মানবাধিকারকে সুরক্ষিত করতে পারলেই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব : মিলিনদা এম পাভেক
বিশেষ প্রতিনিধি : এ বিশ্বকে শিশুর বাস যোগ্য করে যাবার যে অঙ্গিকার করে গিয়েছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম আর্ধে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘ কযেক দশক পর সেই বার্তা যেন আরও বেশি প্রাসঙ্গিকতা পেয়েছে । গত ৩ ডিসেম্বর শনিবার কলকাতার এক অভিজাত হোটেলে বিশ্ব শান্তি নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে নতুন করে কবি সুকান্তের বার্তা সামনে এলো । এদিনের আলোচনা সভার প্রধান অতিথি কলকাতাস্থিত মার্কিন উপদূতাবাসের কানসাল জেনারেল মিলিনদা এম পাভেক । তিনি খুব সংক্ষিপ্ত ভাষনে বিশ্বশান্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন । তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষা করতেই পারলে তবেই শান্তি ফিরে আসা সম্ভব । আজ সমগ্র বিশ্ব জুড়ে দূর্বলের উপর অত্যাচার চলছে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার আজ সুরক্ষিত নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ সামনে এনে মিলিনদা বলেন, ওই দেশগুলিতে সবলের অত্যাচার অব্যাহত । একইসঙ্গে অশান্তি শুধু সংঘর্ষের মধ্যে নেই, শান্তি এখন আবহাওয়াতেও নেই , উষ্ণায়ন আমাদের কাছে বড় সমস্যা ।বিশুদ্ধ পানীয় জলের সমস্যাও তীব্র হতে চলেছে । এই পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত মানবাধিকারকে সুরক্ষিত করা ।

প্রারম্ভিক ভাষণে আয়োজক সংস্থা আহমদিয়া মুসলিম জামাতের কলকাতা চ্যাপ্টারের ইনচার্জ আবু তাহের মন্ডল বলেন, বিশ্বকে শান্তির বাণী জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের কাছে প্রথম পৌছে দিয়েছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে যেভাবে সম্প্রীতির বাতাবরণ তৈরি করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরি খলিফারা পরমতকে গুরুত্ব দিয়ে, অন্য ধর্মকে সম্মান দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে নজীর তৈরি করেছিলেন তা ইতিহাসে বিরল । তিনি বলেন , পরবর্তীতে আহমদিয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম আহমদ উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন, ইসলামিক আদর্শে যথাযথ বিকাশ না হলে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় । তিনি বারবার বিশ্ববাসীকে শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা দিয়ে গেছেন ।


আবু তাহের মন্ডল আরও বলেন, ধর্ম মানুষের কাছে অপরিহার্য । ধর্ম ছাড়া একজন মানুষ পূর্ণতা পেতে পারে না । কারণ সব ধর্মেই শান্তি সংহতি উদারতার কথা বলা হয়েছে । ধর্মকে যখন রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করা হয় তখনই সংকট সামনে আসে ।আর ইসলামের মহান নবী(সা.) রাষ্ট্রনায়ক হয়েও আজ থেকে ১৫০০ বছর আগে যেভাবে শান্তি সংহতি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তা এক কথায় নজীরবিহীন এবং বিশ্ববাসীর কাছে অনুকরণীয় । নবী(সা.) এই বার্তাকে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে বিশ্বজুড়ে শান্তি নেমে আসবে ।

এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম বিশিষ্ট অতিথি রাজ্যসভার সাংসদ বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন,শান্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আধিপত্যবাদের পতন ঘটাতে হবে । আমি কী পড়বো, কী খাবো তা রাষ্ট্র ঠিক করতে পারে না । আমার নিজস্ব সংস্কৃতিতে বিকশিত হওয়ার অধিকার আছে , এটা যখন আমি পূর্ণভাবে পাবো তখনই বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব । আমরা সব সময় অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে চলেছি।মা যখন সন্তানসম্ভবা হন তখন অনাগত সন্তানের জন্য অস্থির হয়ে থাকেন । সন্তান পৃথিবীর আলো দেখার পর মায়ের অস্থিরতা আরও বেড়ে যায় । সন্তান কী খাবে? কীভাবে পড়বে ? তা নিয়ে ভাবতে থাকে । সন্তানও খিদে পেলে কান্না করতে থাকে , মায়ের বুকের দুধে সেই কান্না থেমে যায় । একইভাবে আমরা দেখব সমাজের সব জায়গায় অস্থিরতা বিরাজ করছে । আর অস্থিরতা থেকেই নতুন সংকটের জন্ম হচ্ছে । তাই শান্তির প্রথম শর্ত হলো অস্থিরতা দূর করা ।

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক এবং কলকাতার প্রাক্তন শেরিফ উৎপল চ্যাটার্জিও তাঁর ভাষণে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার মূল প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা করেন। সাহা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অধ্যাপক ড. পুরষোত্তম চক্রবর্তী মহাত্মা গান্ধী , নেলসন ম্যান্ডেলার প্রসঙ্গ সামনে এনে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে এই মহান মানুষদের সংগ্রামের কথা ব্যক্ত করেন । তিনি বলেন, এখন আর সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ হবে না, এখন যুদ্ধ হবে প্রাকৃতিক সম্পদকে দখলে রাখার জন্য ।

আহমদিয়া ইউথ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট কে, তারিক আহমদ বলেন, ইসলাম ধর্ম প্রথম দিন থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে । নবী(সা.) এর মদিনা সনদের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন , অশান্তি যে বিষয়গুলিতে গুরুত্ব পায় সেগুলিকে সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন হজরত মুহাম্মদ (সা). নবী (সা) সেই বার্তাকে সামনে রেখে আহমদিয়া জামাত বিশ্বব্যাপী কাজ করে চলেছে বলে তারিক আহমদ দাবি করেন । একই সঙ্গে এই জামাতের বিভিন্ন সমাজসেবা মূলক কাজের বিবরণ দেন । এদিনের অনুষ্ঠান অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, শায়রা হালিম, অগ্নি শিখা প্রমুখ ।
পার্ক হোটেলে আয়োজিত এদিনের সভায় অধ্যাপক, আইএএস, আইপিএস, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার সহ কলকাতা শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন ।

