সাইবার হানা রাজ্যের একাধিক সরকারি দফতরের ওয়েবসাইট কার্যত অচল
গত ১৩ তারিখ থেকে রাজ্যের একাধিক সরকারি দফতরের ওয়েবসাইট কার্যত অচল। জন্ম-মৃত্যুর নিবন্ধিকরণ-সহ অনেক কাজই বিঘ্নিত হচ্ছে। সূত্রের খবর, সাইবার হানার জেরেই এমন বিভ্রাট। শুধু তা-ই নয়, রাজ্যের সরকারি তথ্যভান্ডার থেকে বহু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গায়েব হয়ে গিয়েছে বলে আশঙ্কা। যদিও সরকারের তরফে এমন খবরের সমর্থন মেলেনি।
রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দফতরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ডিজিটাইজ় করে রাখা থাকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য তথ্যকেন্দ্র বা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট ডাটা সেন্টারে। রাজ্য তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের অধীনস্থ এই সংস্থাটি ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (ওয়েবেল)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন। রাজ্য সরকারের একটি সূত্র জানাচ্ছে, গত ৯ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন সংস্থার সার্ভারে হানাদারি চালিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। চুরি করেছে অর্থ দফতর-সহ একাধিক দফতরের গুরুত্বপূর্ণ নথি। তার পর সেগুলি নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। নষ্ট হয়ে যাওয়া নথির মধ্যে বিগত সরকারের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত তথ্যও থাকতে পারে বলে সাইবার বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। সাইবার হামলার জের এখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি রাজ্য তথ্যকেন্দ্রের সার্ভার। ফলে পূর্ত, আবাসন, পুর ও নগরোন্নয়ন, রাজ্য পুলিশ-সহ একাধিক সরকারি দফতরের ওয়েবসাইট হয় অচল, না হয় সাইটের ব্যাক এন্ডে কাজ করা যাচ্ছে না।
সরকারি সূত্রের খবর, প্রথম হানাদারি হয় ৯ সেপ্টেম্বর। কিন্তু ১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরবেলার আগে তা বুঝতেই পারেননি রাজ্য তথ্যকেন্দ্রের কর্মীরা। তখন হামলা ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও কার্যকর হয়নি। পরের দিন তদন্ত করতে গিয়ে সাইবার ফরেনসিক দল ‘উদ্বেগজনক’ তথ্য আবিষ্কার করে। জানা যায় ৯ সেপ্টেম্বর থেকে পর পর পাঁচ দিন সাইবার হানাদাররা তথ্যকেন্দ্রের সার্ভারে সিঁধ কেটে ম্যালঅয়্যার স্ক্রিপ্ট ‘রান’ করিয়েছে। ম্যালঅয়্যার স্ক্রিপ্ট হল এক ধরনের কোড, সাইবার অপরাধীরা যা গোপনে কোনও ওয়েবসাইট, অ্যাপ্লিকেশন এমনকি বিজ্ঞাপনেও ঢুকিয়ে দেয়।
রাজ্য তথ্যকেন্দ্র থেকে কী ধরনের হানাদারি হয়েছে তার খোঁজ করতে গিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, অর্থ-সহ চারটি দফতরের নথির একটা বড় অংশ চুরি হয়ে থাকতে পারে। তার মধ্যে আগের জমানার বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের তথ্য থেকে শুরু করে জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধিকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সরকারের আর্থিক লেনদেন বিষয়ক নথিও রয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান। ‘চুরি’ হয়ে যাওয়া কোনও নথি বা তথ্যই এখনও উদ্ধার করা যায়নি। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের একটা ‘ব্যাকআপ’ থাকে। কিন্তু যে ভাবে একাধিক বার, বিনা বাধায় সাইবার হামলা হয়েছে, তাতে সেই ‘ব্যাকআপ’-ও পাকাপকি ভাবে নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকতে পারে।
তদন্তে উঠে এসেছে হামলার সময় অন্তত ৫০টি ‘ভার্চুয়াল মেশিন’ সক্রিয় ছিল। অর্থাৎ হানাদারদের সামনে তথ্যের প্রায় সব দরজাই উন্মুক্ত ছিল। তবে অর্থ দফতরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম আক্রান্ত হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। চলতি সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে অন্নপূর্ণা যোজনার নথি কতটা নিরাপদে আছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলার ধরন দেখে তদন্তকারীদের অনুমান, খুব পেশাদার গোষ্ঠী এর পিছনে রয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই হামলা চালানো হয়।
কিন্তু সকলের অজান্তে টানা পাঁচ দিন ধরে লাগাতার হামলা চলল কী করে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই প্রশ্নের মুখে রাজ্য সরকারের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অথচ এই ধরনের হানাদারি সাইবার দুনিয়ায় বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুনেও রাজ্য তথ্যকেন্দ্রে সাইবার হানায় তথ্য চুরির অভিযোগ উঠেছিল। সে বার মূলত জন্ম-মৃত্যু শংসাপত্র সংক্রান্ত তথ্য চুরি গিয়েছিল বলে অভিযোগ। তবে তখন সরকার হামলার কথা স্বীকার করেনি।

