দেশ 

‘আমাদের মধ্যে ছোটখাটো মতপার্থক্য থাকবে তবে নমনীয় হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে’ পাটনার বৈঠকে মমতাকে লক্ষ্য করেই কী রাহুল এ কথা বললেন?

শেয়ার করুন

বাংলার জনরব ডেস্ক : নীতিশ কুমার ও তেজস্বী যাদবের উদ্যোগে আজ শুক্রবার পাটনায় অনুষ্ঠিত হলো বিরোধী দল গুলোর জোটের বৈঠক। ১৭ টি বিরোধী রাজনৈতিক দলের এই বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মতবিরোধ রয়েছে এবং থাকাটা স্বাভাবিক তা অতিক্রম করতে হবে নমনীয়তা রেখে। রাহুল গান্ধীর এই নমনীয়তা রেখে কথাটির মধ্যে তাৎপর্য রয়েছে। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে কংগ্রেস দলকে নিশানা করে তাকেই টার্গেট করে রাহুল গান্ধীকে এ কথা বললেন সেটাই এখন রাজনৈতিক মহলে বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে এসেছে। রাহুলের ভাষায়, ‘‘আমাদের মধ্যে ছোটখাটো মতপার্থক্য হবে। কিন্তু আমাদের নমনীয় হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, আমরা একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি তথা প্রাক্তন সাংসদ রাহুল বলেন, বিজেপি ভারতীয় সংস্কৃতির শিরদাঁড়ায় আঘাত করছে। যে নীতি এবং আদর্শের উপর ভিত্তি করে ভারত তৈরি হয়েছিল, তার উপরেই আঘাত করছে।

প্রশ্ন উঠেছে রাহুল গান্ধীর এই আহবানে কতটা সাড়া দেবেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা আপ সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কারণ বৈঠক শেষে দেখা গেল দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী দুজনেই সাংবাদিকদের সামনে এলেন না। যদিও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে প্লেন ধরার তাড়া থাকায় কয়েকজন চলে গেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘‘কয়েক জনের বিমান ধরার কথা ছিল। তাঁরা তাই চলে গিয়েছেন।’’ যদিও কংগ্রেসের একটি সূত্র জানাচ্ছে, পাটনায় বৈঠকে দিল্লিতে আমলাতন্ত্রের দখল নিয়ে কেন্দ্রের বিতর্কিত অর্ডিন্যান্সের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কেজরীওয়াল। নরেন্দ্র মোদী সরকার ওই অর্ডিন্যান্সকে পাকাপাকি করতে লোকসভায় বিল আনলে কংগ্রেস তা সমর্থন করবে কি না, স্পষ্ট জানতে চান তিনি।

এদিনের বৈঠকের পরে সকলের হয়ে সাংবাদিকদের কাছে বৈঠকের বিবরণ পেশ করে আয়োজক নীতীশ কুমার বলেন, ‘‘বৈঠক খুব ইতিবাচক হয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে কে কোথায় লড়বে, তার খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হবে।’’ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তার পরেই রাহুলকে বলার অনুরোধ জানান। কিন্তু রাহুল কিছু বলতে চাননি। তিনি তাঁর পাশে-বসা মল্লিকার্জুন খড়্গেকে বলতে বলেন। সম্ভবত খড়্গে কংগ্রেসের সভাপতি বলেই। কারণ, ওই যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে দলের শীর্ষনেতা বা নেত্রী হিসেবেই সকলে তাঁদের বক্তব্য জানিয়েছেন। খড়্গে ঘোষণা করেন, ‘‘পরবর্তী বৈঠক হবে হিমাচল প্রদেশের শিমলায়।’’ ওই বৈঠক জুলাই মাসের ১০ বা ১২ তারিখ হতে পারে বলেও খড়্গে জানান। প্রসঙ্গত, শিমলা হিমাচল প্রদেশের রাজধানী। যে রাজ্যের দখল এখন কংগ্রেসের হাতে।

খড়্গের পরেই রাহুল বলেন, ‘‘কিছু দিন পরেই পরবর্তী বৈঠক হবে। বিরোধী জোট গড়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’’ রাহুল আরও বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে ছোটখাটো মতপার্থক্য হবে। কিন্তু আমাদের নমনীয় হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, আমরা একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি তথা প্রাক্তন সাংসদ রাহুল বলেন, বিজেপি ভারতীয় সংস্কৃতির শিরদাঁড়ায় আঘাত করছে। যে নীতি এবং আদর্শের উপর ভিত্তি করে ভারত তৈরি হয়েছিল, তার উপরেই আঘাত করছে।

পটনার বৈঠককে জোটের প্রথম পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। জোটের ‘মুখ’ কে হবেন, তা ভোটের আগে না পরে ঠিক হবে— সে সব কথা আলোচনার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু শুক্রবার যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বিরোধী বৈঠকের আয়োজক নীতীশ যে ভাবে সকলের আগে রাহুলকেই জোটের তরফে প্রথম মুখ খোলার অনুরোধ জানিয়েছেন, তা যথেষ্ট ‘তাৎপর্য’ বহন করছে।

রাহুলের পরেই বলেন মমতা। তাঁর প্রস্তাবেই পটনাকে এই বৈঠকের ‘উপযুক্ত স্থান’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। মমতা বলেন, ‘‘আমরা একজোট। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করব।’’ তাঁর কথায়, ‘‘ওরা (বিজেপি) মনে করে, ইতিহাস বদলে দিতে হবে! আমরা বলতে চাই, বিহার থেকেই শুরু হবে ইতিহাসরক্ষার লড়াই।’’ শরদ পওয়ার, উদ্ধব ঠাকরে, মেহবুবা মুফতির মতো নেতারাও পারস্পরিক মতবিরোধ দূরে সরিয়ে একজোট হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলেছেন।

শুক্রবার দুপুরে পটনায় মুখ্যমন্ত্রী নীতীশের সরকারি বাসভবনে ১৭টি বিরোধী দলের শীর্ষ নেতানেত্রীরা লোকসভা ভোটে বিজেপি বিরোধী জোট গড়ার বিষয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। তৃণমূল নেত্রী মমতা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন বৈঠকে। ছিলেন রাহুল ও খড়্গে, কেজরীওয়াল, জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপি সভানেত্রী মেহবুবা মুফতি, জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা, ডিএমকে প্রধান তথা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের মতো বিরোধী নেতারাও। তাঁরা ছাড়া বৈঠকে ছিলেন এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার ও তাঁর কন্যা সুপ্রিয়া সুলে, জেএমএম প্রধান তথা ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন, সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, সিপিআই সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা, সিপিআইএমএল (লিবাবেশন)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা শিবসেনা (বালাসাহেব) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এবং উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদবের মতো নেতারা। আরজেডি প্রধান লালুপ্রসাদ এবং তাঁর পুত্র তথা বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদবকেও বিরোধী নেতাদের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা গিয়েছে।

 

আপ প্রধান কেজরীওয়াল কংগ্রেসের উপরে ‘চাপ’ বাড়িয়ে চলতি সপ্তাহেই রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশের আসন্ন বিধানসভা ভোটে লড়ার ঘোষণা করেছেন। রাজস্থানের গঙ্গানগরে সভাও করেন তিনি। এর পরে বুধবার ‘প্রত্যাঘাত’ করে কংগ্রেস। গুজরাতে আপের সহ-সভাপতির পদে থাকা বশ্রাম সগাথিয়া-সহ সে রাজ্যের কয়েক জন কেজরী-ঘনিষ্ঠকে টেনে আনা হয় ‘হাত’ শিবিরে। সূত্রের খবর, দিল্লিতে শীলা দীক্ষিতের সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায়-আসা কেজরীওয়ালকে কোনও ভাবেই বাড়তি জায়গা দিতে রাজি নয় কংগ্রেস। এমনকি, আমলাতন্ত্রের দখল নিয়ে মোদী সরকারের সম্ভাব্য বিলের বিরোধিতায় যখন অন্য বিরোধীরা কেজরীওয়ালের পক্ষে, তখন কংগ্রেস তার সমর্থনের বিষয়টি এখনও ঝুলিয়ে রেখেছে। যদিও মমতা পটনায় বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেছেন, ‘‘স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় সরকার যে বিল আনবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবেই তার বিরোধিতা করব।’’


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ