জেলা 

দেবল দেবের বসুধায় জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা

শেয়ার করুন

দীপাঞ্জন দে: ইকোলজিস্ট হিসেবেই বিশ্বব্যাপী তাঁর পরিচয়— নাম দেবল দেব।প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেব দীর্ঘদিন ধরে এক প্রকার দুরূহ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০০১ সাল নাগাদ তিনি পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার জঙ্গল অধ্যুষিত বিনোদবাটি গ্রামে ‘বসুধা’ নামে একটি কৃষি খামার গড়ে তোলেন। বিংশ শতকের নব্বইয়ের দশক থেকেই তিনি দেশীয় প্রজাতির ধানের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। কয়েকজন কৃষক বন্ধুকেও তিনি একাজে শরীক হতে অনুপ্রাণিত করেন। কয়েক বছর আগে উড়িষ্যতেও নিয়ামগিরি পাহাড়ের কোলে দেবল দেব বসুধা কৃষি খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই থেকে সেখানে পুরোদমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কাজ চলছে। কৃষিবিজ্ঞানী দেবল দেব চাষীবন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে হাতে কলমে তাদের দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণের পন্থা ও এর প্রয়োজনীয়তার কথা শিখিয়ে চলেছেন। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফলে বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে ১,৪৬০ প্রকার দেশীয় প্রজাতির ধান রয়েছে। তুলসিমুকুল থেকে শুরু করে বহুরূপী, ব্ল্যাক রাইস, সরু নাগরা, মুখি বালাম, ত্রিকোণ নাদি, পরমায়ু শাল, রূপশাল, ঝিঙ্গাশাল, টেংরা পাটনাই, বাদশা ভোগ, কয়া, কেলাস, অসিত কর্মা, ভুতমুড়ি, রেড রাইস, কবিরাজশাল, ভালুদুবরাজ, গোবিন্দ ভোগ, কালা ভাত, কাটারিভোগ কী নেই সেখানে! রয়েছে যুগল ধান, সতীন ধানের প্রজাতিও— যা একেবারেই বিরল।

দেবল দেবের বসুধায় যে অসংখ্য দেশীয় ধানের বীজ রয়েছে, সেগুলি দেশীয় চাষে আগ্রহী কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। প্রথমে দেবল দেবের নেতৃত্বে তাঁর সহযোগী কৃষক বন্ধুরা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দেশী ধানের বীজ সংগ্রহ শুরু করেন। গড়ে ওঠে ব্রীহি বীজ বিনিময়কেন্দ্র। ধীরে ধীরে সমগ্র ভারত থেকে চাষীবন্ধুরা তাদের সংগ্রহে থাকা দেশীয় ধানের বীজ বসুধায় নিয়ে আসেন। বিনিময়ে তারা নিজেদের পছন্দমত অন্য কোনো দেশীয় ধানের বীজ সংগ্রহের সুযোগ পান। কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন ব্যতিরেকেই এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে। নিজের লক্ষ্যে আজও অবিচল দেবল দেব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বসুধা আজও এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। সবুজ বিপ্লবের আগে সমগ্র ভারতবর্ষে প্রায় এক লক্ষ দশ হাজার দেশীয় প্রজাতির ধান ছিল বলে জানা যায়। পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যাটি ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের প্রভাবে ক্রমান্বয়ে সেইসব দেশীয় ধানের চাষ বন্ধ হয়েছে। রাসায়নিক সারের প্রয়োগে কৃত্তিম ধানের বীজের প্রতি চাষীদের আকৃষ্ট করা হয়েছে। ড. দেবল দেব সেইসব লুপ্তপ্রায় দেশীয় ধানের বীজ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাতেই বসুধরা গড়ে তোলেন এবং নিজেকে সেই কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন। প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেবকে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু তিনি যেন অপ্রতিরোধ্য। সব বাধা পেরিয়ে আজও তিনি জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিতে অবিচল। সুহৃদ বন্ধুদের সহযোগিতায় কৃষি বিজ্ঞানী দেবল দেব কলকাতার কেষ্টপুরের কাছে একটি আধুনিক জিন গবেষণা সেন্টারও স্থাপন করেছেন। দেশীয় প্রজাতির ধানের বীজ সংগ্রহের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও পাড়ি দিয়েছেন। দেবল দেবের এই কর্মোদ্যোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অনেকে এই আন্দোলনে তাঁর সহযোদ্ধা হয়েছেন।

নদিয়া জেলার পরিবেশকর্মীদের একটি ছোট দল সম্প্রতি (অক্টোবর, ২০২২) বাঁকুড়ার বসুধায় গিয়েছিলেন ড. দেবল দেবের এই কর্মযজ্ঞ পরিদর্শন করতে। বসুধায় রয়েছে একটি দোতলা মাটির বাড়ি। সেখানেই তারা ছিলেন। এই মাটির বাড়িটি তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ স্থানীয় পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতিতে। সেখানে কোনো সিমেন্ট, পোড়ানো ইট, প্লাস্টিক বা কাঠ ব্যবহার করা হয়নি। চিরাচরিত দেশীয় পদ্ধতিতে বসুধার মাটির বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। সূর্যের অবস্থানকে মাথায় রেখে এমনভাবে বাড়িটির পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে গ্রীষ্মকালে বাড়ির জানালা দরজা দিয়ে সূর্যালোক কম ঢোকে এবং তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে কম থাকে। আর অন্যদিকে শীতকালে যাতে সূর্যালোক বেশি ঢুকে ঘরগুলিকে গরম রাখতে পারে। সৌর বিদ্যুতের সাহায্যে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা রয়েছে। জমির উর্বরতার বিষয়টি মাথায় রেখে বসুধায় ইকোলজিক্যাল স্যানিটেশনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। পরিবেশবিদ ড. দেবল দেব প্রকৃতি সংরক্ষণের বিষয়টি মাথায় রেখে এই যে বিরাট পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করেছেন, তা দেখে নদিয়ার পরিবেশকর্মীরা খুবই অনুপ্রাণিত হয়েছেন। দেবল দেবের সান্নিধ্যে তারা সরেজমিনে প্রকৃতির পাঠও গ্রহণ করেন। প্রকৃতিরক্ষক ড. দেবল দেবের হাতে গোবরডাঙা জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনা সমিতির মুখপত্র ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’ (Bio-diversity Conservation News Letter)’-র বিগত সংখ্যাটি তুলে দেওয়া হয়। পরিবেশ পত্রিকা ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র প্রথম সংখ্যা থেকেই তিনি পত্রিকাটির সঙ্গে রয়েছেন। ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র প্রথম সংখ্যাটি তার হাত দিয়েই আত্মপ্রকাশ করেছিল। প্রথম প্রচ্ছদেই ছিল উড়িষ্যার বসুধা কৃষি খামারের ছবি। দ্বিতীয় প্রচ্ছদে ছিল দেবল দেবের প্রকৃতি সংরক্ষণের কথা। ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’-র বিগত সংখ্যাটিতেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২২) বসুধার কথা রয়েছে, প্রচ্ছদেও রয়েছেন তিনি। দেবল দেবের মতো পরিবেশ চিন্তক এবং বসুধার মতো কৃষি খামার এই ধরনের পরিবেশ পত্রিকার অন্যতম রসদ। প্রকৃতিরক্ষক দেবল দেবের জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার এই দীর্ঘ সংগ্রামকে তাই কুর্নিশ জানাতেই হয়।

লেখক: সম্পাদক, ‘জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বার্তা’।

 

 

 

 


শেয়ার করুন

সম্পর্কিত নিবন্ধ