জ্ঞানেশ কুমারের বিদায় আসন্ন! ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে তদন্তমূলক সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর দেশ জুড়ে প্রতিবাদের হাওয়া, রাহুল গান্ধী বললেন যেতেই হবে!
বাংলার জনরব ডেস্ক : দেশের জাতীয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে অন্তর তদন্তমূলক সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর কার্যত নির্বাচন কমিশনের ভিত নড়ে গেছে। দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিরোধীদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এতদিন ধরে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছিল তা যে একমাত্র জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত আজকে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর বের হওয়ার পর সমগ্র দেশ জুড়ে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীরা সরব হয়েছেন। পশ্চিম বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারি এবং বাংলার পুনর নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর আপত্তি উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে যে, অন্ধকারে রেখে যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ। গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশী। কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে এক দিনেই চার বার আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু কোনও বারেই তাঁদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরেই জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে সরব হতে শুরু করে বিরোধী দলগুলি। সাংবাদিক বৈঠক করে আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরীবাল বলেন, “নিজের ইচ্ছায় দেশের নির্বাচন কমিশনকে পরিচালনা করছেন জ্ঞানেশ।” জ্ঞানেশকে গ্রেফতার করার পাশাপাশি সম্প্রতি হওয়া সমস্ত নির্বাচন বাতিল করার দাবি জানান তিনি।
লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, “ভোটচুরি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে হওয়া একটি অপরাধ। এটা আমাদের সংবিধানকেও সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস এবং নির্বাচন কমিশন— যারা এসবের উদ্যোক্তা, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করছে।” একই সঙ্গে হুঁশিয়ারির সুরে রাহুল বলেন, “আমি নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী আধিকারিকদের পরিষ্কার বলে দিতে চাই যে, আপনারা যা করেছেন, ভুল করেছেন। এটা বিশ্বাসঘাতকতা, দেশদ্রোহিতা। সময় চলে এসেছে। আমরা আপনাদের ধরবই। রক্ষা পাবেন না।” শিবসেনা ইউবিটি-র নেতা তথা মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুতে ব্যালটে পুনরায় ভোট করানোর দাবি তুলেছেন।
সমাজমাধ্যমে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনটি শেয়ার করে মমতা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এখনই বরখাস্ত করা উচিত। একই সঙ্গে আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক দলের সুবিধার জন্য লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।” অভিষেকের সংযোজন, “পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-তে থাকা সমস্ত বিরোধী দল এই বিষয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করে দেশের প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়নি।” পোস্টের শেষে অভিষেকের প্রশ্ন, “প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কি এই বিষয়ে পদক্ষেপ করবে?” বিদেশ থেকে শহরে ফিরে জ্ঞানেশকে বিঁধে অভিষেক বলেন, প্রধানমন্ত্রী যাঁকে মনোনীত করেছেন, তিনি যে বিজেপির কথায় কাজ করবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। আজ ঝুলি থেকে বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। বাংলার অভিশাপ লেগে গিয়েছে। জোর করে বাংলা দখল করতে এসেছিল। গোটা দেশে বিজেপির অবস্থা খুব খারাপ। আগামী দিনে আরও খারাপ হবে।”
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দুই কমিশনারের অভিযোগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির বিষয়টি এখন আর বিকেন্দ্রীভূত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। গোটা বিষয়টি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না। এমনিতে প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের কাজের দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের কাছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফ্টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ‘ইসিআইনেট’-এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরও-দের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সঁধু জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সঁধু বলেন, “আইন অনুযায়ী তিনি এটি (পোর্টাল) নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।”
মমতার তৃণমূলের দাবি, অভিষেক গত ডিসেম্বরেই সীমার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২৭ ডিসেম্বর একটি সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক বলেছিলেন, “আমার কাছে স্ক্রিনশট রয়েছে। সীমা খন্না নামে একজন মহিলা রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী? দিল্লিতে কার নির্দেশে তিনি কাজ করছেন? তাঁর কথোপকথনের সমস্ত স্ক্রিনশট রয়েছে।” দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশী সেই সীমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলায় মমতা তৃণমূলের দাবি, তারা যে অভিযোগ তুলেছিল, তাতেই সিলমোহর পড়ল। মমতা তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের কথায়, “আমরা যথাযথ ভাবে জানতাম, কী ভাবে জ্ঞানেশ কুমার (সীমা) খন্না এবং সফ্টওয়্যারের ব্যাক এন্ডকে ব্যবহার করে তালিকা বিকৃত করেছেন।” ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র সৌরভ দাসের তোপ, “জ্ঞানেশ কুমার ভারতবাসীর এক নম্বর শত্রু।”
রাজ্যসভার সাংসদ এবং প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বলও বিরোধী দলগুলির সুরে জ্ঞানেশের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি তুলেছেন। কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিব্বল বলেন, “এখনও পর্যন্ত (এসআইআর-এ) ১৩ কোটি নাম বাদ গিয়েছে। আমরা প্রতি দিন বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে উত্থাপিত করছি। কিন্তু আদালত আমাদের কথা শুনছে না। নির্বাচন কমিশনের আর বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।”
কমিশনের বিবৃতিতে অবশ্য বিতর্কে জল ঢেলে বলা হয়েছে, “কোনও বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ধরনের আলোচনা ও মতবিনিময় হয়। শুধু কমিশনের তিন সদস্যই নয়, কমিশনের অন্যান্য আধিকারিকও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন।” কমিশনের দাবি, গত ১০ মাসের কিছু অভ্যন্তরীণ নোট বা পর্যবেক্ষণ আলাদা করে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এই সময়ে কমিশন বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্দেশ দিয়েছে এবং প্রায় ৪০টি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং এসআইআর-ও রয়েছে। তাদের দাবি, গত এক বছরে এই সিদ্ধান্তগুলি কমিশনের ফুল বেঞ্চের (তিন কমিশনারের) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের দাবি, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশনের সদস্যেরা বিভিন্ন মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি জানাতে পারেন। এটি কমিশনের স্বাভাবিক কাজের অংশ। এর উদ্দেশ্য হল ভোটারদের অধিকার রক্ষা করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও ভাল করা।”

