প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের টেট! পরীক্ষার দিনক্ষণ জানাতে এস এস সি ও পর্ষদকে চিঠি বিকাশ ভবনের
প্রাথমিক ও উচ্চপ্রাথমিক স্তরে কর্মরত শিক্ষকদের টেট (টিচার্স এলিজিবিলিটি টেস্ট) গ্রহণের তোড়জোড় শুরু করল রাজ্য সরকার। কবে সেই পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব, তা স্কুল সার্ভিস কমিশন এবং প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের কাছে জানতে চাইল স্কুলশিক্ষা দফতর।
শুক্রবার দুপুরে এ খবর জানাজানি হতেই লক্ষাধিক শিক্ষক আশঙ্কায়। রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ ও স্কুল সার্ভিস কমিশন সূত্রের খবর, তারা দ্রুত টেট-এর দিনক্ষণ দফতরকে জানাচ্ছে। পর্ষদের এক আধিকারিক বলেন, “শুক্রবার দফতর থেকে নির্দেশিকা এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে ২০২৮ সালের অগস্টের মধ্যে টেট নিতে হবে। দফতর আমাদের কাছে দিনক্ষণ জানতে চেয়েছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে দফতরকে জানিয়ে দেব।”
গত বছরই সুপ্রিম কোর্ট এক রায়ে জানিয়েছিল, দেশের প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রে টেট উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। যাঁরা ‘টিচার্স এলিজিবিলিট টেস্ট’ (টেট) উত্তীর্ণ নন, তাঁদের প্রাথমিক ভাবে ২০২৭-এর মধ্যে তা উত্তীর্ণ হতে হবে বলে নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। সম্প্রতি এই সময়সীমা ২০২৮ পর্যন্ত বর্ধিত করেছে শীর্ষ আদালত। তবে, যাঁদের অবসরের আর পাঁচ বছর বা তার কম সময় বাকি, তাঁদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হয়েছিল।
এ দিনের এই নির্দেশ প্রকাশ্যে আসতেই শিক্ষা মহলে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। শিক্ষকদের দাবি, রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এ রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি সরকার সমস্ত শিক্ষকের স্বার্থরক্ষায় প্রয়াসী হবে। কিন্তু কার্য ক্ষেত্রে হচ্ছে বিপরীত।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯ কার্যকর হয় ২০১০-এ। সেই আইন অনুযায়ী বিধি তৈরি করে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর টিচার্স ট্রেনিং বা এনসিটিই। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের জুলাইয়ে শিক্ষকদের যোগ্যতা সংক্রান্ত নিয়ম চালু হয়। সেখানে টেট বাধ্যতামূলক করা হয়। তার আগে যাঁরা শিক্ষক হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন, তাঁদের এই টেট-র আওতায় আসার কথা নয়। শিক্ষকদের একাংশ আবেদন করেছিলেন, এই আইন কার্যকর হওয়ার আগে থেকে যে সকল শিক্ষক কর্মরত, তাঁদের এই নির্দেশের বাইরে রাখা হোক।
হিসাব বলছে, এই মুহূর্তে সারা দেশে ২০ লক্ষ শিক্ষক কর্মরত, যাঁরা টেট উত্তীর্ণ নন। এ রাজ্যে সেই সংখ্যা ৯০ হাজারের বেশি। শিক্ষার অধিকার আইন, আরটিই ২০০৯ এবং এনসিটিই ২০১০-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষকতার জন্য টেট পাশ করা ন্যূনতম এবং বাধ্যতামূলক যোগ্যতা। সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, টেট আবশ্যিক যোগ্যতা। কিন্তু সমস্যা হয়েছে ২০১১ পর্যন্ত শিক্ষকতায় নিযুক্তদের নিয়ে।
সম্প্রতি এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট ফের রিভিউ পিটিশন করেন নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। কিন্তু টেট বাধ্যতামূলকই রাখে শীর্ষ আদালত। শিক্ষকেরা দাবি তুলেছিলেন বাদল অধিবেশনে অধ্যাদেশ জারি করে শিক্ষকদের বাঁচানো হোক। কিন্তু বাদল অধিবেশনে এ সংক্রান্ত কোনও উত্থাপন হয়নি সংসদে। গত কয়েক মাসে একাধিকবার পথে নেমেছেন শিক্ষকেরা।
বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “বিজেপি সরকার আমাদের রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতায় এলে কর্মরত শিক্ষকদের যাতে টেট দিতে না হয় তার ব্যবস্থা করবে। ক্ষমতায় এসেই একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে গেল। শিক্ষকসমাজকে প্রতারণা করা হল।” তাঁর দাবি, কয়েক দিন আগেও শাসকদলের শিক্ষক নেতারা বলেছেন, ওদের সঙ্গে যুক্ত হলে টেট দিতে হবে না।
নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ধ্রবশেখর মণ্ডল বলেন, “আমাদের টেট বিরেধী লড়াই জারি থাকবে। আমাদের প্রশ্ন যে সব শিক্ষকেরা টেট-এর জন্য যোগ্যতা এখনও অর্জন করেনি তাঁদের কী হবে? টেটে যদি তাঁরা বসতে বা উত্তীর্ণ হতে না-পারেন তা হলে কি তাঁদের চাকরি থাকবে না? সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন তাঁদের নিয়ে কী ভাবছে?”

