়ে কি বলবেন?

আবু সোহেলঃ ম্যানেজমেন্ট কমিটি মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করলে সেক্ষেত্রে স্বজনপোষণের কোনও প্রশ্নই আসবেনা। স্বচ্ছ ভাবে শিক্ষক নিয়োগ করতে রাজ্য সরকার ৩ মার্চ ২০১৬ য় যে গাইডলাইন বেঁধে দিয়েছিল, সেই গাইডলাইন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ হবে। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কমিশন শিক্ষক নিয়োগ করলে সেক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অপ্রশিক্ষিত দুই ধরনের চাকরিপ্রার্থী শিক্ষকতার সুযোগ পাবেন। কিন্তু ২০১৬ সালের গাইডলাইন অনুযায়ী ম্যানেজমেন্ট কমিটি  শিক্ষক নিয়োগ করলে সেক্ষেত্রে কেবলমাত্র প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাকরিপ্রার্থীরা শিক্ষকতার সুযোগ পাবেন। তাহলে কারা মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করছে?

প্রশ্নঃ কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চাকরি প্রার্থী হলেই যে তিনি মেধাবী হবেন, এমনটাতো হলফ করে বলা যায় না। অনেক অপ্রশিক্ষিত প্রার্থীরও হয়তো প্রশিক্ষিত প্রার্থীর চেয়ে তাঁর নিজ বিষয়ের উপর জ্ঞানের গভীরতা অনেক বেশি হতে পারে। সেক্ষেত্রে কী হবে? 

আবু সোহেলঃ ঠিকই বলেছেন। সেটা হয়তো হতে পারে। কিন্তু রাজ্য সরকার ৩ মার্চ ২০১৬ য় যে বিষয়ের শিক্ষকের উপর যেমন যোগ্যতা বেঁধে দিয়েছে, সেই মতই আমরা শিক্ষক নিয়োগ করব।

প্রশ্নঃ কিন্তু অনেকের বক্তব্য ৩ মার্চ ২০১৬র গাইডলাইন বাতিল করেছে রাজ্য সরকার এ বিষয়ে কী বলবেন?

আবু সোহেলঃ দেখুন, ৩ মার্চের বিজ্ঞপ্তি বাতিল করা হয়েছে বলে যে প্রচার চালানো হচ্ছে তা মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, ৩ মার্চের নির্দেশিকা যদি বাতিল হয়ে থাকে, তাহলে সুপ্রিম কোর্ট ঐ নির্দেশিকাকে কেন গুরুত্ব দিল? সরকারি আইনজীবী আদালতে কেন জানালো যে ৩ মার্চের নির্দেশিকা অনুযায়ী যোগ্যতার ভিত্তিতে যে সমস্ত মাদ্রাসা পরিচালন কমিটি শিক্ষক নিয়োগ করেছিল তাদের বেতনের ব্যবস্থা করবে রাজ্য। এর থেকেই দিনে  আলোর মতো পরিষ্কার ২০১৬-র  ৩ মার্চের নির্দেশিকা এখনও বাতিল করেনি সরকার।

প্রশ্নঃ ম্যানেজমেন্ট কমিটি শিক্ষক নিয়োগ করলে সেক্ষেত্রে পদ্ধতি কি হবে? 

আবু সোহেলঃ রাজ্য সরকারের গাইডলাইন অনুযায়ী প্রথমে শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। এর পর পরীক্ষা ও ইন্টারভিউর ভিত্তিতে মেধা তালিকা প্রকাশ করা হবে।

প্রশ্নঃ  আপনাদের মামলার জন্যই নাকি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছি সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবেই প্রচার চলছে এবিষয়ে আপনি কি বলবেন?

আবু সোহেলঃ মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বেআইনিভাবে চললে তো মামলা হবেই। (একটু থেমে)  মাদ্রাসা গুলিকে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে যদি আইনে ফাঁক না থাকতো, তাহলে আদালত আমাদের মামলা গ্রহণ করত কেন? কেনই বা কলকাতা হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চ ও ডিভিশন বেঞ্চ পরিচালন সমিতির পক্ষেই রায় দিল? সরকার সংবিধান অনুযায়ী মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিচালনা করেনি বলেই মামলা করেছি। সেক্ষেত্রে মাদ্রাসাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে যে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি বা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা যে সংকটের সম্মুখীন হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, সেজন্য   আমরা দায়ী নয়, দায়ী সরকার।

প্রশ্ন সবশেষে জানতে চাইবো সুপ্রিম কোর্টে যদি আপনারা মামলায় জয়ী হন তাহলে সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে যে সমস্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছেন তাদের ভবিষ্যত কী হবে?

আবু সোহেলঃ সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে যেসমস্ত শিক্ষক আগেই নিয়োগ হয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে আমাদের আপত্তি নেই। তাঁরা চাকরিতে বহাল থাকবেন। কিন্তু শীর্ষ আদালতের রায়ে এখন কমিশন যাদের নিয়োগ করবে, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের নিয়োগ বাতিল করব। কারণ শীর্ষ আদালতের রায়ের স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে সার্ভিস কমিশন এখন শিক্ষক নিয়োগ করলেও তাদের চাকরির স্থায়িত্ব নির্ভর করবে আদালতের পরবর্তী রায়ের উপর


শেয়ার করুন
  • 16
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সম্পর্কিত নিবন্ধ

Leave a Comment