কলকাতা 

তারাতলায় ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় কী সত্যিই অনিয়ম হয়েছিল? ফিরহাদ হাকিম কী বেআইনি নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিলেন! একটি বিশ্লেষণ

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিনিধি : তারাতলা কাণ্ডে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে সরাসরি প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমকে নিশানা করেছিলেন। অভিযোগ করেছিলেন তারাতলায় ভেঙে পড়া গুদামের নকশা ত্রুটিপূর্ণ বলে। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় একটি নথি দেখিয়ে তিনি দাবি করেন, ত্রুটিপূর্ণ নকশায় ছাড়পত্র দিয়েছিলেন প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম নিজেই। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমিক প্রকাশিত হয়েছে,তাতে দেখা যাচ্ছে, মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির (এমবিসি) বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে বিতর্কিত ওই কাঠামোর নকশায় কোনও রকম নির্মাণবিধি ভঙ্গ করা হয়নি বলে জানানো হয়েছিল। একই সঙ্গে বলা হয়েছিল, এই নকশা অনুমোদনের আগে বিল্ডিং বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত মেয়র পারিষদ অথবা মেয়রের সই বাধ্যতামূলক। ফিরহাদ নিজেই সই করে বিষয়টিতে ছাড়পত্র দিয়েছিলেন।

মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটির বৈঠকটি হয়েছিল গত বছর ২০ নভেম্বর। সেই বৈঠকে কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডিজি (বিল্ডিং), কলকাতার পুলিশ কমিশনারের প্রতিনিধি, দমকল বিভাগের প্রতিনিধি, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং দফতরের প্রতিনিধি, কেএমডিএ-র প্রতিনিধি, স্থপতি এবং টাউন প্ল্যানার। এই বৈঠকেই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বন্দরের কাছ থেকে লিজ নেওয়া জমিতে গুদাম তৈরি করতে চেয়ে বেহরা ব্রাদার্সের অংশীদার শম্ভুনাথ বেহরার জমা দেওয়া নকশাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। বলা হয়, বিল্ডিং কমিটি নকশাটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে খতিয়ে দেখেছে। নকশায় কিছু পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছিল। সেই সব পরিবর্তন করার পরে নকশাটিকে ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে। নকশায় বিল্ডিং রুল ‘সেই অর্থে’ ভাঙা হয়নি বলেও মন্তব্য করা হয় মিটিং নোটে। কিন্তু তার পরেও এই সুপারিশ কার্যকর করে নকশাকে ছাড়পত্র দেওয়ার জন্য বিল্ডিং বিভাগের মেয়র পারিষদ অথবা মেয়রের অনুমতি যে আবশ্যিক, সে কথাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী যখন তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন, ফিরহাদ তখন অধিবেশনকক্ষে ছিলেন না। পরে তিনি বলেন, ‘‘দুর্ভাগ্যবশত আমি ইঞ্জিনিয়ার নই। এমবিসি-তে টেকনিক্যাল লোকেরা থাকেন। আমার তাতে কোনও এক্তিয়ার নেই। কোনটা বেআইনি হল, কোনটা হল না, সেটা দেখারও এক্তিয়ার আমার নেই। এমবিসি থেকে কমিশনার হয়ে অনুমোদনের জন্য আমার কাছে আসে। ওটা শুধু একটা ফর্মালিটি, সই করার জন্য।’’

মুখ্যমন্ত্রী ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, “আমরা পুরো ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং বের করেছি। কোনও ছাড়াছাড়ির সিন নেই।” তাঁর এই মন্তব্যের পরেই তৃণমূলের অন্তর্কলহের সমীকরণ মেনে ফিরহাদকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করার দাবি জানিয়েছেন কুণাল ঘোষ। মেয়রপদ ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে নাম লিখিয়েছেন ফিরহাদ। কুণাল এখন কালীঘাট শিবিরের সবচেয়ে সরব মুখ। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ফিরহাদ কি ‘ঘরে-বাইরে’ বিপদের মুখে?

প্রাক্তন মেয়রের ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছিলেন, ‘‘কালীকে তুললে সব বেরিয়ে যাবে। কলকাতা পুরসভায় কালী না-বললে কোনও প্ল্যান (পাশ) হয় না।’’ শুভেন্দুর অভিযোগের পরে বৃহস্পতিবার রাতেই কালীচরণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বিষয়টা যাতে সেখানেই থেমে না-থাকে সে জন্য সক্রিয় হয়েছে কালীঘাট তৃণমূল। কলকাতার মেয়র পদে ইস্তফা দিয়ে ফিরহাদ এখন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে। ফলে তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য সরকারের উপরে চাপ বাড়াচ্ছেন মমতাপন্থীরা। সাংসদ মহুয়া মৈত্রের প্রশ্ন, ‘‘ববি হাকিমের সই থাকলে তাঁকে বগলদাবা করে ঘুরছেন কেন? এত জনের মৃত্যু হল। ফিরহাদ হাকিমের বিরুদ্ধে কী অ্যাকশন নিয়েছেন?’’ একই সুরে বিধায়ক কুণাল ঘোষের দাবি, ‘‘ফিরহাদ হাকিম দায়ী হলে তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জেরা করা হোক।’’ ফিরহাদ হাকিম মমতা বিরোধী শিবিরে নাম লিখিয়েছেন বলেই তাঁকে গ্রেফতার করতে সরকার ইতস্তত করছে বলে অভিযোগ করে মহুয়ার মন্তব্য, ‘‘তৃণমূলে থাকলে তো এত ক্ষণে তাঁর চোদ্দো পুরুষকে জেলে ঢোকাতেন।’’

 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ