বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত করেছে : ছোটন দাস
বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তী পরিস্থিতিতে সে দেশের হাসিনা সরকারের পতন সেই দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে সুরক্ষিত করেছে বলে কলকাতায় মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী ছোটন দাস। তিনি গতকাল ১৭ ই আগস্ট শনিবার কনফেডারেশন অফ মাইনোরিটিজ অ্যান্ড দলিত অ্যাসোসিয়েশনের সভায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এ কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের এই ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যেসব প্রচার চলছে আমাদের দেশে তা সঠিক নয়। কারন হাসিনা সরকার সেখানে যে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল সেখানে কেউই ভালো ছিল না। গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার সেই সময় সুরক্ষিত ছিল না আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী কিংবা সংবাদ মাধ্যম গুলো এমন একটা ভান করছে যেন ওখানে হাসিনার আমলে সংখ্যালঘু হিন্দুরা খুব সুখে ছিল কিন্তু এটা সত্য নয় বলে ছোটন দাস দাবি করেন। বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে হাসিনা সরকারের আমলে নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেন।
এদিনের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান জনাব আহমদ হাসান ইমরান বলেন, হাসিনা সরকারের সঙ্গে আমাদের দেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল এটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু সে দেশের বর্তমান অবস্থা এবং পরবর্তী পদক্ষেপে আমাদের রাজ্যের বাঙালি মুসলমানরা বিভিন্ন রাজ্যে আক্রান্ত হচ্ছে এটা একটা বড় সমস্যা। তিনি বিভিন্ন খবরের অংশ তুলে ধরে সেগুলো যে ফেক এবং মিথ্যা খবর প্রপাগান্ডা যাকে সম্বল করে এ দেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপরে আঘাত হানার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিশিষ্ট দলিত নেতা সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র হাসিনার আমলে সুরক্ষিত ছিল না। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত করার জন্য প্রতিবার নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। সে দেশের সংবিধানের 11তম সংশোধনের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল কিন্তু হাসিনা সরকার ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পরেই এই সিদ্ধান্তের বদল হয় 15 তম সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সিদ্ধান্তকেই পাল্টে দেয়া হয়। এর ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুরক্ষিত ছিল না। সাধারণ নাগরিক ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আর কোটা আন্দোলনকে সামনে রেখে যখন ছাত্ররা তাদের দাবি পেশ করতে গিয়েছে তখন তাদের উপরে স্বৈরাচারী মানসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হাসিনা প্রশাসন।
একটা স্বৈরাচারী সরকারের যা পরিণতি হতে পারে সেটাই হয়েছে হাসিনা সরকারের ক্ষেত্রে। আর আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো এই সহজ কথাটি বুঝতে না পেরে নানাভাবে প্রচার করে চলেছে। এমন ভাবে প্রচার করে চলেছে মনে হচ্ছে যেন হাসিনা সরকারের আমলে ওই দেশের সংখ্যালঘুরা সুরক্ষিত ছিল। তিনি আরো বলেন, কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দমন পীড়ন তাতেই কিন্তু এই সরকারের পতন লুকিয়ে ছিল।
এ দিনের সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইনজীবী আনিসুর রহমান বলেন, হাসিনা সরকারের অগতান্ত্রিক স্বৈরাচারী মানসিকতা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছিল তার পরিণতিতেই সরকারের পতন ঘটেছে। তবে আমাদের দেশের সরকার যেভাবে বিষয়টিকে হিন্দু মুসলমান করার চেষ্টা করছে তা কিন্তু ঠিক নয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ওই দেশের নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখার জন্য চেষ্টা করে চলেছে। কোথাও কোথাও অশান্তি হচ্ছে না এটা ঠিক নয় তবে তা হচ্ছে রাজনৈতিক লড়াই। আওয়ামী লীগের অগনতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই। বাংলাদেশ শিক্ষা দিয়েছে যে কোন অগনতান্ত্রিক সরকার বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না তার প্রভাব যদি আমাদের দেশে পড়ে তাহলে অনেক রাজনৈতিক দলের পরিণতি খারাপ হতে পারে।
এদিনের সভার আয়োজক বিশিষ্ট সমাজসেবী আলহাজ্ব জনাব মুহা শাহ আলম বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতির প্রতি আমাদের নজর রয়েছে, তারা আমাদের প্রতিবেশী দেশ। তবে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে তা সঠিক নয়। বলা হচ্ছে ওই দেশে নাকি মৌলবাদী শাসন শুরু হয়েছে আসলে ওই দেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হয়েছেন নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনুস। তিনি আর যাই হোক মৌলবাদী নন। তারপরেও এ দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলির এমনভাবে খবর পরিবেশন করছে যাতে এই রাজ্যের বাঙালি মুসলিমরা আতঙ্কিত এবং আশঙ্কিত হয়ে পড়ছে। এই অবস্থায় আমাদেরকে সত্য ঘটনাকে সামনে তুলে আনতে হবে এবং দুই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে তা তুলে ধরতে হবে। সেই উদ্দেশ্য লক্ষ্য নিয়েই আমাদের আজকের এই সভা।
এদিনের সভায় বিশিষ্টদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, বিশিষ্ট সমাজসেবী নাসির আহমেদ, সোনালী পান্ডা, সেখ ইবাদুল ইসলাম, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুরঞ্জন মিদ্দে প্রমুখ। অধ্যাপক সুরঞ্জন মিদ্দে এদিন বলেন বাংলাদেশের কোটা আন্দোলনে যেভাবে জনজাতি গোষ্ঠীগুলোকে সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে এটা ঠিক হয়নি। হাসিনা সরকারের ভুল ছিল এখানে। তবে তিনি সুপ্রিম কোর্টের উপর দায় চাপিয়ে এড়িয়ে যেতে পারেন কিন্তু বাস্তবে জনজাতি সমাজের জন্য বিশেষ কোটা থাকা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি।
এদিনের সভায় ঢাকা থেকে অনলাইনে যোগ দেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট সমাজকর্মী হেমন্ত দাস। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি হাসিনা সরকারের আমলে ওই দেশের হিন্দুদের কি অবস্থা হয়েছিল তারও বর্ণনা দেন। তিনি বলেন যে দুর্গা পুজোয় অনুদান সরকারিভাবে শুরু করা হয়েছিল বিএনপি সরকারের আমলে। হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচার কোনভাবেই কমেনি। আর এখন যেটা বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দু নির্যাতন বলে প্রচার করছে তা আসলে রাজনৈতিক লড়াই। কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ হিন্দু রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সমর্থক সুতরাং এখানে যে লড়াই হচ্ছে সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মী হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক তাদের উপরে আক্রমণ হয়েছে এ নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তবে ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করে আক্রমণ করা হয়েছে এটা ঠিক নয়। তিনি বলেন বরং জামাত ইসলামের মত সংগঠনগুলি হিন্দুদের মন্দির এবং জানমালের নিরাপত্তার জন্য তাদের কর্মীদের ময়দানে নামিয়ে ছিল।

